সূচি
Toggleভূমিকা: আদিম প্রবৃত্তির সন্ধানে
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ছোটগল্পটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ও আলোচিত রচনা। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত এই গল্পটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি—লোভ, ক্রোধ, দখলদারি ও কামনা—কে অত্যন্ত নির্মোহভাবে তুলে ধরে ।
‘প্রাগৈতিহাসিক’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘প্রাক-ঐতিহাসিক’। এই গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখাতে চেয়েছেন—সভ্যতার আধুনিক আবরণ খসে গেলে মানুষ আসলে কী? সমাজের নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি—এসব কি সত্যিই মানুষের স্বভাব পরিবর্তন করতে পারে? নাকি মানুষের ভেতরে এখনও লুকিয়ে আছে সেই আদিম, বন্য প্রবৃত্তি?
এই নিবন্ধে আমরা ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের কাহিনি, চরিত্র বিশ্লেষণ, সামাজিক ও দার্শনিক তাৎপর্য এবং নাট্যরূপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কাহিনি সংক্ষেপ: বন্দিত্ব থেকে পলায়ন
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিখু—একজন কুখ্যাত ডাকাত ও দস্যু। এক অভিযানে তার পুরো দল ধরা পড়ে যায়। মারাত্মকভাবে আহত ভিখু কোনোরকমে পালিয়ে যায় এবং তার বন্ধু পেহলাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয় ।
শুরুতে পেহলাদ ও তার স্ত্রী ভিখুর সেবা-শুশ্রূষা করে। কিন্তু ধীরে ধীরে ভিখুর শরীর সুস্থ হতে শুরু করলে তার ভেতরের আদিম প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। পেহলাদের অনুপস্থিতিতে একদিন সে পেহলাদের স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ।
বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে পেহলাদ তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। গৃহহীন ভিখু পথে পথে ঘুরতে থাকে। একদিন তার দেখা হয় পাঁচি নামের এক মেয়ের সাথে। সে পাঁচিকে পছন্দ করে বসে। কিন্তু পাঁচিকে পছন্দ করে আরও একজন—ভিক্ষুক বশির ।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাধান করে ভিখু এক রাতে বশিরকে খুন করে এবং পাঁচিকে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়ে ।
এই আপাত-সরল কাহিনির ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের আদিম প্রবৃত্তির এক গভীর ও নির্মোহ বিশ্লেষণ ।
চরিত্র বিশ্লেষণ: আদিম মানুষের প্রতিরূপ
ভিখু: আদিম প্রবৃত্তির প্রতীক
ভিখু গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে একজন ডাকাত, অর্থাৎ সমাজের নিয়মের বাইরে বসবাসকারী মানুষ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—ভিখুর আচরণে ফুটে ওঠে মানুষের সেই আদিম প্রবৃত্তি যা সভ্যতার আবরণে ঢাকা পড়ে গেলেও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি ।
তিনি যখন আহত অবস্থায় পেহলাদের বাড়িতে আশ্রয় পায়, তখন প্রথমে সে অসহায় ও করুণ। কিন্তু শরীর সুস্থ হতে শুরু করলেই তার ভেতরের বন্য সত্তা জেগে ওঠে। সে পেহলাদের স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে—এটি কামনার আদিম প্রকাশ। পরে সে বশিরকে খুন করে পাঁচিকে দখল করে নেয়—এটি দখলদারি ও ক্রোধের আদিম প্রকাশ ।
একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ভিখু ‘প্রাথমিক মানব প্রবৃত্তি’র প্রতীক—যে প্রবৃত্তি সভ্যতার আবরণে ঢাকা পড়লেও নিঃশেষ হয়নি ।
পেহলাদ ও তার স্ত্রী: সভ্যতার মুখ
পেহলাদ ভিখুর বন্ধু। সে তার আহত বন্ধুকে আশ্রয় দেয়, সেবা করে—সভ্য সমাজের নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু যখন সে জানতে পারে ভিখু তার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে, তখন সে তাকে বের করে দেয় । এটি সভ্য সমাজের প্রতিশোধ ও ন্যায়বোধের প্রকাশ।
পেহলাদের স্ত্রী নীরব ভুক্তভোগী—সে সমাজের সেই নারী, যাদের উপর আদিম পুরুষের কামনা নিপতিত হয়, কিন্তু যাদের নিজেদের কোনো কণ্ঠস্বর নেই।
পাঁচি ও বশির: আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
পাঁচি একজন নারী, যাকে কেন্দ্র করে ভিখু ও বশিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়। পাঁচি নিজে কোনো সক্রিয় চরিত্র নয়—বরং সে পুরুষের দখলদারির বস্তু। বশির আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী, যাকে ভিখু তার পথের বাধা হিসেবে খুন করে ।
এটি আদিম সমাজের সেই চিত্র—যেখানে নারী ছিল পুরুষের ‘সম্পত্তি’, এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করাই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম।
মূল প্রতিপাদ্য: আদিম বনাম সভ্য
'প্রাগৈতিহাসিক' শিরোনামের তাৎপর্য
গল্পটির শিরোনাম ‘প্রাগৈতিহাসিক’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ইচ্ছা করেই এই শিরোনাম বেছে নিয়েছেন—যাতে পাঠক বুঝতে পারেন, তিনি যে চরিত্র ও ঘটনা বর্ণনা করছেন, তা আধুনিক সভ্যতার নয়; বরং এটি আদিম, প্রাক-ঐতিহাসিক ।
গবেষকরা মনে করেন, গল্পের শিরোনাম ও চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে—প্রতিটি প্রধান চরিত্রেই আদিম প্রবৃত্তির ছাপ স্পষ্ট ।
মানব প্রকৃতির দ্বৈততা
গল্পটি মানুষের দ্বৈত প্রকৃতির চিত্র তুলে ধরে। একদিকে মানুষ সভ্য, সংস্কৃতিবান, নিয়ম-কানুন মেনে চলে—যেমন পেহলাদ তার আহত বন্ধুকে আশ্রয় দেয়। অন্যদিকে সেই একই মানুষ যখন সুযোগ পায়, তখন তার ভেতরের বন্য সত্তা বেরিয়ে আসে—যেমন ভিখু তার আশ্রয়দাতার স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন—সভ্যতা কি সত্যিই মানুষের স্বভাব বদলে দিতে পারে? নাকি সভ্যতা শুধু একটি আবরণ, যার নিচে এখনও সেই আদিম মানুষ বাস করে?
মার্ক্সবাদী ও পরিবেশ-সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি শুধু মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, মার্ক্সবাদী ও পরিবেশ-সমালোচনামূলক (ecocritical) দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণযোগ্য ।
মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৪৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন । তার এই রাজনৈতিক চেতনার প্রভাব তার সাহিত্যে স্পষ্ট। ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন, তাদের বঞ্চনা ও সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে ।
একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, গল্পটিতে ভিখুর ডাকাতি, পলায়ন, শহরে ভিক্ষাবৃত্তি ও পাঁচির সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই মার্ক্সবাদী বা পরিবেশ-সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণযোগ্য ।
পরিবেশ-সমালোচনামূলক (Ecocritical) বিশ্লেষণ
একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভিখুর ‘উপ-মানবিক জীবন’, তার ডাকাতি, জঙ্গলে পলায়ন, শহরের পথে ভিক্ষাবৃত্তি এবং পাঁচির সঙ্গে তার সম্পর্ক—সবকিছুই পরিবেশ-সমালোচনা ও মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝা যায় ।
পরিবেশ-সমালোচনা মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, জীবন ও পরিবেশের আন্তঃক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের বাস্তবতা ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে ।
প্রান্তিক দেহ ও ভিক্ষাবৃত্তি
একটি গবেষণাপত্রে গল্পটিকে ‘পেশা হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তি’ ও ‘প্রান্তিক প্রতিবন্ধী দেহ’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । ভিখু যেমন সমাজের চরম প্রান্তিক মানুষ, তেমনি তার আহত ও অসহায় শরীরটি প্রান্তিকতার আরেকটি প্রতীক।
গবেষণায় লিঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকেও গল্পটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে । ভিখুর কামনা ও পাঁচির প্রতি তার দখলদারি মনোভাব নারী-পুরুষের ক্ষমতা সম্পর্কের এক আদিম চিত্র তুলে ধরে।
নাট্যরূপ ও জনপ্রিয়তা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই গল্পটি এতটাই জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী যে এটি একাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে ।
নাগরিক নাট্যঙ্গন ও লাকি ইনামের মঞ্চায়ন
২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্প অবলম্বনে একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। নাটকটি পরিচালনা করেন লাকি ইনাম এবং রচনা করেন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম, যিনি নিজেই ভিখু চরিত্রে অভিনয় করেন ।
এই মঞ্চায়নটি ছিল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের ৬৫তম প্রদর্শনী । নাটকটিতে লালন ও অন্যান্য লোকগীতি ব্যবহার করে গ্রামবাংলার পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চায়ন
২০২৬ সালের মার্চ মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য সংগঠন ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ’ এই গল্প অবলম্বনে একটি নাটক মঞ্চস্থ করে ।
নাটকটির নির্দেশনা দেন জিল্লুর রহমান টিটন। এই মঞ্চায়নে ভিখু চরিত্রে অভিনয় করেন খাইরুল ইসলাম সবুজ এবং অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন সুব্রত কুমার ভৌমিক, তাসমি তামান্না তৃষা, ফারজানা সুলতানা প্রমুখ ।
গল্পের আদিম প্রবৃত্তির প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে এটি প্রায় ৯০ বছর পরও মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে 'প্রাগৈতিহাসিক'-এর স্থান
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে প্রায় ২৬০টি ছোটগল্প ও ৩৯টি উপন্যাস রচনা করেছেন । তিনি তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত ‘ত্রয়ী’ গঠন করেছেন ।
মানিকের কণ্ঠস্বর ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সমালোচকদের মতে, তিনি তার রচনায় স্বাধীনতার লড়াই, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—যে সময়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটছিল, তার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরেছেন। শহুরে মধ্যবিত্তের পুরনো মূল্যবোধ হারানোর সংগ্রাম এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শোষণ ও বঞ্চনার নির্মম চিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ।
‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি মানিকের সেই ভিন্ন কণ্ঠস্বরেরই প্রতিনিধি—যেখানে সভ্যতার আবরণ খসিয়ে তিনি মানুষকে তার আদিম রূপে দেখিয়েছেন।
আসুন এবার গল্পটিকে ভিখু’র একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক ডায়েরি’ বা ‘আত্মস্বীকারোক্তিমূলক নোট’ হিসেবে দেখার চেষ্টা কবি
ডায়েরির প্রথম পাতা: পালানোর রাত
তারিখটা ঠিক মনে নেই। রাতের অন্ধকার এখনও চোখের সামনে ভাসে।
পুলিশের হাত থেকে বেঁচে গেলাম। তবে শরীরটা থমথমে। বাঁ হাতের মাংস ছিঁড়ে গেছে, পায়ে গুলি লেগেছে। রক্তের গন্ধ আমার নিজের নাকেই বিরক্ত করছে। কিন্তু এই গন্ধ আমার চেনা—এটা আমার জীবনের সঙ্গী।
পেহলাদের বাড়ি পৌঁছতে পারলাম। বন্ধু আমার পুরনো। ওর স্ত্রী আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু পেহলাদ চুপ করালো তাকে।
“খুব বিপদে আছি,” বললাম আমি।
পেহলাদ রান্নাঘরে নিয়ে গেল আমাকে। মলম-পটি দিল। রান্না করল। খেতে দিল।
আমি তার চোখে প্রশ্ন দেখলাম—‘কী করলি আবার?’ কিন্তু সে কিছু বলল না। মানুষগুলো সব সময় মুখ বুজে থাকে। সভ্যতার বড় দোহাই।
দ্বিতীয় পাতা: দেহ বাড়ছে, দানবও
সাত দিন কেটে গেছে। ক্ষত শুকিয়ে আসছে।
পেহলাদের বাড়িতে আমি আরও বেশি সময় কাটাচ্ছি। তার স্ত্রী একা পেলে আমার দিকে তাকায়—ভয়ে? নাকি অন্য কিছু? পুরুষের চোখে নারী সব সময় অন্যরকম দেখায়।
আমার ভেতরে একটা কিছু জাগছে। সেটা ক্ষুধার মতো। কিন্তু খাবারের ক্ষুধা নয়। সেটা যে কী, আমি জানি। কিন্তু নিজের কাছে মানতে চাই না। পেহলাদ আমার বন্ধু। ওকে বিশ্বাসঘাতকতা করা ঠিক হবে না।
সভ্যতা বলে—এটা ঠিক না। কিন্তু আমার শরীরের সেই আদিম কণ্ঠস্বর বলে—নিয়ে নে, যা তোর দরকার, যা তোর পাওনা।
আমি কি সভ্য? নাকি আমি এখনও সেই প্রাগৈতিহাসিক মানুষ, যে কোনো নিয়ম মানে না?
আমি জানি না।
তৃতীয় পাতা: পাপের নাম, মুক্তির নাম
আজ রাতে আমি পেহলাদের স্ত্রীকে নিজের করে নিতে চেয়েছিলাম।
ব্যর্থ হয়েছি। সভ্যতার সেই দেওয়ালটা মাথায় ঠেকেছে।
পেহলাদ এসে পড়ল। বের করে দিল আমাকে। রাগ করেনি, চিৎকার করেনি—শুধু বলল, “চলে যা, ভিখু। ফিরে এসো না।”
তার চোখে আমি অপমান দেখলাম। আমার নিজেরও অপমান। এক বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করে, নিজের বন্য সত্তাকে বশে আনতে না পেরে, আমি বারবার পরাজিত হচ্ছি।
আমি বেরিয়ে এলাম। রাতের অন্ধকারে আবার সেই অচেনা পথে।
চতুর্থ পাতা: পাঁচি আর বশির
দু’দিন ধরে রাস্তায় কাটল। তারপর দেখা পেলাম পাঁচির।
পাঁচি ছোট মেয়ে না, বড়ও না। কোনো পুরুষের ছায়া তার নেই। একা একা ঘুরে বেড়ায়, একা খায়, একা ঘুমায়। তাকে দেখলে মনে হয়—এই তো আমার মতোই স্বাধীন মানুষ, যার কোনো বাঁধন নেই।
কিন্তু ওর পেছনে লেগে আছে এক ভিখারী বশির। চোখ ফেরালে বশিরকে দেখি—আমার শত্রু, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী।
পাঁচি যখন আমার দিকে তাকায়, আমার বুকের মধ্যে সেই আদিম রক্ত গর্জে ওঠে। আমি ওকে চাই। বশির এ পথে বাধা।
সভ্য মানুষেরা বলে—হত্যা করা অন্যায়। কিন্তু আদিম মানুষের কাছে অন্যায় বলতে কী? শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। পাওয়ার লড়াই।
আমি আর সভ্য হতে পারব না। বুঝে গেছি এই রাস্তায় এসে।
পঞ্চম পাতা: শেষ সিদ্ধান্ত
আমি বশিরকে খুন করেছি।
আমার হাতে রক্ত লেগে আছে। লেগে আছে এক অপরিচিত মানুষের প্রাণ। পাঁচি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভয় নেই তার চোখে, বরং একধরনের মেনে নেওয়া।
আমি ওকে বললাম, “চলো।”
পাঁচি কিছু বলল না। হাত ধরল আমার।
আমি জানি, সামনে আরও রাত আছে, আরও অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকার আমার চেনা। সেখানেই আমার বাড়ি। সেখানেই আমার নিয়ম। সেখানেই আমি ‘প্রাগৈতিহাসিক’—যেখানে সমাজের আইন নেই, শুধু আমার প্রবৃত্তি ও বেঁচে থাকার চিৎকার।
শেষ কথা: সেই আদিম সত্য
ভিখুর ডায়েরি শেষ হয় এখানেই। কিন্তু তার প্রশ্নটা থেকে যায়—প্রাগৈতিহাসিক মানুষ কি সত্যিই মরে গেছে? নাকি সে লুকিয়ে আছে আমাদের ভেতরে? যেদিন সভ্যতার দেওয়াল খসে পড়ে, সেদিন কি আমরা সবাই ভিখু হয়ে যাই?
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তর দেন না। তিনি শুধু দেখিয়ে দেন—আমাদের ভেতর এখনও সেই আদিম সত্তা আছে, সভ্যতার তলায় চাপা পড়ে আছে। আর একদিন সুযোগ পেলেই ফিরে আসবে—তীক্ষ্ণ, নির্মোহ, নৃশংস।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: 'প্রাগৈতিহাসিক' গল্পটির লেখক কে?
‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটির লেখক হলেন বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ১৯৩৭ সালে এই গল্পটি রচনা করেন ।
২: গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র কে?
গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিখু। সে একজন কুখ্যাত ডাকাত, যার চরিত্রে মানুষের আদিম প্রবৃত্তি—লোভ, ক্রোধ, কামনা ও দখলদারি—প্রতিফলিত হয়েছে ।
৩: 'প্রাগৈতিহাসিক' শিরোনামের অর্থ কী?
‘প্রাগৈতিহাসিক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রাক-ঐতিহাসিক’ বা আদিম। শিরোনামটি নির্দেশ করে যে গল্পটি সভ্যতার আগের মানুষ ও তাদের আদিম প্রবৃত্তি নিয়ে ।
৪: গল্পের মূল কাহিনি কী?
কুখ্যাত ডাকাত ভিখু এক অভিযানে আহত হয়ে বন্ধু পেহলাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে সে পেহলাদের স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে ভিক্ষুক বশিরকে খুন করে পাঁচি নামের এক মেয়েকে নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়ে ।
৫: গল্পটির মূল প্রতিপাদ্য কী?
ল্পটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি—কামনা, ক্রোধ ও দখলদারি—কে তুলে ধরে। এটি সভ্যতার আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের বন্য স্বভাবের চিত্র ।
৬: গল্পটি নিয়ে কি কোনো নাটক হয়েছে?
হ্যাঁ, গল্পটি একাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। ২০১২ সালে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় লাকি ইনামের পরিচালনায় এবং ২০২৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নাট্য সংসদ এটি মঞ্চস্থ করে ।
৭: গল্পটি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়?
গল্পটি মনস্তাত্ত্বিক, মার্ক্সবাদী ও পরিবেশ-সমালোচনামূলক (ecocritical) দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন, ভিক্ষাবৃত্তি ও প্রতিবন্ধী দেহের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আলোচিত ।
৮: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে এই গল্পটির গুরুত্ব কী?
এই গল্পটি মানিকের বাস্তববাদী ও মনস্তাত্ত্বিক লেখনীর অন্যতম উদাহরণ। এটি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি নিয়ে তার নির্মোহ ও সাহসী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে ।
উপসংহার: ভিখু, যে আমি
ভিখুর ডায়েরি আমাদের বলে—যে আদিম মানুষটা আমরা মনে করি মরে গেছে, সে আসলে বেঁচে আছে। সভ্যতার ভিতরে গুটিসুটি মেরে আছে। যেদিন সমাজের নিয়ম-কানুন দুর্বল হয়, সেদিন সে আবার বেরিয়ে আসে—বন্য, নির্মম, অপ্রতিরোধ্য।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ শুধু একটি গল্প নয়; এটি মানুষের সেই অংশের আত্মস্বীকারোক্তি, যা আমরা নিজেদের কাছে স্বীকার করতে চাই না। ভিখু হয়তো ডাকাত। কিন্তু ভিখুর ভেতরে বসে আছে আমাদের প্রত্যেকের সেই সত্তা, যে কোনো পূর্ণিমার রাতে চিৎকার করে উঠতে চায়—আমি প্রাগৈতিহাসিক, আমি বন্য, আমি স্বাধীন।
আজও যখন এই গল্পটি মঞ্চে ফিরে আসে, তখন আবিষ্কার করি—ভিখু শেষ হয়নি। ভিখু আমরাই।



