( লেখাটি পড়তে প্রায় 10 মিনিট সময় লাগতে পারে )

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কার: বাংলা নবজাগরণের এক বিপ্লবী অধ্যায়

সূচি

একা যুদ্ধে নেমেছিলেন যিনি

নিশ শতকের বাংলা সমাজ ছিল কুসংস্কার ও অনাচারে জর্জরিত। নারীরা ছিলেন সমাজের চরম শোষিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। বিধবাদের জীবন ছিল নারকীয়, বাল্যবিবাহ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, বহুবিবাহ ছিল উচ্চবর্ণের পুরুষদের ‘অধিকার’, আর নারীশিক্ষা ছিল কল্পনাতীত

এই অন্ধকার সমাজে একাই দাঁড়িয়েছিলেন এক দৃঢ়চেতা মানুষ—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, দার্শনিক ও দয়ালু মানুষ। তবে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন বাংলা সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি যেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি এক করে নিয়ে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, কীভাবে চল্লিশ মিলিয়ন বাঙালির মধ্যে একজন ‘মানুষ’ তৈরি হলেন

এই নিবন্ধে আমরা বিদ্যাসাগরের যুগান্তকারী সমাজ সংস্কারগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব—যে সংস্কারগুলো আজও আমাদের সমাজের ভিত গঠনে অবদান রাখছে।

উনিশ শতকের বাংলা সমাজ: পটভূমি

বিদ্যাসাগর যেসব সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, সেগুলোর পটভূমি জানা জরুরি। তৎকালীন হিন্দু সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল শোচনীয় :

বিধবাদের দুর্দশা

বিধবাদের মাথা মুণ্ডন করা হতো, সাদা শাড়ি পরতে বাধ্য করা হতো । তাদের ‘অশুচি’ ও ‘অভাগা’ মনে করে সমাজের চোখে ঘৃণা করা হতো। উচ্চবর্ণের বহুবিবাহ প্রথার কারণে অল্প বয়সেই অনেক মেয়ে বিধবা হয়ে যেত । ১৮৫৩ সালের এক হিসেব অনুযায়ী, কলকাতার জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১২,৭০০ জন পতিতা ও গণিকা ছিল—যাদের অনেকেই ছিল অসহায় বিধবা

বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ

বাল্যবিবাহ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে বহুবিবাহ ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। শাস্ত্রের নামে এসব অনাচারকে বৈধতা দেওয়া হতো

নারীশিক্ষার অভাব

সেকালে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো ছিল কলঙ্কের বিষয়। নারীশিক্ষার ধারণাটি সমাজে ছিল অকল্পনীয়

বিদ্যাসাগরের যাত্রার সূচনা

বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজের এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো শিক্ষাসংস্কার । তাই তিনি একদিকে যেমন সমাজের ভিত বদলাতে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, অন্যদিকে তৈরি করেছেন অসাধারণ সব শিক্ষামূলক গ্রন্থ—যার মধ্যে ‘বর্ণপরিচয়’ সবচেয়ে বেশি খ্যাত

১. বিধবা বিবাহ আন্দোলন: সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কার

বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের মধ্যে বিধবা বিবাহ আন্দোলন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ও স্মরণীয় অধ্যায়।

পটভূমি ও অনুপ্রেরণা

বিদ্যাসাগর প্রত্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে হিন্দু বিধবাদের অমানবিক জীবনযাপন করতে হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি নারী নির্যাতনের কঠিন বাস্তবতা দেখেছেন। এই বেদনা থেকেই তিনি বিধবা বিবাহের পক্ষে সোচ্চার হন

তিনি নিজের মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করে এক জায়গায় লিখেছেন:

“আমি টের পাইয়াছি মানুষ শেষ পর্যন্ত কিছুতেই নিজের সমস্ত পরিচয় পায় না। সে যা নয়, তাই বলিয়া নিজেকে জানিয়া রাখে এবং বাহিরে প্রচার করিয়া শুধু বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে...”

প্রথম নিবন্ধ ও স্মারক

১৮৪২ সালে তিনি ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’ পত্রিকায় বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রথম নিবন্ধ লেখেন । এরপর ১৮৫৫ সালে তিনি ‘বিধবা বিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব’ (দুই খণ্ড) গ্রন্থ প্রকাশ করেন। একই বছর ১৮৫৫ সালের ৪ অক্টোবর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ আইন করার জন্য সরকারের কাছে একটি স্মারক জমা দেন। এতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন

বিরোধিতার মুখে একা লড়াই

বিদ্যাসাগরের এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে রক্ষণশীল হিন্দুরা। রাধাকান্ত দেবধর্মসভা প্রায় ২৮টি বিপরীত আবেদন এবং ৫৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জড়ো করে আইনটির বিরোধিতা করে

কিন্তু বিদ্যাসাগর থামেননি। তিনি বেদ ও স্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে বিধবা বিবাহের শাস্ত্রীয় কোন বাধা নেই। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি বিদ্যাসাগরের যুক্তিতে সন্তুষ্ট হন এবং এই আইন পাস করতে উৎসাহ দেন

হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন, ১৮৫৬

অবশেষে ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ (XV of 1856) পাস হয় । এই আইন ব্রিটিশ ভারতের সব অঞ্চলে হিন্দু বিধবাদের পুনর্বিবাহের বৈধতা দেয়।

প্রথম বিধবা বিবাহ

আইন পাস হওয়ার পর সে বছরই ডিসেম্বর মাসে বিদ্যাসাগর নিজের প্রয়াসে প্রথম হিন্দু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন । এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাস সৃষ্টির ঘটনা। শাস্ত্রীয় বিধানের কঠোর বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন—সমাজ বদলানো সম্ভব, যদি থাকে দৃঢ় মনোবল ও মানবিক বোধ

বিবরণতথ্য
প্রথম নিবন্ধ১৮৪২ (বেঙ্গল স্পেক্টেটর)
স্মারক জমা১৮৫৫ সালের ৪ অক্টোবর
আইন পাসজুলাই ১৮৫৬
প্রথম বিবাহডিসেম্বর ১৮৫৬

বিদ্যাসাগরের এই অবদান ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এখনো বিদ্যাসাগরকে ‘বিধবা বিবাহের প্রবক্তা’ হিসেবে স্মরণ করা হয়

২. বাল্যবিবাহ রোধ ও কনসেন্ট অ্যাক্ট

বিদ্যাসাগর কেবল বিধবা বিবাহের পক্ষে আইন আনেননি; তিনি বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন এবং এই প্রথা বন্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন

যুক্তি ও প্রচারণা

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তিনি ‘বাল্যবিবাহ’ (১৮৫০) শীর্ষক পুস্তিকা লেখেন । তিনি বাল্যবিবাহের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কথা তুলে ধরেন। এতে অকাল গর্ভধারণ, নারী স্বাস্থ্যের ওপর কুপ্রভাব এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটিয়ে তোলেন।

আইন প্রণয়নে ভূমিকা

বাল্যবিবাহ বন্ধে বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায় ১৮৯১ সালে। তাঁর নিরলস প্রয়াসের ফলে ‘এজ অফ কনসেন্ট অ্যাক্ট, ১৮৯১’ পাস হয় । এই আইন মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে স্বামীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের ন্যূনতম বয়স ১২ বছর নির্ধারণ করে দেয়।

এটি নারী শিশু সুরক্ষার দিক থেকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। আর এর পেছনে ছিলেন বিদ্যাসাগর।

“আইনসভায় যুক্তি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বাল্যবিবাহের শাস্ত্রীয় কোনো অবকাশ নেই। শুধু সামাজিক গতানুগতিক নয়, আইনগত সুরক্ষা না পেলে নারীরা কখনো মুক্তি পাবে না।”

৩. বহুবিবাহ প্রথা বিরোধিতা

বিদ্যাসাগর আরেকটি কুপ্রথার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন—বহুবিবাহ। উচ্চবর্ণের কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে একাধিক বিয়ে করার যে কুপ্রথা ছিল, তার বিরুদ্ধে তিনি সরব হন

শাস্ত্রীয় প্রমাণ

সনাতন গ্রন্থ ও স্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে বহুবিবাহের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই, বরং এটি একটি সামাজিক অনাচার মাত্র। যুক্তি ও শাস্ত্রের ভিত্তিতে তিনি বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন।

রচিত গ্রন্থ

তিনি বহুবিবাহের বিরুদ্ধে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’ (প্রথম ভাগ ১৮৭১, দ্বিতীয় ভাগ ১৮৭৩) শীর্ষক বই লেখেন

মজার ব্যাপার হলো, ধর্মীয় গোঁড়ামি এড়াতে তিনি কিছু বই ছদ্মনামে প্রকাশ করেছিলেন। যেমন ‘অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘আবার অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘ব্রজবিলাস’ (১৮৮৪), ‘রত্নপরীক্ষা’ (১৮৮৬)

ছদ্মনামে লেখার কারণ

‘নীললোহিতের মতো এগুলিও সামাজিক ব্যঙ্গকাহিনি। বিদ্যাসাগর একই সঙ্গে কঠিন বাস্তবতাকে হাস্যরসাত্মক আঙ্গিকে পরিবেশন করতেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি এড়াতে এবং বিধি-ব্যবস্থার ভয় না দেখিয়ে নিভৃতে সংস্কারের বীজ বপন করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

৪. স্ত্রীশিক্ষা ও নারী জাগরণ

নারীশিক্ষার প্রচলন না হলে নারীমুক্তি সম্ভব নয়—এটা উপলব্ধি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাই তিনি নারীশিক্ষার পক্ষেও আন্দোলন করেছিলেন

হিন্দু ফিমেল স্কুল (বেথুন স্কুল)

বিদ্যাসাগর ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । পরবর্তীতে এই বিদ্যালয়টি বেথুন ফিমেল স্কুল নামে পরিচিত হয়। এটি বাংলার বালিকাশিক্ষার ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন

১৮৫৭ সালের মে মাসে তিনি বর্ধমানে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে তিনি ৩৪টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন

শুধু কলকাতা নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও তিনি নারীশিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজ গ্রাম বীরসিংহ ও সাঁওতাল পরগণাতেও বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন

নারীশিক্ষার পক্ষে যুক্তি

তিনি যুক্তি দিতেন—যতক্ষণ মায়েরা শিক্ষিত না হবেন, ততক্ষণ সন্তানরা সঠিক শিক্ষা পাবে না। কারণ সন্তানের প্রথম পাঠশালা হলো মায়ের কোলে। তাই নারীশিক্ষার মাধ্যমে গোটা সমাজের উন্নতি ঘটবে।

তিনি নারীশিক্ষার পক্ষে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন, কন্যাদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য। তাঁর নিজের গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও অর্থসাহায্য এই উদ্যোগেরই অংশ ছিল

৫. শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক সংস্কার

বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষাবিদ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালের ভেতরেও তিনি বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে সংস্কার

১৮৫১ সালের জানুয়ারি মাসে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন । অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি বহু যুগান্তকারী সংস্কার সাধন করেন:

  • বর্ণবাদের অবসান: কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাত্রদের জন্য সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়ে সকল হিন্দুর জন্য কলেজের দরজা খুলে দেন

  • নূন্যতম টিউশন ফি চালু করেন।

  • চান্দ্র মাসের ১ম ও ৮ম দিনের পরিবর্তে রবিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন করেন।

  • সংস্কৃত ব্যাকরণ ও গণিতের পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষাদান শুরু করেন

জনশিক্ষা বিস্তার

১৮৫৫ সালের মে মাসে, উডের শিক্ষা সনদ (১৮৫৪) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের কাজের পাশাপাশি বিদ্যাসাগরকে চারটি জেলা (নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর) ইংরেজি স্কুল পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি কয়েক বছরের মধ্যে মোট ২০টি স্কুল নির্মাণে ভূমিকা রাখেন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য একটি ‘নরমাল স্কুল’ স্থাপন করেন

মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ)

বিদ্যাসাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (পরবর্তীতে বিদ্যাসাগর কলেজ)। তিনি ১৮৬৪ সালে এটি পুনরায় চালু করেন এবং দীর্ঘকাল এর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এটি ছিল সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে

‘বর্ণপরিচয়’ ও শিক্ষায় বিপ্লব

বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম প্রকাশ ১৮৫৪-৫৫) । এটি বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার প্রথম আধুনিক ও সহজপাঠ্য বই। এর বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:

  • জটিল বর্ণমালাকে যুক্তিবহ ও সহজপাঠ্য করার জন্য সংস্কার সাধন

  • বিরাম চিহ্নের (কমা, সেমিকোলন, কোলন) ব্যবহার প্রবর্তন

  • সেকালের সাধারণ শিশুদের বোধগম্য ছোট ছোট বাক্য

  • গল্পের মাধ্যমে নীতিশিক্ষা ও চারিত্রিক গঠন—সে যুগে ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কারের বাইরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার নজির

সেই সময় পর্যন্ত অন্য কোনো লেখক শিশুদের মনের মতো সরল ও সুন্দর বাক্য রচনায় সফল হননি। গোপালের ছোট ছোট বাক্যগুলো আজও শিশুমনে দাগ কাটে।

৬. বাংলা গদ্য ও ভাষার সংস্কার

বিদ্যাসাগরকে ‘বাংলা গদ্যের জনক’ বলা হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে “বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বিরাম চিহ্নের প্রবর্তন

বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলো বিরাম চিহ্নের ব্যবহার বাংলায় প্রবর্তন । পূর্বে বাংলা লিখনে কেবল ‘।’ (দাঁড়ি) ও ‘॥’ (দ্বি-দাঁড়ি) ব্যবহারের চল ছিল। বিদ্যাসাগর কমা, সেমিকোলন, কোলন ইত্যাদি বিরাম চিহ্ন বাংলা ভাষায় প্রবর্তন করেন।

এক গবেষণায় বলা হয়েছে: “The awareness and application of punctuation in Bengali prose has not been seen before. Vidyasagar’s use of punctuation in these fluent prose is noteworthy”

বাংলা লিপি সংস্কার

তিনি বাংলা লিপি ও টাইপকে যুক্তিবহ ও সহজপাঠ্য করার জন্য সংস্কার সাধন করেছিলেন, যা ১৭৮০ সালে চার্লস উইলকিন্সের পর অপরিবর্তিত ছিল

সহজ ও প্রাঞ্জল গদ্য

বিদ্যাসাগরের গদ্য ছিল সহজ, প্রাঞ্জল ও গতিশীল। তিনি প্রচলিত সংস্কৃতায়িত কঠিন গদ্যের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় লেখার পক্ষপাতী ছিলেন। ‘বর্ণপরিচয়’ ছাড়াও ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’ তাঁর রচিত শিশুপাঠ্য

এর আগে কেউ শিশুদের জন্য লিখতে পারেননি এত সহজ এবং মনোমুগ্ধকর বাক্য।

৭. সাঁওতাল পরগণায় সমাজসেবা ও দানশীলতা

১৮৭৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বিদ্যাসাগর কিছুকাল সাঁওতাল পরগণায় (অধুনা ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া জেলার কর্মটান্ড) কাটান । সেখানেও তাঁর সংস্কার ও মানবদরদী মনোভাব ফুটে ওঠে।

বিদ্যালয় স্থাপন

সেখানে তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি নাইট স্কুল স্থাপন করেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উপজাতি ও দরিদ্র মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল

হোমিওপ্যাথি ক্লিনিক

তিনি স্থানীয় উপজাতি ও দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি স্থাপন করেন । অসহায় মানুষদের চিকিৎসা দেওয়া ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ।

‘নন্দন কানন’

তাঁর বাসস্থানের নাম ছিল ‘নন্দন কানন’ , অর্থাৎ আনন্দের বাগান। শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি সেখানে তিনি দরিদ্র, বিধবা ও অসহায় মানুষদের আর্থিক সাহায্যও দিতেন।

২০১৯ সালে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ঝাড়খণ্ড সরকার জামতাড়া জেলার কর্মটান্ড ব্লকের নামকরণ করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্লক । এটি তাঁর কর্মভূমির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।

বিদ্যাসাগরের দানশীলতা ও সমাজসেবা এতটাই বিস্তৃত ছিল যে তিনি ‘দয়ার সাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজের চরম অর্থসংকটের সময়েও তিনি ঋণ করে পরোপকার করেছেন।

৮. অন্যান্য সমাজ সংস্কারমূলক রচনা

বিদ্যাসাগর কেবল আন্দোলনই করেননি; তিনি কলমের মাধ্যমেও সমাজ সংস্কারের বীজ বপন করেছেন। তাঁর লেখা বহু গ্রন্থ সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে রচিত:

  • ‘বাল্যবিবাহ’ (১৮৫০) – বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে

  • ‘বিধবা বিবাহ’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, ১৮৫৫) – বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি ও শাস্ত্রীয় সমর্থন

  • ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’ (প্রথম ভাগ ১৮৭১, দ্বিতীয় ভাগ ১৮৭৩) – বহুবিবাহ বিরোধী যুক্তি

এছাড়া তিনি ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন । এই পত্রিকা সামাজিক সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম ছিল।

তিনি ‘আনন্দমঙ্গল’, ‘পদ্য-সংগ্রহ’, ‘রঘুবংশম্’, ‘কুমারসম্ভব’, ‘কাদম্বরী’, ‘মেঘদূত’ প্রভৃতি সংস্কৃত গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন

৯. গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একা সংগ্রাম

বিদ্যাসাগরের প্রতিটি সংস্কার পদক্ষেপের পথেই কাঁটা ছড়িয়েছিল রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ। তাঁকে মেনে নিতে পারেনি উচ্চবর্ণের গোঁড়া জনতা। কিন্তু তিনি কখনো পিছু হননি।

বিদ্যাসাগরের উত্তর

একবার কোনো গোঁড়া হিন্দু বলে বসলেন: “আপনি কেমন ব্রাহ্মণ? আপনি তো নিজেই বিধবা বিবাহের মতো পাপ কাজের নেতৃত্ব দেন!”

বিদ্যাসাগর শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন:

“শাস্ত্রের সত্যিকারের জ্ঞান যার নেই, তিনিই এইসব ভালো কাজকে পাপ বলেন। আমি শাস্ত্র মেনেই এই কাজ করছি। আর ব্রাহ্মণ হওয়া মানে অন্ধ প্রচলন মেনে নেওয়া নয়, সত্যের পথে থাকা।”

ইতিহাসবিদ কল্যাণকুমার সরকার বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মন্তব্য করেন: “ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে একাই একশো বছরের পথ পেরিয়ে গেছেন বিদ্যাসাগর। নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। যে যুগে নারী-শিক্ষা ছিল নিষিদ্ধ, সেখানে তিনি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। হাজারো কুসংস্কারের মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বিধবা বিবাহকে বৈধতা এনেছেন”

বিষয়ভিত্তিক বিদ্যাসাগরের উক্তি

বিদ্যাসাগর নিজের লেখা ও কথায় তাঁর দর্শনের স্বাক্ষর রেখে গেছেন:

নারী প্রসঙ্গে

উক্তিবক্তব্য
“লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়।”গৃহদাহ উপন্যাসের অমর লাইন
“প্রায় কোন দেশেই পুরুষ নারীর যথার্থ মূল্য দেয় নাই।” 

সমাজ সংস্কার প্রসঙ্গে

উক্তিবক্তব্য
“পৃথিবীতে কোন সংস্কারই কখনও দল বেঁধে হয় না! একাকীই দাঁড়াতে হয়। এর দুঃখ আছে। কিন্তু এই স্বেচ্ছাকৃত একাকীত্বের দুঃখ, একদিন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বহুর কল্যাণকর হয়।”সমাজ সংস্কারের প্রকৃতি নিয়ে

মানবতা প্রসঙ্গে

উক্তিবক্তব্য
“মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা।”পল্লীসমাজ উপন্যাসের অমর বাণী
“যাহার প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা নদীগর্ভে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে, সে আর খান কতক ইট বাঁচাইবার জন্য নদীর সহিত কলহ করিতে চাহে না।” 

“মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে।”

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় সমাজ সংস্কার কী ছিল?

বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় সমাজ সংস্কার হলো বিধবা বিবাহ আন্দোলন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয় এবং তিনি সেই বছরই প্রথম বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন

বিদ্যাসাগর ‘বাল্যবিবাহ’ নামে পুস্তিকা রচনা করে বাল্যবিবাহের কুফল প্রচার করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৯১ সালে ‘এজ অফ কনসেন্ট অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা মেয়েদের বৈবাহিক দৈহিক সম্পর্কের ন্যূনতম বয়স ১২ বছর নির্ধারণ করে

বিদ্যাসাগর ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (পরবর্তীতে বেথুন স্কুল)-এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৮৫৭ সালে ৩৪টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং সাঁওতাল পরগণায়ও বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন

বর্ণপরিচয়’ (১৮৫৫) বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ। এটি বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার প্রথম আধুনিক ও সহজপাঠ্য বই। এতে বিরাম চিহ্নের ব্যবহার প্রবর্তন ও ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এটি প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলা শিক্ষার আদর্শ পাঠ্য ছিল

বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে প্রাঞ্জল ও রসময় করে তোলেন। তিনি বিরাম চিহ্ন (কমা, সেমিকোলন, কোলন) বাংলায় প্রবর্তন করেন এবং বাংলা লিপি ও টাইপকে যুক্তিবহ করে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন

সাঁওতাল পরগণায় (বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কর্মটান্ড) বিদ্যাসাগর একটি বালিকা বিদ্যালয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নাইট স্কুল এবং বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক ক্লিনিক স্থাপন করেন। তাঁর বাসস্থানের নাম ছিল ‘নন্দন কানন’

বিদ্যাসাগর বহুবিবাহের বিরুদ্ধে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা’ শীর্ষক গ্রন্থ লেখেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি এড়াতে তিনি ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’, ‘ব্রজবিলাস’, ‘রত্নপরীক্ষা’ প্রভৃতি বই ছদ্মনামে প্রকাশ করেন

দরিদ্র, পীড়িত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি অসীম দয়া ও দানশীলতার কারণে বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত। নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ করে পরোপকার করেছেন

উপসংহার: বিদ্যাসাগরের সংস্কার চিরন্তন

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু এক যুগের সংস্কারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সনাতনী মূল্যবোধ ও আধুনিক চেতনার এক অদ্বিতীয় সমন্বয়কারী। তিনি কখনো গোঁড়ামির কাছে মাথা নত করেননি, আবার পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণেও মেতে ওঠেননি। তিনি বেদ ও স্মৃতির গভীর জ্ঞান নিয়ে সেই একই শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন—যেসব কুপ্রথা সমাজে চালু আছে, তার শাস্ত্রীয় কোনো ভিত্তি নেই।

বিধবা বিবাহ আইন, বাল্যবিবাহ নিরোধ, বহুবিবাহ বন্ধ, নারীশিক্ষা প্রসার, বাংলা গদ্যের সংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্যাসাগরের অবদান অনন্য। তিনি কেবল আইন আনার চেষ্টা করেননি, তিনি সেই আইনের পক্ষে গণমত গঠন করেছিলেন, লিখে গেছেন ‘বিধবা বিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব’-এর মতো যুগান্তকারী গ্রন্থ। তিনি কেবল শিক্ষার কথা বলেননি, বর্ণপরিচয়-এর মতো অমর সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন । তিনি কেবল বিধবা ও দরিদ্রের জন্য সমব্যথী ছিলেন না, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে—নিজে হয়েছেন ‘দয়ার সাগর’

তিনি প্রায় ২০টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, একটি নরমাল স্কুল স্থাপন করেছেন, মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনের মতো উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন । বর্ণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি কলেজের দরজা সাধারণের জন্য খুলে দিয়েছেন। সাঁওতাল পরগণায় গিয়ে আদিবাসী ও দরিদ্র মানুষের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন

বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ বিস্ময় মিশ্রিত শ্রদ্ধায় লিখেছিলেন: “One wonders how God, in the process of producing forty million Bengalis, produced a man!” । সত্যি, চল্লিশ মিলিয়ন বাঙালির মধ্যে একজন সত্যিকারের ‘মানুষ’ তৈরি করেছিলেন, যিনি পুরো বাঙালি সমাজকে নতুন করে দাঁড় করিয়েছিলেন মানবতার ভিত্তিতে।

আজ বিদ্যাসাগর নেই, কিন্তু তাঁর সংস্কার বেঁচে আছে—বেঁচে আছে বিধবাদের হাসিতে, বেঁচে আছে স্কুলে যাওয়া মেয়েদের বইয়ের ব্যাগে, বেঁচে আছে বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরে। বিদ্যাসাগরের উত্তরাধিকার চিরকাল বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা যতদিন থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে