সূচি
Toggleযিনি বাংলা সাহিত্যের স্বাদ বদলে দিয়েছিলেন
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন, তাদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্যতম। তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, ভ্রমণকাহিনি লেখক, সাংবাদিক, সম্পাদক ও অনুবাদক; যিনি সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০০টিরও বেশি বই রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন । তাঁর সৃষ্ট ‘কাকাবাবু’ চরিত্রটি বাঙালির শিশুসাহিত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ মতো উপন্যাসগুলি বাঙালির ইতিহাসচেতনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ‘নিখিলেশ ও নীরা’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রেমের এক অনন্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, সরস্বতী সম্মানসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত একজন লেখক । ২০০২ সালে তিনি কলকাতার শেরিফ নির্বাচিত হন এবং ২০০৮ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সংস্থা সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।
এই জীবনীতে আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শৈশব, শিক্ষাজীবন, সাহিত্যযাত্রা, তাঁর অমর সৃষ্টিকর্ম ও শেষ জীবন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
জন্ম ও বংশপরিচয়
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুরে (অধুনা বাংলাদেশ) এক বাঙালি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । ফরিদপুরের এই মাটিতে তাঁর শিকড় থাকলেও শৈশবেই তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও সাহিত্যচর্চার সূচনা।
কবিতাপ্রীতির শুরু: বাবার হাত ধরে
ছোটবেলায় সুনীল ছিলেন দুরন্ত প্রকৃতির। তাঁকে ঘরে আটকে রাখার জন্য বাবা একটি অসাধারণ কৌশল নিয়েছিলেন। তিনি সুনীলকে টেনিসনের কবিতা বাংলায় অনুবাদ করার কাজ দিয়েছিলেন । এই কাজের মধ্য দিয়েই সুনীলের কবিতাপ্রীতি ও সাহিত্যচর্চার শুরু। বাবার এই উদ্যোগ পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যকে এক অমূল্য রত্ন উপহার দেয়।
শিক্ষাজীবন
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, দমদম মতিঝিল কলেজ ও সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন । পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে বাংলায় এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ডিগ্রি তাঁর সাহিত্যচর্চার পথকে আরও সুদৃঢ় করে।
সাহিত্যজীবনের সূচনা
‘কৃত্তিবাস’: বিপ্লবের সূচনা
১৯৫৩ সাল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন মাত্র ১৯ বছর বয়সী তরুণ। সেই সময় তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে শুরু করলেন একটি কবিতাপত্রিকা—‘কৃত্তিবাস’ । এটি শুধু একটি পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনা।
‘কৃত্তিবাস’ বাংলা কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়। নতুন ছন্দ, নতুন বিষয়, নতুন ভাবনা—সব কিছুই জায়গা পেত এই পত্রিকায় । এই পত্রিকার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে এক নতুন প্রজন্মের কবিদের। সুনীল ছিলেন এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ । এই বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় প্রবেশ করেন এক নতুন কণ্ঠস্বর। যিনি জানতেন কীভাবে সাধারণ কথায় অসাধারণ ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে হয়।
সুনীল নিজেই ঘোষণা করতেন, কবিতাই তাঁর ‘প্রথম প্রেম’ । গদ্য-সাহিত্যে খ্যাতির শীর্ষে থাকলেও কবিতার প্রতি তাঁর টান ছিল চিরন্তন।
সাহিত্যজীবনের মাইলফলক
প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ ও বিতর্ক
১৯৬৫ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সুনীলের প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ । এটি তখন এক নতুন লেখকের পক্ষে প্রকাশ পাওয়া বিরল সম্মান ছিল।
উপন্যাসটি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কিন্তু বিতর্কও তৈরি করে। এর ‘আক্রমনাত্মক ও অশ্লীল’ শৈলী নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। সুনীল নিজেও স্বীকার করেছেন যে এই উপন্যাসের প্রভাব তিনি এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে কয়েকদিনের জন্য কলকাতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ।
মজার বিষয় হলো, এই উপন্যাসটি তৈরি করতে বিট সাহিত্যের কিংবদন্তি জ্যাক কেরোয়াকের ‘অন দ্য রোড’ উপন্যাসটি সুনীলকে অনুপ্রাণিত করেছিল । সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি ।
নিখিলেশ ও নীরা: প্রেমের অক্ষয় কাব্য
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নিখিলেশ ও নীরা’ সিরিজ। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘প্রেমের কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এই কাব্যগ্রন্থগুলোর মাধ্যমে ।
নিখিলেশ ও নীরার চিঠি ও কথোপকথনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে প্রেমের বিভিন্ন রূপ—প্রথম দেখার টান, নিখাদ ভালোবাসা, দীর্ঘ সম্পর্কের টানাপোড়েন। ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’—এসব কাব্যগ্রন্থ বাঙালির হৃদয় জয় করে নিয়েছিল । এই কাব্যগ্রন্থগুলোর কিছু অংশ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে ‘For You, Neera’ ও ‘Murmur in the Woods’ নামে ।
কালজয়ী উপন্যাসসমূহ
‘সেই সময়’: ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ । উপন্যাসটি উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।
‘প্রথম আলো’: ‘সেই সময়’ আকারের আরেকটি বৃহদায়তন উপন্যাস। ২০০৪ সালে এই উপন্যাসের জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরস্বতী সম্মান লাভ করেন । উপন্যাসটি ইংরেজিতে ‘ফার্স্ট লাইট’ নামে অনূদিত হয়েছে।
‘পূর্ব-পশ্চিম’: ১৯৮৯ সালে আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই উপন্যাসটি ভারত ভাগের বিভীষিকা ও তার প্রভাব নিয়ে রচিত । উপন্যাসটি তিন প্রজন্মের বাঙালির চোখে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পটভূমি এঁকেছে।
ছদ্মনাম ও সাহিত্যে অনন্যতা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো তিনি একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর ব্যবহৃত ছদ্মনামগুলো হলো :
| ছদ্মনাম | বিশেষত্ব |
|---|---|
| নীললোহিত (Nil Lohit) | সবচেয়ে পরিচিত ছদ্মনাম |
| সনাতন পাটক (Sanatan Pathak) | দ্বিতীয় ছদ্মনাম |
| নীল উপাধ্যায় (Nil Upadhyay) | তৃতীয় ছদ্মনাম |
নীললোহিত কেবল ছদ্মনামই ছিল না; এটি ছিল তাঁর এক আলাদা সত্তা। নীললোহিত নামে তিনি এমন সব গল্প লিখতেন যেখানে চরিত্রটি আত্মকথার ভঙ্গিতে নিজের জীবন বলত । ফলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও নীললোহিত যেন দুই স্বতন্ত্র সত্তা—দুটোই সমান জনপ্রিয়।
‘নীললোহিতের গল্প’ নামে তাঁর লেখা গল্পগুলোর জন্য তিনি ১৯৯৯ সালে অন্নদা-স্নোসেম পুরস্কার লাভ করেন । সুনীলকে দ্বিতীয় ভাগ্য দিয়েছিলেন নীললোহিত।
কাকাবাবু: শিশুসাহিত্যের এক কিংবদন্তি চরিত্র
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, আপনার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি কোনটি? তিনি সম্ভবত বলতেন—কাকাবাবু।
কাকাবাবুর আবির্ভাব ও জনপ্রিয়তা
১৯৭৪ সালে আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় কাকাবাবু সিরিজের গল্প । কাকাবাবুর আসল নাম রাজা রায় চৌধুরী । তিনি পঙ্গু হয়েও কখনও থেমে যাননি; বরং তাঁর লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন অ্যাডভেঞ্চারে।
সঙ্গী হিসেবে পেতেন ভাগ্নে শান্তু ও বন্ধু জোজোকে। একটা সময় তরুণ প্রজন্মের কাছে শান্তু যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি কাকাবাবু ছিলেন অভিভাবক ও বন্ধু—দুটোরই সমন্বয়।
কাকাবাবু সিরিজের সংখ্যা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মোট ৩৬টিরও বেশি কাকাবাবু উপন্যাস রচনা করেন । প্রতিটি গল্পেই ছিল নতুন রোমাঞ্চ, নতুন রহস্য, নতুন দেশ। কাকাবাবু শুধু বাংলার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন—আফ্রিকার জঙ্গল থেকে ইউরোপের প্রাসাদ, আমেরিকার মরুভূমি থেকে হিমালয়ের চূড়া।
কাকাবাবু সিরিজের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
‘কাকাবাবু এখানে?’
‘কাকাবাবু ও বুদ্ধদেব’
‘কাকাবাবু ও জলে রহস্য’
‘কাকাবাবু ক্যান্সারে আক্রান্ত নন’
‘কাকাবাবু ও আমেরিকা’
‘কাকাবাবু ও ল্যাংকা রহস্য’
চলচ্চিত্রে কাকাবাবু
কাকাবাবু এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে ১৯৯৬ সালে নির্মিত হয় ‘কাকাবাবু হিরে গেলেন?’ চলচ্চিত্রটি । পরবর্তীতে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মিত হয়েছে এই চরিত্র নিয়ে।
বন্ধু অ্যালেন গিন্সবার্গ ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ‘বিট’ কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল ।
গিন্সবার্গ যখন ভারতে ভ্রমণ করতেন, তখন সুনীল তাঁর সঙ্গী হতেন। এই বন্ধুত্বের গভীরতা এতটাই ছিল যে গিন্সবার্গ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন জেসোর রোড’-এ সুনীলের উল্লেখ করেছেন । আবার সুনীলও তাঁর কিছু গদ্যরচনায় গিন্সবার্গের প্রসঙ্গ এনেছেন।
এটি প্রমাণ করে যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের খ্যাতি শুধু বাংলা ভাষার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। নিচে সেগুলোর একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো :
| বছর | পুরস্কার/সম্মাননা | প্রাপ্তির কারণ |
|---|---|---|
| ১৯৭২ | আনন্দ পুরস্কার | সাহিত্যে সামগ্রিক অবদান |
| ১৯৭৯ | ‘জাতীয় কবি’ সম্মান | আকাশবাণী কর্তৃক |
| ১৯৮২ | বঙ্কিম পুরস্কার | ‘সেই সময়’ উপন্যাসের জন্য |
| ১৯৮৫ | সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার | ‘সেই সময়’ উপন্যাসের জন্য |
| ১৯৮৯ | আনন্দ পুরস্কার (দ্বিতীয়বার) | ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসের জন্য |
| ১৯৮৯ | সাহিত্য সেতু পুরস্কার | — |
| ১৯৯৯ | অন্নদা-স্নোসেম পুরস্কার | ‘নীললোহিতের গল্প’-এর জন্য |
| ২০০৩ | অন্নদাশঙ্কর পুরস্কার | — |
| ২০০৪ | সরস্বতী সম্মান | ‘প্রথম আলো’ উপন্যাসের জন্য |
| ২০১২ | সেরা বাঙালি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট | স্টার আনন্দ কর্তৃক |
অন্যান্য সম্মাননা
২০০২: কলকাতার শেরিফ নির্বাচিত হন
২০০৮: সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি নির্বাচিত হন
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডি.লিট উপাধি লাভ
সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি এবং অন্যান্য দায়িত্ব
২০০৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি নির্বাচিত হন । এর আগে তিনি পাঁচ বছর অকাদেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্য অকাদেমি ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়া যে কোনো সাহিত্যিকের জন্য এক বিরল সম্মান। সুনীল তাঁর জীবনে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
ব্যক্তিজীবন
বিবাহ ও পরিবার
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৬৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বাতী ব্যানার্জিকে বিবাহ করেন । তাঁদের বিবাহিত জীবনে একমাত্র পুত্র সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়, যার জন্ম ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর । সৌভিক বর্তমানে বস্টন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
ধর্মীয় দর্শন ও বিশ্বাস
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একজন নাস্তিক ও অজ্ঞেয়বাদী ছিলেন । তিনি কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করতেন না। কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল এবং সারা জীবন তিনি বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন ।
তবে মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছার বিপরীতে হিন্দু রীতি অনুযায়ী দাহ করা হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল সহজ ও ধর্মনিরপেক্ষ উপায়ে বিদায় নেওয়া। এটি একটি বিতর্কিত অধ্যায়, যা সুনীলের নিজস্ব আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই
জীবনের শেষ দিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হন । চিকিৎসার জন্য তিনি মুম্বই যান, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি মহালয়ার দিন কলকাতায় ফিরে আসেন ।
অন্তিম মুহূর্ত
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর ভোর ২টা ৫ মিনিটে দক্ষিণ কলকাতার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । মৃত্যুর কারণ ছিল হার্ট অ্যাটাক। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
শেষ শ্রদ্ধা
২৫ অক্টোবর কেওরাতলা শ্মশানে দাহ করা হয় তাঁর মরদেহ । বাংলা সাহিত্যের এই রথীকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
সেই সময় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এক শোকবার্তায় বলেছিলেন:
“গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর অনন্য শৈলীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে অন্যতম সেরা বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সৃষ্ট শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, যিনি ১৯৬৪ সাল থেকে সুনীলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, বলেছিলেন:
“সুনীলবাবুর কাছে বাংলা সাহিত্য ঋণী হয়ে থাকবে।”
বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান
অনন্য ভাষাভঙ্গি ও শৈলী
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো তিনি বাংলা গদ্য ও কাব্যে নিয়ে এসেছিলেন নতুন দিনের ভাষাভঙ্গি । ‘কৃত্তিবাস’ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে দেখিয়েছিলেন সাহিত্যের গণ্ডি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক পঠিত লেখক। একাধিক প্রজন্ম তাঁর লেখা পড়ে বড় হয়েছে । তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে প্রবীণ বয়সীরা সবাই সমানভাবে পড়েছেন সুনীলকে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দরজা খোলা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ বিশ্ববাসীর কাছে বাংলা সাহিত্যের দরজা খুলে দিয়েছে । তাঁর দুটি উপন্যাস সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রে রূপায়ন করেছিলেন । ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭০) এবং অন্যান্য চলচ্চিত্র সুনীলের কাহিনিনির্ভর ।
শেষ কথা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকার
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য এক অপূরণীয় শূন্যতার মুখে পড়েছে। কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ না হলেও তাঁর হাজার হাজার পাঠক সেই শূন্যতাকে ভালোবেসেই যাচ্ছেন—পড়ে চলেছেন ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘কাকাবাবু’, ‘নিখিলেশ ও নীরা’।
তিনি হয়তো আর নেই। কিন্তু নীললোহিত আছেন, নিখিলেশ আছেন, কাকাবাবু আছেন। আর এই চিরন্তন চরিত্রগুলোর মাধ্যমেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন চিরকাল—বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্র হয়ে, বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় ।
সুনীলের নিজের একটি কবিতার লাইন দিয়ে শেষ করি:
“বাঁচা আর মরার মাঝে আমি দাঁড়িয়ে আছে—যে মুহূর্তটুকু হাতে, তা দিয়ে আগলে রাখি পৃথিবীর মুখ।”
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সে মুহূর্তগুলো দিয়ে আজীবন আগলে রেখেছেন পৃথিবীর মুখ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুরে (অধুনা বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর কলকাতায় ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
২: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোন কোন ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তিনটি প্রধান ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন: নীললোহিত (Nil Lohit), সনাতন পাটক (Sanatan Pathak) ও নীল উপাধ্যায় (Nil Upadhyay)।
৩: কাকাবাবু সিরিজের কটি উপন্যাস আছে?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৭৪ সালে কাকাবাবু সিরিজ শুরু করেন এবং মোট ৩৬টিরও বেশি কাকাবাবু উপন্যাস রচনা করেন। এগুলো বেশিরভাগই আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।
৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোন উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘সেই সময়’ (Sei Somoy)-এর জন্য ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
৫: ‘নিখিলেশ ও নীরা’ কাব্যগ্রন্থটি কাদের নিয়ে?
‘নিখিলেশ ও নীরা’ সিরিজ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ। এটি নিখিলেশ ও নীরা নামের দুই চরিত্রের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে রচিত। ইংরেজিতে ‘ফর ইউ, নীরা’ ও ‘মারমার ইন দ্য উডস’ নামে অনূদিত হয়েছে।
৭: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সর্বশেষ পুরস্কার কোনটি?
তাঁর জীবদ্দশায় সর্বশেষ বড় পুরস্কার হলো ২০১২ সালে স্টার আনন্দ কর্তৃক প্রদত্ত ‘সেরা বাঙালি লাইফটাইম অ্যাচিভেমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’।




