সূচি
Toggleযিনি মানবমনের অন্ধকার গলিপথ দেখিয়েছিলেন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক নতুন ধরনের কথাশিল্পী—যিনি প্রকৃতির লাবণ্যের বদলে দেখিয়েছেন মানুষমনের অন্ধকার গলিপথ, গ্রামবাংলার আপাত শান্ত আবহের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদ্রতা, হিংসা ও কামনার জটিল জাল। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের ত্রয়ী—তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক—এর মধ্যে মানিক ছিলেন সবচেয়ে ভিন্ন পথের যাত্রী। বিভূতিভূষণ যেমন গ্রামবাংলার নিসর্গের স্নিগ্ধ চিত্র এঁকেছেন, মানিক এঁকেছেন গ্রামের মানুষের মনের জটিল দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্যের কুৎসিত রূপ, অশিক্ষিত জনজীবনের কামনা-বাসনার করুণ পরিণতি । তাঁর লেখা ছিল যেমন ‘নির্মম সত্য’, তেমনি ‘নগ্ন বাস্তব’ ।
১৯২৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘আতশী মামী’ গল্প দিয়ে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ , যা বাংলা সাহিত্যের গতিপথ বদলে দেয়। মাত্র ২৮ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি রচনা করেছেন ৩৮টি উপন্যাস ও ৩০৬টি ছোটগল্প । ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘চতুষ্কোণ’—এসব উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
এই জীবনীতে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈশব, শিক্ষা, সাহিত্যযাত্রা, দার্শনিক চেতনা ও অমর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শৈশব ও বংশ পরিচয়: দুমকা থেকে বিক্রমপুর
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে (বাংলা ১৩১৫ সালের ৬ জ্যৈষ্ঠ) ব্রিটিশ ভারতের বিহার প্রদেশের সাঁওতাল পরগনা জেলার ছোট শহর দুমকায় জন্মগ্রহণ করেন ।
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় । ‘মানিক’ ছিল তাঁর ডাকনাম, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যের ছদ্মনাম হয়ে ওঠে ।
পিতা-মাতা ও ভাইবোন
পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম নিরোদা দেবী । পিতা হরিহর সরকারি চাকরিতে জরিপকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরে উপ-জেলা কালেক্টর হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন । চাকরির সূত্রে তাঁকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে হয়েছে—কলকাতা, মেদিনীপুর, বরিশাল, ঢাকা, দুমকা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং ওড়িশা ও বিহারের কিছু অংশ ।
পিতামাতার চৌদ্দটি সন্তানের মধ্যে মানিক ছিলেন পঞ্চম। চার বোন ও ছয় ভাই সহ মোট দশটি সন্তান বেঁচে ছিল ।
পিতার আদিনিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের নিকট মালাপাড়িয়া গ্রামে । যদিও মানিকের জন্ম দুমকায়, তাঁর শিকড় ছিল বিক্রমপুরের মাটিতে।
ঘুরে বেড়ানো শৈশব: কিশোর মানিকের অভিজ্ঞতা
পিতার ঘন ঘন বদলির কারণে মানিকের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বাংলার নানা জেলায়—দুমকা, আরা, সারসাম, কলকাতা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, টাঙ্গাইল ও মেদিনীপুরে । এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর ভবিষ্যৎ সাহিত্যের এক অমূল্য পুঁজি হয়ে ওঠে। গ্রাম ও শহর, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন প্রত্যক্ষ করে তিনি সঞ্চয় করেছিলেন এক অসাধারণ পর্যবেক্ষণশক্তি।
বাল্যকাল থেকেই মানিক ছিলেন স্বভাব-রোমান্টিক। ভালো গান গাইতেন এবং বাঁশি বাজাতে পারতেন । তিনি কিশোর বয়সেই কবিতা লিখতে শুরু করেন ।
টাঙ্গাইলে বিদ্যালয় জীবন
কিছুকাল তিনি টাঙ্গাইলের কাঁথি মডেল স্কুলে পড়াশোনা করেছেন । পরবর্তীতে তিনি মেদিনীপুর জিলা স্কুল থেকে ১৯২৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন । গণিতে তিনি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন ।
১৯২৬ সালে তিনি বাঁকুড়ার ওয়েলেসলিয়ান মিশন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯২৮ সালে প্রথম বিভাগে আই.এসসি পাস করেন ।
প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত নিয়ে পড়াশোনা
পিতার উৎসাহে মানিক কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতে অনার্সসহ বি.এসসি কোর্সে ভর্তি হন । কিন্তু গণিতের চেয়ে তাঁর আসক্ত ছিল সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা। কলেজ ক্যান্টিনের আড্ডায় একদিন বন্ধুরা বললেন, বড় বড় পত্রিকায় নামী লেখকদের গল্পই প্রকাশিত হয়। মানিক ভিন্নমত পোষণ করলেন এবং বাজি ধরলেন—তিনিও একটি গল্প লিখে পত্রিকায় পাঠাবেন ।
বিস্ময়করভাবে, এই বাজিই তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা বিন্দু হয়ে ওঠে।
সাহিত্যজীবনের সূচনা: ‘আতশী মামী’ দিয়ে অভিষেক
চ্যালেঞ্জ থেকে সৃষ্টি
প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্যান্টিনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় একটি চ্যালেঞ্জের জন্ম। বন্ধুরা বললেন, বাংলার নামী পত্রিকাগুলোতে শুধু প্রতিষ্ঠিত লেখকদের রচনাই প্রকাশিত হয়। মানিক অবশ্য অন্য মত পোষণ করলেন। তিনি বললেন, প্রথম চেষ্টাতেই তাঁর গল্প প্রকাশের যোগ্য হবে ।
তিনি নিজের গ্রামের এক পরিচিত বৃদ্ধ দম্পতির প্রেমের কাহিনি নিয়ে ‘আতশী মামী’ গল্পটি লিখলেন । তিনি গল্পটি নিয়ে গিয়ে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার অফিসে রেখে এলেন, সম্পাদকের সঙ্গে দেখা না করেই ।
প্রায় চার মাস উত্তেজনা ও অপেক্ষার পর, একদিন সকালে ‘বিচিত্রা’র প্রখ্যাত সম্পাদক ও লেখক স্বয়ং মানিকের বাড়িতে এলেন—হাতে ছিল ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যা (ডিসেম্বর-জানুয়ারি ১৯২৮-২৯) । গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে, এবং সম্পাদক আরও গল্প চাইলেন !
‘আতশী মামী’ বাংলা সাহিত্যে সাড়া ফেলে দেয় । মাত্র ২০ বছর বয়সে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করলেন । এই ঘটনা ছিল একরকম ভাগ্যের পরিহাস: যিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, তিনিই হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী।
‘কল্লোল’ যুগের প্রতিনিধি
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । এই গোষ্ঠীটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে তুলেছিল—যেখানে ‘রোমান্টিসিজম’-এর বদলে আসে ‘বাস্তববাদ’ । এই নতুন যুগে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, কামনা-বাসনা, শ্রেণি-সংগ্রাম সবকিছুই দেখানো হতো ‘নগ্ন বাস্তবে’।
মানিকের সাহিত্য বাস্তবতার এতটাই কাছাকাছি ছিল যে পাঠকেরা সহজেই চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেদের খুঁজে পেতেন।
দার্শনিক চেতনা: ফ্রয়েড থেকে মার্ক্সের পথে
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য তাঁর দুইটি পৃথক দার্শনিক স্রোত চিহ্নিত করা জরুরি—ফ্রয়েডিয়ান মনোবিশ্লেষণ ও মার্ক্সবাদী শ্রেণি-চেতনা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তাঁর লেখা এত অনন্য, এত তীক্ষ্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্রয়েডের প্রভাব
প্রথম দিকে মানিক ফ্রয়েড, জুং ও অ্যাডলারের মনোবিশ্লেষণ তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন । তাঁর প্রাথমিক রচনায় মানুষের অচেতন মনে লুকিয়ে থাকা কামনা, দমন-পীড়ন, যৌনতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে তিনি শিল্পের উপজীব্য করেছিলেন । ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে তিনি নারীর যৌনতা ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে যে উদ্ভাবনী ও সাহসী চিত্র এঁকেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে সত্যিই ‘পথপ্রদর্শক’ ছিল ।
পরিণত পর্যায়ে মার্ক্সবাদী প্রভাব
১৯৪৪ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং আজীবন দলের সদস্য ছিলেন। মার্ক্সবাদ তাকে ভাবিয়ে তুলেছে সমাজের কাঠামো, শ্রেণি-বৈষম্য, শোষণ ও দারিদ্র্যের রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে ।
এই মার্ক্সবাদী প্রভাব তাঁর লেখায় যুক্ত করেছে এক নতুন মাত্রা। তিনি দেখিয়েছেন—দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অর্থনৈতিক শোষণ কীভাবে মানুষের চরিত্র, মনস্তত্ত্ব ও নৈতিকতাকে বদলে দেয় । ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটি এই শ্রেণি-বৈষম্য ও মানবিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত শৈল্পিক দলিল।
‘পেন-চালিত শ্রমিক’ ঘোষণা
মানিক নিজেকে কখনো ‘অভিজাত’ লেখক মনে করতেন না। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, একজন লেখক হলেন ‘পেন-চালিত শ্রমিক’ (pen-wielding labourer) যাঁকে তাঁর শ্রমের মূল্য দিতে হবে । এই ঘোষণা তাঁর বাস্তববাদী ও মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ছিল। তিনি আজীবন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগেছেন, কিন্তু কখনো অন্য কোনো পেশা গ্রহণ করেননি । সাহিত্যেই তিনি বেঁচে ছিলেন।
সাহিত্যকর্ম: অনন্যসাধারণ প্রাচুর্য
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে এবং প্রায় ২৮ বছরের সাহিত্যজীবনে ৩৮টি উপন্যাস, ৩০৬টি ছোটগল্প, একটি নাটক, একটি কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন । এটি সত্যিই এক বিস্ময়কর প্রাচুর্য, বিশেষত যেহেতু দীর্ঘদিন তিনি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং ১৯৫১ সালের পর স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ে ।
উল্লেখযোগ্য উপন্যাসসমূহ
| উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| জননী | ১৯৩৫ | প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস |
| দিবারাত্রির কাব্য | ১৯৩৫ | প্রথম রচিত উপন্যাস |
| পদ্মা নদীর মাঝি | ১৯৩৬ | সর্বাধিক আলোচিত, বহুভাষায় অনূদিত ও চলচ্চ্চিত্রায়িত |
| পুতুল নাচের ইতিকথা | ১৯৩৬ | বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস |
| শহরতলি | ১৯৪০-৪১ | শহরের উপশহর ও মধ্যবিত্ত জীবন |
| চতুষ্কোণ | ১৯৪২ | যৌনতা ও মানবসম্পর্কের পথপ্রদর্শক উপন্যাস |
| চিহ্ন | ১৯৪৭ | |
| সর্বজনীন | ১৯৫২ | |
| আরোগ্য | ১৯৫৩ | |
| হলুদ নদী সবুজ বন | ১৯৫৬ | শেষ উপন্যাস, মরণোত্তর প্রকাশ |
‘পদ্মা নদীর মাঝি’: অমর উপন্যাস
বাংলা সাহিত্যের এক অমর রত্ন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ (১৯৩৬)। নদীয়ার মাঝি কুবের ও মালা-র সম্পর্ক, দারিদ্র্য ও শোষণের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই—এই উপন্যাসে প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষের নির্মম বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।
ঐতিহাসিক স্বীকৃতি: ১৯৯৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি ইউনেস্কো পুরস্কার পায় ।
বিশ্বব্যাপী অনুবাদ: ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি অনূদিত উপন্যাসগুলোর একটি। এটি ইংরেজি, সুইডিশ, চেক, হাঙ্গেরিয়ান, চীনা, বুলগেরিয়ান, রুশ, স্লোভাক, ডাচ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইতালীয় সহ সাত/আটটি ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
চলচ্চিত্র: ১৯৫৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত হয় ‘The Day Shall Dawn’ —মানিকের গল্প অবলম্বনে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র । পরে ১৯৯২ সালে ভারত থেকে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ।
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’: জটিল সম্পর্কের উপাখ্যান
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬) বাংলা সাহিত্যের আরেকটি অমর সৃষ্টি। এই উপন্যাসে জমিদারি-বাড়ির পুতুলের মতো মানুষ, তাদের দ্বন্দ্ব, প্রেম, হিংসা ও ক্ষমতার লড়াই ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসটিও ইংরেজি ও চেক সহ ১১-১২টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
ছোটগল্প: বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণভাণ্ডার
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যের বিশেষ সম্পদ। তিনি ১৬টি ছোটগল্প সংকলন রেখে গেছেন । তাঁকে বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী ছোটগল্পকার বলে বিবেচনা করা হয়।
উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প
| গল্পের নাম | ইংরেজি অনুবাদ | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| আতশী মামী | Atashi Mami | প্রথম গল্প, অভিষেক |
| প্রাগৈতিহাসিক | Primeval | |
| সরীসৃপ | Reptiles | |
| হলুদ পোড়া | Burnt Turmeric | |
| আজকাল পরশুর গল্প | Today, Tomorrow and Day After | |
| শিল্পী | Craftsman | |
| ছোটবকুলপুরের যাত্রী | Travelers to Chhotobokulpur | |
| উপায় | The Way-out | |
| আত্মহত্যার অধিকার | Right to Suicide |
অনুবাদে মানিক
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন রয়েছে:
‘Primeval And Other Stories’ (১৯৫৮) — ১১টি গল্প
‘Selected Stories’ (১৯৮৮) — ১৬টি গল্প, মালিনী ভট্টাচার্য সম্পাদিত
‘Wives & Others’ (১৯৯৪) — ২৪টি গল্প ও একটি উপন্যাস, কল্পনা বর্ধন অনূদিত
‘Opium A Jiné Povídky’ (চেক ভাষায়, ১৯৫৬)
‘Selected Short Stories’ (চীনা ভাষায়, ১৯৮৪)
প্রায় ৭০টি ছোটগল্প ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় । তাঁর লেখা নগ্ন বাস্তবতা, মানব মনের অন্ধকার দিক বিশ্লেষণে বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন ‘পথিকৃৎ’।
তাঁর চলচ্চিত্রায়নের সংখ্যাও কম নয়:
The Day Shall Dawn (১৯৫৯) — পাকিস্তানি চলচ্চিত্র
দিবারাত্রির কাব্য (১৯৭০) — ভারতীয় চলচ্চিত্র
ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭২)
ছোটবকুলপুরের যাত্রী (১৯৮৭)
হরণের নাতজামাই (১৯৯০)
পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯২)
শিল্পী (১৯৯৪)
মায়ার জঞ্জাল (২০২৩)
শেষ জীবন ও মৃত্যু
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ২৮ বছর বয়স থেকে মৃগীরোগে (epilepsy) আক্রান্ত ছিলেন । এই রোগ এবং আর্থিক দৈন্য তাঁকে সারাজীবন পীড়িত করেছিল। ১৯৫১ সালের পর তাঁর স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে ।
১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকৃত নাম কী?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ডাকনাম ‘মানিক’ থেকেই তাঁর ছদ্মনাম ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ এসেছে ।
২: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের দুমকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় ৪৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ।
৩: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কয়টি উপন্যাস ও ছোটগল্প আছে?
তিনি ২৮ বছরের সাহিত্যজীবনে ৩৮টি উপন্যাস ও ৩০৬টি ছোটগল্প রচনা করেছেন । প্রায় ৩৬টি উপন্যাস ও ১৭৭টি ছোটগল্পের উল্লেখ পাওয়া যায় অন্যান্য সূত্রেও ।
৪: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি?
মানিকের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ (১৯৩৬) । এটি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ১৯৫৯ ও ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৯৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি ইউনেস্কো পুরস্কার পায় ।
৫: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যদর্শন কী ছিল?
মানিক প্রথম দিকে ফ্রয়েডিয়ান মনোবিশ্লেষণ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যা তাঁর ‘চতুষ্কোণ’-এর মতো রচনায় স্পষ্ট । ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি মার্ক্সবাদী হয়ে ওঠেন এবং দারিদ্র্য, শ্রেণি-বৈষম্য ও অর্থনৈতিক শোষণের দিকটি তাঁর লেখায় চিত্রিত করতে থাকেন ।
৬: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পের সংকলন কয়টি?
তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলনের সংখ্যা ১৬টি । উল্লেখযোগ্য সংকলন: ‘আতশী মামী’ (১৯৩৫), ‘প্রাগৈতিহাসিক’ (১৯৩৭), ‘সরীসৃপ’ (১৯৩৯), ‘সমুদ্রের স্বাদ’ (১৯৪৩), ‘হলুদ পোড়া’ (১৯৪৫), ‘আজকাল পরশুর গল্প’ (১৯৪৬) ইত্যাদি ।
উপসংহার: নগ্ন বাস্তবতার চিরন্তন দলিলদার
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ অধ্যায়। যিনি ‘পেন-চালিত শ্রমিক’ ঘোষণা করে সাহিত্যকে পেশা করেছিলেন, যিনি দিনের শেষে মৃগীরোগ ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে অনবদ্য সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন—একই সাথে তিনি দাঁড়িয়েছেন মানুষের মনের অন্ধকার ও সমাজের শ্রেণি-বৈষম্যের কঠোর সমালোচক হিসেবে।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ থেকে ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’—মানিক প্রতিটি রচনায় আমাদের দেখিয়েছেন, মানুষ কীভাবে সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর শিকার হয়ে পড়ে, কীভাবে তাদের কামনা-বাসনা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য তাদের নৈতিকতাকে বদলে দেয় । তাঁর ফ্রয়েডের পথ ধরা প্রথম দিকের রচনা যেমন ‘চতুষ্কোণ’ বাংলা সাহিত্যে যৌনতার নির্মোহ চিত্রায়ণে পথপ্রদর্শক , তেমনি মার্ক্সবাদে দীক্ষিত শেষ দিকের রচনা ‘হলুদ নদী সবুজ বন’ শ্রেণি সংগ্রামের অনবদ্য নিদর্শন ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সাহস—প্রচলিত ‘ঘরোয়া’ সাহিত্য না লিখে মানুষের মনের গহীন জায়গায় ডুব দেওয়া, বাংলা সাহিত্যের নগ্ন বাস্তবতার দরজা খুলে দেওয়া। প্রকৃতির মাধুর্য না এঁকে, জীবন-মৃত্যুর করুণ সংগ্রাম এঁকে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লব এনেছেন, যা আজও সজীব, আজও প্রাসঙ্গিক ।
মানিক হয়তো নেই। কিন্তু তাঁর লেখা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তে কুবেরের বুকফাটা হাহাকার, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-তে পুতুলের মতো মানুষের নাচ—এসব বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল বাজবে। যে কেউ বাংলা সাহিত্যের সত্যিকারের ‘বাস্তববাদী’ নাম খুঁজতে চান, তাঁকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই পড়তে হবে। তিনি বাংলা সাহিত্যের সেই অনন্য সমালোচক, যিনি পাঠককে প্রশ্ন করেছেন: “আমাদের সমাজের বাস্তবতা কী? আমরা কি এই নগ্নতার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত?”


