( লেখাটি পড়তে প্রায় 7 মিনিট সময় লাগতে পারে )

অর্জুন সমগ্র সমরেশ মজুমদার: বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য তরুণ গোয়েন্দার সম্পূর্ণ বিবরণ

সূচি

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের এক ভিন্ন স্বাদের নায়ক

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাসে যেমন সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, শারদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু রয়েছেন, তেমনি এক অনন্য স্থানের অধিকারী সমরেশ মজুমদার সৃষ্ট তরুণ গোয়েন্দা অর্জুন । তবে অর্জুনকে অন্যান্য গোয়েন্দাদের থেকে আলাদা করে যেটা, তা হলো তাঁর সাধারণ, পাড়ার ছেলের সুলভ ব্যক্তিত্ব ।

ফেলুদা যেমন কলকাতার বনেদি পরিবারের গরিমা বহন করেন, ব্যোমকেশ যেমন শ্যামবাজার-আনন্দী মাতৃকার বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ, অর্জুন তেমনি পাহাড় ঘেরা জলপাইগুড়ির ছোট শহরের এক স্বাভাবিক তরুণ । তিনি পেশাদার গোয়েন্দা নন, বরং একজন সত্য-সন্ধানী । স্নাতক পাস করে চাকরির সন্ধানে থাকা এক বেকার তরুণ কীভাবে ধীরে ধীরে এক দক্ষ গোয়েন্দায় পরিণত হন, তার গল্পই অর্জুন সিরিজ ।

এই নিবন্ধে আমরা অর্জুন সমগ্র সিরিজের প্রতিটি উপন্যাস, চরিত্র, অর্জুনের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও সমরেশ মজুমদারের এই সৃষ্টির গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সমরেশ মজুমদার: অর্জুনের স্রষ্টা

অর্জুন সিরিজের স্রষ্টা সমরেশ মজুমদার (১৯৪৪-২০২৩) বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন করলেও তরুণ পাঠকদের জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো অর্জুন চরিত্রটি ।

একটি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে নির্মল চক্রবর্তীর অনুরোধে তরুণ পাঠকদের জন্য গোয়েন্দা গল্প লেখার উদ্যোগ নেন সমরেশ মজুমদার। সেই উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে প্রথম অর্জুন উপন্যাস ‘খুটিমারি রেঞ্জ’ (Khutimari Range) প্রকাশিত হয় ।

তাঁর ভাষায়, অর্জুন তখনো পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা নয়—বরং তিনি একজন শিক্ষানবিস, যিনি ভুল করেন, শেখেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন । এই অসমাপ্ততা ও স্বাভাবিকতাই অর্জুনকে এত প্রিয় করে তুলেছে।

অর্জুন চরিত্র: পাড়ার ছেলে থেকে গোয়েন্দা

অর্জুনের পুরো নাম অর্জুন রায় । তিনি থাকেন পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরে । কিন্তু অন্যান্য গোয়েন্দাদের মতো উঁচু শহুরে পরিবেশে নয়—ছোট শহরের পাড়ার সাধারণ এক তরুণ তিনি ।

অর্জুনের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:

১. সাধারণ পটভূমি: অর্জুন কোনো ধনী পরিবারের সন্তান নন। স্নাতক পাস করার পর চাকরির সন্ধানে থাকা এক বেকার যুবক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু । সাধারণ পাঠক নিজেকে অর্জুনের জায়গায় বসিয়ে ভাবতে পারেন—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

২. শারীরিক সক্ষমতা: ফেলুদা বা ব্যোমকেশ যেমন বুদ্ধির জোরে রহস্য সমাধান করেন, অর্জুনের ইউএসপি হলো তাঁর শারীরিক সক্ষমতা । তিনি অ্যাথলেটিক, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এবং প্রয়োজনে নিজের শারীরিক শক্তি কাজে লাগাতে পারেন।

৩. আত্মীয়তার বন্ধন: অর্জুন সিরিজের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য হলো নায়কের পারিবারিক সম্পর্কের উপস্থিতি। অন্যান্য গোয়েন্দা চরিত্রদের পরিবার সাধারণত গল্পের পরিধির বাইরে থাকে, কিন্তু অর্জুনের মায়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক বারবার ফুটে ওঠে । ‘বুড়ি দিদি’র মতো আত্মীয়দের কথাও গল্পে উঠে আসে।

৪. ছোট শহরের আবহ: অর্জুনের গল্পগুলোতে জলপাইগুড়ি ও উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি প্রকৃতির এক অনন্য মায়া রয়েছে। সমরেশ মজুমদার তাঁর নিজের জন্মস্থান জলপাইগুড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অর্জুনের অ্যাডভেঞ্চারের পটভূমি বানিয়েছেন ।

৫. বিদেশ ভ্রমণ: ছোট শহরের সাধারণ তরুণ হলেও অর্জুনের অ্যাডভেঞ্চার তাঁকে নিয়ে গেছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের মতো দেশে ।

অর্জুনের পরামর্শদাতা ও সহচর

অর্জুন একা কাজ করেন না। তাঁর সঙ্গে আছে একদল চরিত্র যারা গল্পগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

অমল শোম (Amal Shome)

অর্জুনের পরামর্শদাতা ও গুরু। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার এবং পেশাদার গোয়েন্দা । অমল শোমের বয়স বেশি, তিনি অভিজ্ঞ ও ধীরস্থির। অর্জুনের অ্যাডভেঞ্চারে তিনি বুদ্ধির জায়গা থেকে দিকনির্দেশনা দেন ।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, অর্জুন অমল শোমের সহকারী নন। অমল শোম গুরু, কিন্তু অর্জুন তাঁর ছায়া নয়—তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক স্বতন্ত্র সত্য-সন্ধানী ।

মেজর (Major)

অর্জুন সিরিজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মেজর। তিনি এক উদ্ভট, চুরুট খাওয়া, বিশ্বভ্রমণকারী অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ব্যক্তি । টিনটিন সিরিজের ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো চরিত্র হিসেবে তাঁকে কল্পনা করা যায়—তিনি হাস্যরসের সঞ্চার করেন এবং গল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন ।

বিশু বাবু (Bistu Saheb)

কলিম্পংয়ের বাসিন্দা বিশুচরণ পাত্রনবিশ বা বিশু বাবু অর্জুনের আরেক সহচর। তিনি স্থানীয়ভাবে সম্মানিত একজন ব্যক্তি এবং অমল শোমের বন্ধু ।

হাবু (Habu)

অমল শোমের বাড়ির চাকর হাবু। তিনি বোবা ও কালো, কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী । অমল শোম যখন মাসের পর মাস বাইরে থাকেন, হাবু জলপাইগুড়ির হাকিমপাড়ার বাড়ির দায়িত্ব সামলান। তবে হাবু রান্নায় ভয়ংকর বাজে!

অর্জুন সমগ্র সিরিজের উপন্যাসসমূহ

১৯৮৩ সালে ‘খুটিমারি রেঞ্জ’ দিয়ে শুরু হওয়া এই সিরিজে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০টির বেশি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে । নিচে ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:

ক্রমিকউপন্যাসের নামইংরেজি বানানবিশেষত্ব
খুটিমারি রেঞ্জKhutimari Rangeপ্রথম উপন্যাস (১৯৮৩)
খুনখারাপিKhunkharapiদুইটি কাহিনির সংকলন
কালিম্পং-এ সীতাহরণKalimpong e Sitaharanচলচ্চিত্রায়িত
চণ্ডীগড়ে গণ্ডগোলChandigarh e Gandogol 
লাইটারLighterমেজর চরিত্রের প্রথম আবির্ভাব
দ্বিতীয় লাইটারDwitiyo Lighter 
তিংচুক মনাস্ট্রির হীরেTingchuk Monastery r Hire 
হাঙ্গরের পেতে হীরেHangorer Pete Hire 
জুতোয় রক্তের দাগJutoy Rokter Daagইংল্যান্ডের কাহিনি
১০ডেরদিনDerdinরেডিও নাটকীয় রূপ দেওয়া হয়েছে
১১রত্নগর্ভাRotnogorbha 
১২কালাপাহাড়Kalapahar 
১৩বরফে পায়ের চাপBorofe Payer Chap 
১৪অর্জুন এবার কলকাতায়Arjun Ebaar Kolkatay 
১৫ম্যাকসাহেবের নাতনিMacsaheber Natni 
১৬অর্জুন বেরিয়ে এলোArjun Beriye Eloসময়ভ্রমণের কাহিনি
১৭ঘুমঘুমের সেনবাড়িGhumghumer Senbari 
১৮কার্ভালহরের বাক্সোCarvalhor Baxo 
১৯অর্জুন @ বিপ বিপ ডটকমArjun @ bip bip dotcom 
২০ইয়েতির আত্মীয়Yeatir AtmioYeti সন্ধান
২১একমুখী রুদ্রাক্ষEkmukhi Rudrakha 
২২ড্রাকুলার সন্ধানে অর্জুনDracullar Sondhane Arjun 
২৩জয়ন্তীর জঙ্গলেJoyontir Jongole 
২৪তিন জালিয়াত এবং এক মিথ্যেবাদীTeen Jaliyat Ebong Ek Mithyebadi 
২৫দিনদুপুরে রাতদুপুরDindupure Ratdupur 
২৬নবাবগঞ্জের নরখাদকNababganjer Narakhadak 
২৭ফুলে বিষের গন্ধPhule Bisher Gondho 
২৮বিশল্যakarণীBishalyakarani 
২৯মানুষ পাঁচারManush Pachar 
৩০লবণহ্রদ লন্ডভন্ডLobonhrod Londobhondoঅরঙ্গুটান চোরের কাহিনি
৩১সমানন্দন যমনন্দনSamannandan Yamnandan 
৩২সীতাহরণ রহস্যSitahoron Rohosyo 
৩৩হিসেব ভুল ছিলোHisebe Bhul Chilo 
৩৪মুশকিল আসানMushkil Asan 
৩৫দশবংশ ধ্বংসDasbangsho Dhangsho 
৩৬অর্জুন এবার চিলাপাতায়Arjun Ebaar Chilapatayসর্বশেষ উপন্যাস (২০১৯)
৩৭খিলজির গুহায় অর্জুনKhiljir Guhay Arjun 
৩৮অর্জুন এবার বাংলাদেশেArjun Ebaar Bangladeshe 
৩৯লক্ষ টাকার পাথরLakh Takar Pathor 
৪০দুই দিকে এক অর্জুনDui Dike Ak Arjun 
৪১অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বীArjuner Pratidwandi 
৪২আদিম অন্ধকারে অর্জুনAdim Andhakare Arjun 
৪৩অর্জুন এবার নিউ ইয়র্কেArjun Ebaar New York e 
৪৪অর্জুন এবং চাইনিজ সিগারেটArjun Ebong Chinese Cigarette 

অর্জুন সমগ্র (Arjun Samagra) নামে ৬টি খণ্ডে সব কটি উপন্যাস সংকলিত হয়েছে । প্রথম খণ্ডটি ১৯৯৭ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ।

অর্জুন সমগ্র ১-এর গল্পসমূহ: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

‘অর্জুন সমগ্র ১’-এর ভেতরে থাকা কাহিনিগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো :

১. খুনখারাপি (Khunkharapi)

এই খণ্ডে দুটি কাহিনি রয়েছে:

প্রথম কাহিনি: উত্তরবঙ্গের খুটিমারি রেঞ্জের জঙ্গলে হাতির দলের উপদ্রবে এলাকাবাসী বিপর্যস্ত। সম্প্রতি স্নাতক পাস করে চাকরির সন্ধানরত অর্জুন একটি ঠিকাদার প্রীতম সিংয়ের অধীনে কাজ পান—হাতির দল তাড়ানোর প্রজেক্টে শ্রমিক হিসেবে। এখানে তিনি টিঙ্করি নামে এক ব্যক্তির সাক্ষাৎ পান, যাকে স্থানীয়রা অলস ও অকাজের লোক মনে করে। কিন্তু অর্জুন তাঁর মধ্যে কিছু বিশেষত্ব দেখতে পান। এক রাতে হাতির দলের মুখোমুখি হওয়ার পর অর্জুন বুঝতে পারেন, টিঙ্করি আসলে চোরাকারবারি দলের সদস্য ।

দ্বিতীয় কাহিনি: কলিম্পং-এর কাছে বৌদ্ধ মঠের এক মূল্যবান ধন রক্ষায় অমল শোমকে সাহায্য করেন অর্জুন। এখানে প্রথম পরিচয় বিশু বাবুর সঙ্গে ।

২. সীতাহরণ রহস্য (Sitaharan Rahasya)

আমেরিকা প্রবাসী এক বাঙালির মেয়ে সীতা। বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তিনি আমেরিকার পাঙ্ক কমিউনিটিতে ফিরে যেতে চান। অর্জুন ও অমল শোম সীতাকে অপহরণের হাত থেকে রক্ষা করেন। দ্বিতীয় পর্বে চণ্ডীগড় থেকে অপহৃত সীতাকে উদ্ধারের কাহিনি ।

৩. লাইটার (Lighter)

বিদেশি কোম্পানির তৈরি দুইটি লাইটারের সন্ধানে নামেন অর্জুন। এই লাইটারগুলো শুধু সিগারেট জ্বালানোর কাজ করে না—এটি একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। এফবিআই-এর জন্য ডিজাইন করা এই লাইটারগুলো চোরাচালান হয়েছে। এই কাহিনিতে প্রথম আবির্ভাব মেজর চরিত্রের ।

৪. জুতোয় রক্তের দাগ (Jutoy Rokter Daag)

মেজরের সঙ্গে ইংল্যান্ড ভ্রমণে যান অর্জুন। সেখানে দ্বিতীয় হাতে কেনা একটি বুটের ভেতরে লুকানো ছিল কিছু মূল্যবান রত্নের অবস্থান। ডঃ হ্যাচ ও ব্রাউন নামে খলনায়কের হাত থেকে এই ধন রক্ষার কাহিনি। সমুদ্রের নিচে অর্জুনের অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে এখানে ।

৫. ডেরদিন (Derdin)

উত্তরবঙ্গে ছুটিতে আসা একদল মেয়ের বডিগার্ডের দায়িত্ব পান অর্জুন। স্থানীয় বস্তির বাসিন্দারা অল্প সোনার বিনিময়ে ছোট ছোট ঋণ নিচ্ছে—এই ঘটনার পেছনের রহস্য উদঘাটনে নামেন তিনি। খুন ও বিশাল বানরের দেখা মেলে এই গল্পে ।

অর্জুন উপন্যাসের বৈচিত্র্য

অর্জুন সিরিজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিষয়বৈচিত্র্য। সমরেশ মজুমদার একেকটি উপন্যাসে একেক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার এঁকেছেন:

অ্যাডভেঞ্চার ও উধাও ধন: ‘হাঙ্গরের পেতে হীরে’, ‘কালাপাহাড়’, ‘তিংচুক মনাস্ট্রির হীরে’—এসব উপন্যাসে রয়েছে ধন উদ্ধারের রোমাঞ্চ ।

অলৌকিক ও রহস্য: ‘ড্রাকুলার সন্ধানে অর্জুন’ , ‘ইয়েতির আত্মীয়’ —এখানে রয়েছে অলৌকিকের সন্ধান।

সময়ভ্রমণ: ‘অর্জুন বেরিয়ে এলো’ উপন্যাসে সমরেশ মজুমদার ভবিষ্যতের ১৭৪ বছর পরের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট, ভিডিও কল ও সেলফ ড্রাইভিং গাড়ির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যা বাস্তবে পরে সত্যি হয়েছে!

আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার: ‘অর্জুন এবার নিউ ইয়র্কে’, ‘অর্জুন এবং চাইনিজ সিগারেট’, ‘জুতোয় রক্তের দাগ’ (ইংল্যান্ড), ‘অর্জুন এবার বাংলাদেশে’ ।

জঙ্গল অ্যাডভেঞ্চার: ‘জয়ন্তীর জঙ্গলে’, ‘খুটিমারি রেঞ্জ’—উত্তরবঙ্গের পাহাড়-জঙ্গলের গল্প .

বাংলার বাইরেও অর্জুন: ‘অর্জুন এবার বাংলাদেশে’ উপন্যাসটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রচিত, যা দুই বাংলার পাঠকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় .

অর্জুনের অন্যান্য মাধ্যম: চলচ্চিত্র, রেডিও ও টেলিভিশন

অর্জুন এতটাই জনপ্রিয় যে তাকে নিয়ে একাধিক মাধ্যমেও কাজ হয়েছে।

চলচ্চিত্র (২০১৩)

২০১৩ সালে অর্জুনের গল্প নিয়ে তৈরি হয় ‘অর্জুন: কালিম্পং এ সীতাহরণ’ শিরোনামের চলচ্চিত্র । ছবিটি পরিচালনা করেন প্রেম মোদী। এতে অর্জুন চরিত্রে অভিনয় করেন ওম এবং অমল শোম চরিত্রে দেখা যায় সৌরসীন্দ্রু চক্রবর্তীকে—যিনি অমল শোমের চেয়ে ফেলুদা চরিত্রের জন্যই বেশি পরিচিত ।

অভিনেতা ওম (প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র) জানান, চরিত্রের জন্য প্রস্তুতিতে তিনি সব গল্প পড়েছেন এবং অ্যাকশনের ওপর বিশেষ নজর দিয়েছেন ।

রেডিও নাটক

ফ্রেন্ডস এফএম (৯১.৯) রেডিও স্টেশনে ‘আমি অর্জুন’ নামে একটি অসাধারণ রেডিও ধারাবাহিক সম্প্রচারিত হয়েছিল। অমিত চক্রবর্তীর রূপায়ণে প্রায় ১০টি গল্প রেডিও নাটকে রূপ পায় । পরবর্তীতে ‘সানডে সাসপেন্স’ শোতেও অর্জুনের গল্প সম্প্রচারিত হয়েছে ।

টেলিভিশন ধারাবাহিক

‘ডেরদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় হিন্দি টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘জঙ্গল কি গহরাই মে’। এতে অর্জুন চরিত্রে অভিনয় করেন কৌশিক সেন .

অর্জুন বনাম অন্যান্য বাংলা গোয়েন্দা: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বৈশিষ্ট্যঅর্জুনফেলুদাব্যোমকেশকাকাবাবু
বয়সতরুণ (২০ এর কোঠায়)যুবক-মধ্যজীবনযুবক-মধ্যজীবনপ্রবীণ
অস্ত্রশারীরিক সক্ষমতাবুদ্ধি ও মগজাস্ত্রবুদ্ধি ও বিশ্লেষণবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা
পটভূমিজলপাইগুড়ি (ছোট শহর)কলকাতা (মহানগরী)কলকাতাউত্তরবঙ্গ-কলকাতা
পরিবারমায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কবাড়িতে জটায়ু-তাপসস্ত্রী সত্যবতীআত্মীয়হীন
পেশাপেশাদার গোয়েন্দা ননগোয়েন্দাগোয়েন্দাভ্রমণকাহিনি লেখক
মেন্টরঅমল শোমনেইনেইনেই

অর্জুন অন্যান্যদের থেকে আলাদা কারণ তিনি এখনো ‘অসমাপ্ত’। তিনি ভুল করেন, শেখেন, ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন। ফেলুদা বা ব্যোমকেশ যেখানে প্রথম গল্প থেকেই পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা, অর্জুনের যাত্রা শুরু হয় এক সাধারণ বেকার তরুণ হিসেবে ।

অর্জুন সিরিজ কেন এখনো প্রাসঙ্গিক?

অর্জুন সিরিজের গল্পগুলো ১৯৮০-৯০-এর দশকের পটভূমিতে রচিত। সেখানে আছে পাবলিক টেলিফোন, ডাকযোগে চিঠি, অ্যাডভেঞ্চারের জন্য রেলভ্রমণ। তবু কেন এই গল্পগুলো আজও প্রিয়?

প্রথমত, অর্জুনের স্বাভাবিকতা। তিনি সাধারণ বাঙালি তরুণের প্রতিনিধি। তাঁর সংগ্রাম, তাঁর চাকরির সন্ধান, তাঁর মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক—এসব আজও প্রাসঙ্গিক .

দ্বিতীয়ত, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা। সমরেশ মজুমদারের ভাষায় জলপাইগুড়ি, ডুয়ার্স, কলিম্পং যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে .

তৃতীয়ত, অ্যাডভেঞ্চারের বৈচিত্র্য। এক গল্পে সময়ভ্রমণ, অন্য গল্পে ড্রাকুলার সন্ধান, আবার অন্য গল্পে ইয়েতি—প্রতিটি গল্প আলাদা স্বাদের .

চতুর্থত, সহজ ও সাবলীল ভাষা। সমরেশ মজুমদারের লেখা এতটাই প্রাঞ্জল যে একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: অর্জুন সমগ্র কয়টি খণ্ডে প্রকাশিত?

অর্জুন সমগ্র সিরিজটি মোট ৬টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে । প্রথম খণ্ডটি ১৯৯৭ সালে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ।

অর্জুন সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘খুটিমারি রেঞ্জ’ (Khutimari Range), যা ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় । এটি নির্মল চক্রবর্তীর অনুরোধে তরুণ পাঠকদের জন্য লেখা হয়েছিল ।

অর্জুনের পুরো নাম অর্জুন রায় (Arjun Roy) । তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরের বাসিন্দা ।

অর্জুন চরিত্রটি সৃষ্টি করেন বিখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার (১৯৪৪-২০২৩)। তিনি ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্যও সমানভাবে পরিচিত ।

অর্জুনের পরামর্শদাতার নাম অমল শোম (Amal Shome)। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার ও পেশাদার গোয়েন্দা । তবে অর্জুন তাঁর সহকারী নন—তিনি স্বতন্ত্র সত্য-সন্ধানী ।

হ্যাঁ, ২০১৩ সালে ‘অর্জুন: কালিম্পং এ সীতাহরণ’ শিরোনামে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এতে অর্জুন চরিত্রে অভিনয় করেন ওম এবং অমল শোম চরিত্রে সৌরসীন্দ্রু চক্রবর্তী ।

 ১৯৮৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রায় ৫০টির বেশি অর্জুন উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ।

উপসংহার: বাংলা সাহিত্যের অমর তরুণ গোয়েন্দা

অর্জুন অন্য গোয়েন্দাদের মতো ‘পূর্ণাঙ্গ’ নন। তিনি ভুল করেন, তিনি শেখেন, তিনি নিজের পথ নিজে তৈরি করেন। এই অসমাপ্ততাস্বাভাবিকতা-ই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য গোয়েন্দা চরিত্রের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। একটি তথ্যমতে, একদা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ছদ্মনাম রাখতেন ‘অর্জুন’ ।

সমরেশ মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:

“Arjun is intelligent and athletic but he’s not the finished product yet — he doesn’t have the gravitas of Feluda or Byomkesh. Rather, he is unassuming and has a certain innocence about him.”

অর্জুন সম্ভবত কখনো পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা হবেন না। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল থাকবেন সেই সাধারণ পাড়ার ছেলেটি হিসেবেই, যে অসম্ভবকে সম্ভব করতে জানে। আর এটাই অর্জুনের সবচেয়ে বড় জয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে