( লেখাটি পড়তে প্রায় 3 মিনিট সময় লাগতে পারে )

অপদার্থ

জীবজগতে পুরুষের মত অপদার্থ প্রাণী আর নেই। স্ত্রীরা ঠিকই বলেন, আমি না থাকলে তোমার যে কি দশা হতো। অতি সত্য কথা। চলিত বাঙলায় যাকে বলে, হাতে হ্যারিকেন – সেই দশা। আমাকে একবার বলা হয়েছিল, আজ মশারিটা খাটাওতো। খাটে মশারি টাঙাবার যে ছাউনিটা থাকে আমি সেটাকে খুলে দূর করে ফেলে দিয়েছিলুম। অনেক সময় খাটের পাশে দাঁড়িয়ে গেঞ্জি খুলতে গেলে অসাবধান হাতের আন্দোলনে কাঠের খাঁচা নড়ে যায়। এতএব আপদ বিদায়।

আমাদের খাটটা আছে ঘরের একপাশে দেয়াল ঘেঁষে। যেদিকে দেয়াল সেই দিকে দুটো হুক আছে। দুটো হুক থেকেই ঝুলছে দুটো ছবি, মা কালী আর মা দুর্গা। ওই হুকেই লাগানো হয় মশারির দুই প্রান্তের দড়ির ফাঁস। মশারি টান টান হলে ছবি দুটো কিচ শব্দ করে ডাইনে বামে হেলে যায়। তাতে কিছু যায় আসে না। কালী দূর্গা হেলে থাকলেও যা সোজা থাকলেও তা। পাওয়ার কিছু মাত্র কমে না। ক্যাপসুল পেটে খাড়া হয়ে ঢুকুক কি আড় হয়ে ঢুকুক, সেম অ্যাকশান।

যে দিকে দেয়াল নেই সেই দিকে মশারির কোনোও অবলম্বনও নেই। মশারির সেই দিকে লম্বা লম্বা দড়ি বাঁধা। দূরে দুটো জানালা। সেই জানালার গ্রিলে বাঁধতে হবে আর দুটো প্রান্ত। যেন ডিসিসির হাইটেনশন লাইন আসছে। আমি একটা দিক হুকে লাগালুম। আর একটা দিকও লাগালুম। দেখলুম ভীষণ টান হয়ে গেল। আর এক দিকের দড়িটা ভীষণ লম্বা। জাতিতে পুরুষ হলেও বোকা তো নই। দড়িটাকে মাপে আনতে কতক্ষণ লাগে। একটা ফাঁস লাগিয়ে, ‘হেই মারো টান’ বলে হুকে লাগিয়ে দিলুম। টানের চাপে কোণের দিকটা অল্প একটু ছিঁড়ে গেল যেন। এদিক ওদিক তাকালুম। ধারে কাছে বউ নেই। তবে আর কি! একটু ফেড়ে গেলে কি হয়েছে। যেতেই পারে।

মনে মনে বেশ তৃপ্ত হলুম, আজএকটা মশারি খাটাবো, নারী জাতীকে টেরা করে দেবো। অন্য দিন মশারির চাল ঝুরে থাকে। যেন মাথার ওপর নাইলনের জাতি গেঞ্জি পরে কোনোও ভুঁড়িঅলা মানুষ উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আজ আর মশারির চাল বলে মনে হয় না। মনে হবে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ছাদ। অর্কিড হাউসের মধ্যে শুয়ে থাকবো দামী দুই ক্যাকটাস।

এইবার তৃতীয় প্রান্তের দড়িটা হাতে নিয়ে হাঁটা দিতে হবে জানালার দিকে। নো প্রবেলেম। কিন্তু এটি হলো। প্রথমত দড়িটা খুবই ছোট। দ্বিতীয়তঃ মশারিটা এদিকে না এসে, ওই দিকে দেয়াল ফুঁড়ে যেতে চাইছে পাশের ঘরে। এটা কি তাহলে পাশের ঘরের মশারি। সেই গল্পটা মনে পড়ল। পাঞ্জাবি গল্প ‘আরে বুদ্ধু, এ পেরেক এ দেয়ালকা নেহি ও দেয়ালকা। ছেলে দেয়ালে এক পেরেক পুঁতবে। পেরেকের মাথার দিকটা দেয়ালে রেখে সরুর দিকে হাতুড়ি মারছে। প্রায়ই ফসকে যাচ্ছে। বাবা এসে বললেন, ‘বোকা, এ পেরেক হলো ও দেয়ালের।’ দু’আঙুলে পেরেকটাকে সাবধানে ধরে, যেন মাথা উল্টে না যায় এইভাবে নিয়ে গিয়ে বিপরীত দেয়ালের ওপর রাখলেন। ছেলেকে বললেন, ‘এই দেখ বুদ্ধু, মার হাতুড়ি।’

কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকার পর রহস্যটা ধরতে পারলুম। কোণ উল্টে গেছে। একটা পাশ খুলে আবার নতুন করে খাটালুম। যাক, মশারি এবার এদিকে আসছে, তবে চওড়া দিকে নয় লম্বা দিকে। তা হোক। মন্দের ভালো। দেয়াল ভেঙে মশারি সমেত মায়ের ঘরে মাঝরাতে ঢুকে পড়ার চেয়ে খাটটাকে টুক করে ঘুরিয়ে নেওয়া ঢের সহজ। এতকাল মশারির দৌড় ছিল উত্তর দক্ষিণে, আজ যখন পূর্ব-পশ্চিমে যেতে চাইছে, যাক। বাধা দেওযা উচিত নয়।

খাটটাকে ধরে একটু টেনেছি কি টানি নি, হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন নারী জাতি।

’এটা তোমার কি কেরামতি হচ্ছে?’

’মশারিটা ঘুরে গেছে তো, তাই খাটটাকে ঘুরিয়ে নিচ্ছি।’

’ওরে আমার বুদ্ধির ঢেঁকি রে।’

’কেন? প্রবেলেমটা কি?’

’কোন কোণটা কোন কোণে টাঙিয়েছো দেখি। হা ভগবান। খোলো। সব দিক খোলো। এই লম্বা দড়িটায় কে এমন করে ফাঁস লাগিয়েছে?’

সত্য বই মিথ্যা বলিব না। আমি।’

’উঃ, তোমাকে দিয়ে একটা কাজ যদি ঠিক মতো হয়্ বাপরে, কি কাজ করেছে। এ পাশের দড়িটাকে এভাবে জড়ালে কে?’

’ও তোমার নিজের থেকেই জড়িয়ে গেছে! দড়ি, সুতো, তার, পুরুষ আর নারী জাতি ও তোমার গিয়ে আপনার থেকেই জড়িয়ে যায়।’

’আপনার থেকেই জড়িয়ে যায়, না? বসে বসে খোলো।’

’আজ সকালে নখ কেটেছি, ফাঁস খুলতে পারবো না।’

’পারবো না মানে? মামার বাড়ি। খোলো। আমার যেমন ছিল, তেমন করে দাও।’

এসো না আজ নতুন কায়দায় শোয়া যাক! মশারিটা না খাটিয়ে জালের মতো গায়ে জড়িয়ে নি।’

তুমি আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও। তোমাকে দেখলেই আমার গা জ্বলে যাচ্ছে।’

আমার মনে পড়ে গেল, অনেক দিন আগে নারী জাতির নির্দেশে, আমার তিন মাসের শিশুটিকে ঝিনুক করে এক ঝিনুক জল খাওয়াবার চেষ্টা করেছিলুম। সেই জল মুখে ঢোকতে দিয়ে ঢুকিয়েছিলুম নাকে। আর একবার বলেছিল দরজায় তারা লাগাতে। তা আমি দুটো কড়ার বদলে তালাটা একটা কড়ায় লাগিয়েছিলুম। আবার টেনে টুনে পরীক্ষাও করেছিলুম। ফিরে এসে দেখি আমার ভায়রাভাই বসে আছে সিঁড়ির ধাপে। পুরুষ জাতি যে। দেখেও বুঝতে পারেনি, দরজাটা খোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে