সূচি
Toggleভূমিকা: ‘দয়ার সাগরের’ পরিচয়
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার নবজাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক—কত কী না তিনি ছিলেন! কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘দয়ার সাগর’ নামে। এই উপাধিটি তিনি পাননি কোনো পুরস্কার হিসেবে; বরং অর্জন করেছিলেন নিজের অসীম দয়া ও দানশীলতার মাধ্যমে।
বিদ্যাসাগরের জীবনীকারদের মতে, তিনি উপার্জনের সিংহভাগই দান করে দিতেন। নিজের কষ্টের সময়ও তিনি অন্যকে সাহায্য করতে কুণ্ঠিত হতেন না। আজ, তাঁর মৃত্যুর শতাব্দী পরেও যখন আমরা ‘বিদ্যাসাগর’ নামটি উচ্চারণ করি, তখন ‘পাণ্ডিত্য’ যেমন মনে আসে, ‘নির্ভীক সমাজসংস্কার’-ও যেমন মনে আসে, ঠিক তেমনি মনে আসে ‘হৃদয়ের দয়া’ ও ‘অসীম উদারতা’।
এই নিবন্ধে আমরা বিদ্যাসাগরের জীবনের কিছু হৃদয়স্পর্শী ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব—যেখানে তাঁর দয়ার সাগরের মতো হৃদয়ের পরিচয় সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে।
১. বর্ধমানের ক্ষুধার্ত বালক: এক রুপির ইতিহাস
পটভূমি: ১৮৬৫ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ
১৮৬৫ সালের কথা। তখন বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। চারদিকে শুধু হাহাকার। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে। খাবারের জন্য লোকজন এদিক-ওদিক ছুটছে। অন্নের দানা তখন সোনার থেকেও দুর্লভ ।
দরজায় এল এক বালক
ঠিক সেই দুর্ভিক্ষের সময় বিদ্যাসাগর বর্ধমানে অবস্থান করছিলেন। একদিন এক দুর্বল ও কৃশকায় বালক তাঁর কাছে এল। বালকটির মুখ ছিল বিবর্ণ, শরীর যেন হাড় জ্বালিয়ে দেওয়া। সে বিদ্যাসাগরের কাছে একটি পয়সা ভিক্ষা চাইল ।
বিদ্যাসাগর বালকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন—সাধারণ কোন ভিক্ষুক নয় এই বালক। এক অদ্ভুত জ্যোতি ছড়াচ্ছে তার মুখে।
সিরিজ প্রশ্ন আর বালকের জবাব
বিদ্যাসাগর তখন বালকটির চরিত্র যাচাই করতে চাইলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যদি তোমাকে চার পয়সা দিই, তাহলে কী করবে?”
বালক উত্তর দিল, “দুই পয়সায় কিছু খাবার কিনব, আর বাকি দুই পয়সা আমার মাকে দেব।”
বিদ্যাসাগর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি যদি তোমাকে দুই আনা দিই?”
বালক এবার একটু থমকে গেল। তারপর বলল, “চার পয়সায় আমি চাল কিনে খেতাম, বাকিটা মাকে দিতাম।”
বিদ্যাসাগর প্রশ্নের খোরাক বাড়ালেন। তিনি বললেন, “আমি যদি তোমাকে চার আনা দিই, তাহলে?”
বালককে এবার ভাবতে হলো। সে একটু চিন্তা করে বলল, “দুই আনা দিয়ে আমি দুই দিনের খাবারের ব্যবস্থা করতাম। আর বাকি দুই আনা দিয়ে আম কিনে তা চার আনায় বিক্রি করে মা ও আমার জীবনের ব্যবস্থা করতাম।”
দয়ার সাগরের হাত বাড়াল
বিদ্যাসাগর বালকটির জবাবে সন্তুষ্ট হলেন। কেবল ভিক্ষা চেয়ে না থেকে, বালকটি কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, তা বুঝতে পারলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বালকটিকে একটি পুরো টাকা দিয়ে দিলেন ।
বালক খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। টাকা নিয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। বিদ্যাসাগরের চোখেও তখন তৃপ্তির আভা।
দুই বছর পর: ফিরতি দেখা
দুই বছর পর বিদ্যাসাগর আবার বর্ধমানে গেলেন। হঠাৎ এক যুবক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম করল। বিদ্যাসাগর প্রথমে চিনতে পারলেন না। যুবকটি চোখের জলে আগের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিল ।
সে এখন আর ভিক্ষুক নয়। সে হয়ে উঠেছে একটি ফেরিওয়ালা। নিজের পুঁজি ও ব্যবসা গড়ে তুলতে পেরেছে। সে কৃতজ্ঞচিত্তে বিদ্যাসাগরকে নিজের দোকানে বসতে অনুরোধ করল ।
বিদ্যাসাগর দীর্ঘক্ষণ সেই যুবকের দোকানে বসে তাঁর উন্নতির কাহিনি শুনলেন। আশীর্বাদ করে বিদায় নিলেন।
শিক্ষা: এই ঘটনা বিদ্যাসাগরের দয়ার পরিচয় দেয়—শুধু অভাবীকে অর্থ দান নয়, তার স্বাবলম্বী হওয়ার পথও খুঁজে দেওয়া। বালকটির চিন্তাশক্তি দেখে তিনি বুঝেছিলেন, এই ছেলেটি একদিন সফল হবে। আর তিনি সেই বীজ বপন করে দিয়েছিলেন ।
২. কাপড়ের বিদ্রুপ: যে ঘটনায় শিক্ষা দিয়েছিলেন সমাজকে
বিদ্যাসাগরের দয়া যেমন ছিল, তেমনি ছিল নির্ভীকতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। ঘটনাটি সমাজের ভণ্ডামি ও বাহ্যাড়ম্বরের বিরুদ্ধে তাঁর এক অনন্য বক্তব্য।
সাধারণ পোশাকে দাওয়াত
একবার এক ধনী ব্যক্তি বিদ্যাসাগরসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে দাওয়াত দিলেন। বিদ্যাসাগর সাদাসিধা পোশাক পরে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। তিনি সাধারণত মোটা ধুতি ও মোটা কুর্তাই পরতেন ।
বাড়ির দারোয়ান তাঁকে দেখেই ‘গরিব ব্যক্তি’ ভেবে ফেলল। তার ধারণা হলো, বুঝি কোন না ডাকা লোক খেতে এসেছে। তাই তিনি বিদ্যাসাগরকে ভিতরে ঢুকতে দিলেন না ।
বিদ্যাসাগর কিছু বললেন না। চুপচাপ বাড়ি ফিরে গেলেন।
পরিবর্তিত সাজে দ্বিতীয় আগমন
দাওয়াতে বিদ্যাসাগরকে না দেখে মেজবান চিন্তিত হলেন। কারণ তাঁর আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বিদ্যাসাগরই ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি গাড়ি পাঠিয়ে বিদ্যাসাগরকে আনতে বললেন ।
এবার বিদ্যাসাগর গেলেন চমৎকার পোশাকে।
কাপড়ের সঙ্গে সংলাপ
দাওয়াত শুরু হলো। সবাই খেতে বসলেন। কিন্তু আশ্চর্য! বিদ্যাসাগর বারবার তাঁর গায়ের কাপড়ের দিকে ফিরে বলছিলেন, “তোমরা খাও। অজি, খাচ্ছ না কেন?”
লোকেরা হতভম্ব। মেজবান এলেন। প্রশ্ন করলেন, “পণ্ডিতজি, আপনি কী করছেন? এর অর্থ কী?”
বিদ্যাসাগর শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন:
“আমি যখন সাধারণ পোশাকে এসেছিলাম, তখন দারোয়ান আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। আজ ভালো পোশাকের কারণেই ঢুকতে পেরেছি। এই দাওয়াত তো এই কাপড়কেই। তাই আমি কাপড়কেই খেতে বলছি।”
মেজবানের লজ্জা ও ক্ষমা
বিদ্যাসাগরের কথা শুনে মেজবানের লজ্জার শেষ রইল না। তিনি দারোয়ানের বোকামির জন্য বিদ্যাসাগরের কাছে ক্ষমা চাইলেন। বিদ্যাসাগর কোনো রাগ বা অভিমান না করে ক্ষমা করে দিলেন। কিন্তু সমাজের বাহ্যাড়ম্বরের প্রতি তাঁর এই তির্যক বক্তব্য আজও স্মরণীয় ।
শিক্ষা: বিদ্যাসাগর কাপড়ের ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন—মানুষের মূল্য তার পোশাকে নয়, তার জ্ঞান, চরিত্র ও কর্মে। যারা পোশাক দেখে মানুষ বিচার করে, তারা আসলে বোকা ।
৩. বিধবা বিবাহের দৃঢ়তা: নারীর পক্ষে একা লড়াই
বিদ্যাসাগরের দয়ার প্রকাশ শুধু দান-সেবায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর দয়ার আরেক বড় প্রকাশ দেখা যায় তাঁর বিধবা বিবাহ আন্দোলনে।
উনিশ শতকের বাংলা সমাজে বিধবাদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের কারণে অল্প বয়সেই অনেক মেয়ে বিধবা হয়ে যেত। তাদের মাথা মুণ্ডন করা হতো, সাদা শাড়ি পরতে বাধ্য করা হতো, সমাজের চোখে তারা ছিল ‘অশুচি’ ও ‘অভাগা’। তাদের ঘরে ঘরে দাসীর কাজ করতেই হতো।
বিদ্যাসাগর এই অবস্থা দেখে মর্মাহত হন। তিনি বেদ ও স্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করলেন যে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। ১৮৫৬ সালে তাঁর প্রচেষ্টায় ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয়।
একজন গোঁড়া হিন্দু বিদ্যাসাগরকে কটাক্ষ করে বলেছিল, “আপনি কেমন ব্রাহ্মণ? আপনি তো নিজেই বিধবা বিবাহের মতো পাপ কাজের নেতৃত্ব দেন!”
বিদ্যাসাগর শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন:
“শাস্ত্রের সত্যিকারের জ্ঞান যার নেই, তিনিই এইসব ভালো কাজকে পাপ বলেন। আমি শাস্ত্র মেনেই এই কাজ করছি। আর ব্রাহ্মণ হওয়া মানে অন্ধ প্রচলন মেনে নেওয়া নয়, সত্যের পথে থাকা।”
শুধু আইন পাস করানো নয়, সেই বছরই তিনি প্রথম হিন্দু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেছিলেন। বিধবা বিবাহের আন্দোলন ঘিরে তাঁকে কত প্রতিকূলতা, কত অপমান, কত সামাজিক বয়কট সহ্য করতে হয়েছিল—তা ইতিহাস সাক্ষী। কিন্তু নারীর মুক্তি ও মানবতার জন্য তিনি লড়ে গেছেন। এটাই তাঁর দয়ার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
৪. ছদ্মনামে সংস্কার: ‘অতি অল্প হইল’
বিদ্যাসাগরের দয়া ও নির্ভীকতার আরেকটি দিক হলো, তিনি সমাজের গোঁড়ামির মুখে থেমে যাননি, বরং কৌশল নিয়েছেন। বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা’ শীর্ষক গ্রন্থ লেখেন।
কিন্তু সরাসরি নামে লিখলে গোঁড়া মহলের রোষানল পড়ত। সেজন্য তিনি বুদ্ধির আশ্রয় নিলেন। তিনি ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’, ‘ব্রজবিলাস’, ‘রত্নপরীক্ষা’ প্রভৃতি বইগুলো ছদ্মনামে প্রকাশ করেন।
এটি তাঁর দয়া ও মানবতার প্রকাশ—হিংসাত্মক পন্থা না নিয়ে তিনি বুদ্ধির মাধ্যমে সংস্কারের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সমাজের সংস্কার করতে গিয়ে তিনি কাউকে আঘাত করতে চাননি।
৫. দানের শেষ সীমানা: ঋণ করে পরোপকার
বিদ্যাসাগরের জীবনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, তিনি নিজের সর্বস্ব দান করে গেছেন। দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তি দেওয়া, অসহায় বিধবাদের মাসিক ভাতা দেওয়া, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা—এসব ছিল তাঁর নিয়মিত কাজ।
বিদ্যাসাগরের আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ মানের ছিল। শিক্ষকতার বেতন ও লেখার রয়্যালটি ছিল তাঁর আয়ের উৎস। কিন্তু এত স্বল্প আয় থেকেও তিনি অন্যকে সাহায্য করতেন। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ করে পরোপকার করেছেন।
সাঁওতাল পরগণায় (অধুনা ঝাড়খণ্ড) অবস্থানকালে তিনি একটি বালিকা বিদ্যালয় ও একটি নাইট স্কুল স্থাপন করেন। স্থানীয় আদিবাসী ও দরিদ্র মানুষের জন্য তিনি বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক ক্লিনিক চালু করেন। সেখানকার তাঁর বাসস্থানের নাম ছিল ‘নন্দন কানন’ (আনন্দের বাগান)।
দানের ক্ষেত্রে তাঁর দ্বারের কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে যায়নি। সেজন্যই সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘দয়ার সাগর’ বলে ডাকতেন।
বিদ্যাসাগরের দয়া ও মানবতা নিয়ে উক্তি
বিদ্যাসাগর তাঁর নিজের মুখে ও লেখায় দয়া ও মানবতার যে দর্শন রেখে গেছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক:
“নিজেদের স্বার্থ দেখার আগে সমাজ ও দেশের স্বার্থ দেখা উচিত। সেটাই হল প্রকৃত বিবেক ধর্ম।”
“মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা।”
“যাহার যে অবস্থা, সে যদি তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে তাহাকে কাহারও নিকট অপদস্থ ও অপমানিত হইতে হয় না।”
“আমি দেশাচারের দাস নহি; নিজের বা সমাজের মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক হইবে, তাহা করিব, লোকের বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সঙ্কুচিত হইব না।”
বিদ্যাসাগরের দয়ার কাহিনি: সারণি সংকলন
| ঘটনা | স্থান/কাল | সংক্ষিপ্ত বিবরণ | শিক্ষা |
|---|---|---|---|
| ক্ষুধার্ত বালক | বর্ধমান, ১৮৬৫ | বালককে পয়সা থেকে শুরু করে এক টাকা দান। দুই বছর পর বালক ফেরিওয়ালা হয়ে ফিরে আসে | দান শুধু অভাব মেটায় না, স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুলে দেয় |
| কাপড়ের বিদ্রুপ | এক ধনীর বাড়ি | দারোয়ানের অপমানের প্রতিবাদে কাপড়ের সঙ্গে সংলাপ | মানুষকে পোশাকে বিচার না করে জ্ঞান ও চরিত্রে বিচার করতে হবে |
| বিধবা বিবাহ | বাংলা, ১৮৫৫-৫৬ | কুসংস্কার ভেঙে বিধবা বিবাহ আইন ও প্রথম বিধবা বিবাহ চালু | নারীর প্রতি দয়া ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই |
| ছদ্মনামে সংস্কার | কলকাতা | ‘অতি অল্প হইল’ ইত্যাদি গ্রন্থ ছদ্মনামে প্রকাশ করে বহুবিবাহের বিরোধিতা | বুদ্ধি ও কৌশলের মাধ্যমেও সংস্কার আনা যায় |
| সাঁওতাল পরগণায় সেবা | ঝাড়খণ্ড | বালিকা বিদ্যালয়, নাইট স্কুল, হোমিওপ্যাথিক ক্লিনিক স্থাপন | শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে সমাজের শেষ মানুষটির পাশে দাঁড়ানো |
বিদ্যাসাগরের দয়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও মধুসূদন
বিদ্যাসাগরের দয়া ও মানবতা তাঁকে শুধু সাধারণ মানুষের নয়, মহান ব্যক্তিত্বদের কাছেও অনন্য করে তুলেছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরের চরিত্র প্রসঙ্গে লিখেছিলেন:
“One wonders how God, in the process of producing forty million Bengalis, produced a man!”
অর্থাৎ, কীভাবে ঈশ্বর চল্লিশ মিলিয়ন বাঙালির মধ্যে একজন ‘মানুষ’ তৈরি করলেন—এ প্রশ্ন রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি যেন “প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি” এক করে নিয়ে জন্মেছিলেন। এই ‘বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি’টিই হলো তাঁর দয়া ও করুণার মূল উৎস।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: বিদ্যাসাগরকে ‘দয়ার সাগর’ বলা হয় কেন?
দরিদ্র, অসহায় ও পীড়িত মানুষের প্রতি অসীম দয়া ও দানশীলতার জন্য বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ করে পরোপকার করেছেন। তাঁর দ্বারের কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে যায়নি।
২: বর্ধমানের ক্ষুধার্ত বালককে বিদ্যাসাগর কী সাহায্য করেছিলেন?
১৮৬৫ সালের দুর্ভিক্ষের সময় এক ক্ষুধার্ত বালক বিদ্যাসাগরের কাছে একটি পয়সা চায়। বিদ্যাসাগর তাঁর যুক্তি ও চিন্তাশক্তি দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে একটি পুরো টাকা দান করেন। দুই বছর পর সেই বালক স্বাবলম্বী হয়ে একজন ফেরিওয়ালা হিসেবে ফিরে আসে ।
৩: কাপড়ের বিদ্রুপের ঘটনায় বিদ্যাসাগর কী করেছিলেন?
এক ধনীর বাড়িতে দাওয়াতে গিয়ে দারোয়ান সাধারণ পোশাকের জন্য বিদ্যাসাগরকে ঢুকতে দেয়নি। দ্বিতীয়বার তিনি চমৎকার পোশাক পরে এলে তাকে সমাদর করা হয়। বিদ্যাসাগর তখন দাওয়াতে কাপড়ের সঙ্গে সংলাপ করে বলেছিলেন, এই দাওয়াত আসলে কাপড়ের জন্য, মানুষের জন্য নয় ।
৪: সাঁওতাল পরগণায় বিদ্যাসাগরের কী কী কাজ ছিল?
সাঁওতাল পরগণায় বিদ্যাসাগর একটি বালিকা বিদ্যালয়, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নাইট স্কুল এবং বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক ক্লিনিক স্থাপন করেন। তাঁর বাসস্থানের নাম ছিল ‘নন্দন কানন’ (আনন্দের বাগান)।
৫: বিদ্যাসাগর কেন ছদ্মনামে বই লিখেছিলেন?
সমাজের গোঁড়া মহলের রোষাণল এড়াতে বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ বিরোধী বইগুলো ছদ্মনামে প্রকাশ করেন। ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’, ‘ব্রজবিলাস’ ইত্যাদি গ্রন্থ তিনি ছদ্মনামে লেখেন।
৬: বিধবা বিবাহ আইন পাসে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?
বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ১৮৫৫ সালে সরকারের কাছে স্মারক জমা দেন। রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৮৫৬ সালে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয় এবং বিদ্যাসাগর সেই বছরই প্রথম হিন্দু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন।
উপসংহার: বিদ্যাসাগরের দয়ার চিরন্তন দীপ্তি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু বিদ্যার সাগর ছিলেন না—তিনি ছিলেন দয়ারও সাগর। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে দয়ার যে অসাধারণ সমন্বয়, তা তাঁকে বাংলার ইতিহাসে অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
ক্ষুধার্ত বালককে স্বাবলম্বী করে তোলা থেকে শুরু করে বিধবা নারীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, সাঁওতাল পরগণায় স্কুল ও হাসপাতাল স্থাপন থেকে শুরু করে সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কাপড়ের বিদ্রুপ—প্রতিটি ঘটনায় বিদ্যাসাগরের হৃদয়ের পরিচয় ফুটে ওঠে। তিনি কাউকে ক্ষমা করে দিতে জানতেন, আবার নারীর পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেও জানতেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন, প্রকৃত দান অর্থ দেওয়া নয়; বরং সেই ব্যক্তির স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুলে দেওয়া।
বিদ্যাসাগরের একটি বাণী দিয়ে শেষ করি:
“যাহার যে অবস্থা, সে যদি তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহা হইলে তাহাকে কাহারও নিকট অপদস্থ ও অপমানিত হইতে হয় না।”
বিদ্যাসাগর ছিলেন স্বীয় অবস্থানে সন্তুষ্ট থেকে জগৎকে দয়া ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে যাওয়া এক মহামানব। বিদ্যাসাগর নেই, কিন্তু তাঁর দয়ার কাহিনী আছে। আর এই কাহিনী চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে উৎস ও প্রেরণা হয়ে থাকবে—বাঁচতে শেখাবে, দিতে শেখাবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, ‘মানুষ’ হতে শেখাবে।


