সূচি
Toggleভূমিকা: যে গ্রামীণ কৃষক কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন গোঁড়ামির ভিত
বাংলাদেশের বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম লামচরী। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন শিক্ষা ছিল অভিজাতদের অধিকার, তখন এখানে এক দরিদ্র কৃষকের ঘরে জন্ম নেন আরজ আলী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সামান্য সুযোগও পাননি তিনি। কিন্তু তাঁর অদম্য জিজ্ঞাসু মন তাকে নিয়ে গিয়েছিল জ্ঞানের এমন এক অনন্য উচ্চতায়, যেখানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী। তিনি আরজ আলী মাতুব্বর ।
আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তাধারা শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণের পথে এক অনন্য পথচলা। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে সত্যের সন্ধান পেতে হলে প্রশ্ন করতেই হবে। তাঁর চিন্তার মূলস্রোত আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে কুসংস্কার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের এই সময়ে। এই নিবন্ধে আমরা আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন, দর্শন, সাহিত্যকর্ম এবং তাঁর অমর চিন্তাধারা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জীবনী: সংগ্রাম থেকে সত্যের সন্ধান
শৈশব ও শিক্ষা
আরজ আলী মাতুব্বর ১৯০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল জেলার চরবাড়িয়া লামচরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর ডাক নাম ছিল আরজ আলী। ‘মাতুব্বর’ উপাধিটি তিনি পরে গ্রহণ করেন, যা স্থানীয় ভূস্বামী হিসেবে তাঁর পরিচিতি নির্দেশ করে।
শৈশবেই পিতৃহারা হন তিনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে পিতার সম্পত্তি কর দিতে না পারায় নিলামে উঠে যায়। স্থানীয় এক মহাজনের কাছে তাঁদের বসতবাড়িও হারাতে হয় তাঁকে। এরপর তিনি খেটে খাওয়া কৃষক ও দিনমজুরের জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত হন ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর ছিল না বললেই চলে। গ্রামের মক্তবে কিছুদিন কুরআন শিক্ষা নিলেও সেখানকার যান্ত্রিক শিক্ষাপদ্ধতি তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণা ছিল অদম্য। এক দয়ালু ব্যক্তির সহায়তায় তিনি বাংলা প্রাইমার শেষ করেন। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি হয়ে ওঠে তাঁর পাঠশালা। ব্রজমোহন কলেজের দর্শনের অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির তাঁর গভীর জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে কলেজ লাইব্রেরি থেকে বই ধার করে দিতেন। এইভাবে তিনি নিজের চেষ্টায় বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস ও ধর্মশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন ।
আত্মদান: চোখ ও দেহ দান
আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর জীবদ্দশায় যেমন ছিলেন সংগ্রামী, মৃত্যুতেও তিনি দেখিয়ে গেলেন এক অনন্য নজির। ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে, মৃত্যুর পর তাঁর চোখ দান করা হয় এবং দেহটি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগকে প্রদান করা হয় । এটি ছিল তাঁর মানবতাবাদী দর্শনের চরম প্রকাশ—দেহের প্রতি কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে বিজ্ঞান ও মানুষের সেবাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন।
আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শন ও চিন্তাধারা
আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তাধারার মূল সুর হলো প্রশ্ন। তিনি কখনোই কোনো কিছুকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর দর্শন ছিল যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধের মিশেলে গঠিত।
‘সত্যের সন্ধান’ এবং প্রশ্নবোধক চেতনা
৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ও সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘সত্যের সন্ধান’। বইটি আসলে তিনি লিখেছিলেন ১৯৫২ সালে, কিন্তু প্রকাশ পেতে সময় লেগেছিল একুশ বছর। গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন:
“আমার মনের ভিতর নানা রকম চিন্তা আসছিল, কিন্তু এলোমেলোভাবে। আমি তখন প্রশ্নগুলো টুকে রাখা শুরু করলাম, বই লেখার জন্য নয়, শুধু স্মরণের জন্য। সেই প্রশ্নগুলো আমার মনকে এক অজানা সাগরের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল এবং আমি ধীরে ধীরে ধর্মের পরিধি থেকে সরে যাচ্ছিলাম।”
ই বইয়ে তিনি ছয়টি প্রস্তাবনার মাধ্যমে ৬৭টি প্রশ্ন তুলে ধরেন, যার মধ্যে রয়েছে:
আত্মা নিয়ে ৮টি প্রশ্ন: আমি কে? জীবন কি দৈহিক না অদৈহিক?
ঈশ্বর নিয়ে ১১টি প্রশ্ন: ঈশ্বর কোথায় থাকেন? তাঁকে দেখা যায় না কেন?
পরকাল নিয়ে ৭টি প্রশ্ন: মৃত্যুর পর কি হয়? জান্নাত-জাহান্নাম কোথায়?
ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ২২টি প্রশ্ন: ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের যৌক্তিকতা কী?
প্রকৃতি নিয়ে ১০টি প্রশ্ন: জোয়ার-ভাটা কেন হয়? বজ্রপাত কেন হয়?
বিবিধ বিষয় নিয়ে ৯টি প্রশ্ন।
ধর্ম, বিজ্ঞান ও যুক্তির সমন্বয়
মাতুব্বর কখনোই ধর্মকে অস্বীকার করেননি; তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন ধর্মের নামে গড়ে ওঠা কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে প্রকৃতির নিয়ম ও বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ।
তিনি প্রশ্ন করেছিলেন:
যদি ‘বরকত’ কমে যাওয়ার কারণ ধর্মহীনতা হয়, তবে যেসব দেশ অধর্মী (পাশ্চাত্য) তাদের উৎপাদনশীলতা এত বেশি কেন?
যদি বৃষ্টি-বাদলের জন্য কোনো ফেরেশতা দায়ী থাকে, তবে মুসলিম অধ্যুষিত চট্টগ্রামে কেন ঘূর্ণিঝড় হয়?
ঈশ্বর যদি অমূর্ত হন, তবে কীভাবে তিনি আরশে বসেন?
এমন প্রশ্নগুলো তাঁর সমসাময়িক সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, বই নিষিদ্ধ করার হুমকিও পেয়েছিলেন । কিন্তু তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, “সত্যের সন্ধান” মানেই হলো প্রশ্ন করা।
সাহিত্যকর্ম: ‘সত্যের সন্ধান’ থেকে ‘মুক্তমন’ পর্যন্ত
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব সত্ত্বেও তিনি একটি অনন্য সাহিত্যভাণ্ডার রচনা করে গেছেন। তাঁর লেখার ভাষা সহজ, সরল, কিন্তু প্রশ্নের গভীরতা অসাধারণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল | বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| সত্যের সন্ধান | ১৯৭৩ | ঈশ্বর, আত্মা, পরকাল, ধর্ম ও প্রকৃতি নিয়ে যুক্তিবাদী প্রশ্নমালা। |
| সৃষ্টিরহস্য | ১৯৭৭ | সৃষ্টি তত্ত্ব, বিবর্তনবাদ ও ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ। |
| অনুমান | ১৯৮৩ | গল্প ও কথোপকথনের মাধ্যমে দার্শনিক বিশ্লেষণ। |
| মুক্তমন | ১৯৮৮ | ব্যক্তি স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদের উপর রচনা। |
এছাড়াও তাঁর অপ্রকাশিত রচনাগুলো ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাবলী’ নামে সংকলিত হয়েছে ।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার: জীবনের চেয়ে মৃত্যুতে বেশি প্রাপ্তি
জীবদ্দশায় আরজ আলী মাতুব্বর তেমনভাবে স্বীকৃতি পাননি। উচ্চশিক্ষিত সমাজ তাঁকে ‘পাগলা কৃষক’ বা ‘নাস্তিক’ হিসেবে আখ্যা দিলেও শেষ জীবনে তিনি কিছু সম্মাননা অর্জন করেন:
১৯৭৮: বাংলাদেশ লেখক শিবির কর্তৃক ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ।
১৯৮২: বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (বরিশাল শাখা) কর্তৃক সম্মাননা।
১৯৮৫: বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্যপদ লাভ।
১৯৮৫ সালে মৃত্যুর পর তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হন এবং বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বশিক্ষিত দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত ।
আরজ আলী মাতুব্বরের উত্তরাধিকার: আজও কেন প্রাসঙ্গিক?
আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন যুক্তির পূজারী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ না বাড়ায়, বরং মানুষকে মানবিক হতে শেখায়। তিনি তাঁর জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে গ্রামের পথে গড়ে তুলেছিলেন ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি’ । তিনি বলতেন:
“আমার দৃষ্টিতে একটি গ্রন্থাগার একটি মন্দির, মসজিদ বা গির্জার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।”
কুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের গ্রাম-বাংলায় কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অনীহা বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তাধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রশ্ন করতে কোনও বাধা নেই। প্রশ্ন করার মাধ্যমেই সত্যের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সত্যের পথিক, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষের মন থেকে অন্ধকার দূর করা।
উপসংহার
আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন কৃষক, জরিপকারী, গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠাতা এবং সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন একজন মুক্তমনা দার্শনিক। তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব জ্ঞানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না যদি থাকে অদম্য জিজ্ঞাসা ও যুক্তিবোধ। তাঁর চিন্তাধারা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক কারণ তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অন্ধকার থেকে আলোর পথে যেতে হলে প্রশ্ন করতে হয়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মনকে মুক্ত রাখতে হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
প্রশ্ন ১: আরজ আলী মাতুব্বর কে ছিলেন?
আরজ আলী মাতুব্বর (১৯০০-১৯৮৫) ছিলেন বাংলাদেশের একজন স্বশিক্ষিত দার্শনিক, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার জন্য বিখ্যাত ছিলেন
প্রশ্ন ২: ‘সত্যের সন্ধান’ বইটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
টি আরজ আলী মাতুব্বরের প্রথম ও প্রধান গ্রন্থ। ১৯৫২ সালে লেখা এই বইয়ে তিনি ঈশ্বর, আত্মা, পরকাল, ধর্ম ও প্রকৃতি সম্পর্কে ৬৭টি যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা ধর্মীয় গোঁড়ামির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল
প্রশ্ন ৩: আরজ আলী মাতুব্বরের চিন্তাধারার মূল বৈশিষ্ট্য কী?
তাঁর চিন্তাধারার মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রশ্নবোধক চেতনা। তিনি কোনো বিষয়কে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিজ্ঞান, যুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কারকে বিশ্লেষণ করেছেন
প্রশ্ন ৪: কেন আরজ আলী মাতুব্বরকে ‘গ্রামীণ বিদ্রোহী’ বলা হয়?
ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার জন্য তাকে গ্রামীণ বিদ্রোহী বলা হয়। তাঁর মায়ের জানাজা না হওয়ার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল এবং তিনি আমরণ এই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রচনা ও বক্তৃতার মাধ্যমে সংগ্রাম করেছেন
প্রশ্ন ৫: আরজ আলী মাতুব্বরের রচনাবলী কোথায় পাওয়া যায়?
তাঁর প্রধান গ্রন্থগুলো হলো—সত্যের সন্ধান, সৃষ্টিরহস্য, অনুমান, মুক্তমন। এছাড়াও ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাবলী’ নামে তাঁর সংকলিত রচনা প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এবং অনলাইন বইয়ের দোকানে এগুলো পাওয়া যায়
উৎস:
উইকিপিডিয়া
বাংলাপিডিয়া
The Daily Star
আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র


