সূচি
Toggleযিনি যুগের আবহ বদলে দিয়েছিলেন
ঊনবিংশ শতকের বাংলার ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম চির উজ্জ্বল হয়ে আছে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাদের অন্যতম। শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, গদ্যকার, দার্শনিক, মানবহিতৈষী—একাধারে তিনি ছিলেন এক ‘বহুবর্ণ’ প্রতিভা। তবে খেতাব আর পরিচয়ের উর্ধ্বে বিদ্যাসাগর মূলত ছিলেন এক যুগান্তকারী মানসিকতার মানুষ, যিনি নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি ও কঠোর পরিশ্রমকে পাথেয় করে বাংলার সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার ভিত বদলে দিয়েছিলেন।
বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ‘দয়ার সাগর’ । দরিদ্র, পীড়িত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে নয়—বরং নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে পরের উপকার করাকে তিনি জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিধবা বিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নির্মূলে তার অনন্য সংগ্রাম বাংলার সমাজ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আশ্চর্য এক মন্তব্য করেছিলেন: “One wonders how God, in the process of producing forty million Bengalis, produced a man!” অর্থাৎ, ঈশ্বর কীভাবে চল্লিশ মিলিয়ন বাঙালির মধ্যে একজন ‘মানুষ’ তৈরি করলেন, তা ভাবলে আশ্চর্য হয়।
এই জীবনীতে আমরা বিদ্যাসাগরের শৈশব, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও সমাজসংস্কারের আন্দোলনের পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যকর্ম ও দানের মহিমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শৈশব ও বংশ পরিচয়
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২২৭ সালের ১২ আশ্বিন, মঙ্গলবার) বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । সে সময় বীরসিংহ হুগলি জেলার অংশ ছিল। ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির অধীনে এই গ্রামটি ছিল দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের বাসস্থান।
বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় । পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভগবতী দেবী । বিদ্যাসাগরের পূর্বপুরুষগণ অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বনমালীপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন ।
পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ
ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা পুরুষ । তিনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। রামজয় দেশত্যাগী হলে বিদ্যাসাগরের ঠাকুমা দুর্গাদেবী বীরসিংহে এসে বসবাস শুরু করেন ।
পিতা ঠাকুরদাস কলকাতায় স্বল্প বেতনের চাকরি করতেন। পরিবার নিয়ে শহরে বাস করা তার সাধ্যের অতীত ছিল বলে বালক ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ও ঠাকুমার সঙ্গে বাস করতেন ।
‘ন্যাঁড়া’ ডাকনাম
পরিবারের স্নেহে বিদ্যাসাগরের ডাকনাম ছিল ‘ন্যাঁড়া’ (অর্থাৎ যার চুল নেই বা যার মাথার যত্ন নেওয়া হয় না)। এটি একটি ভক্তিমূলক ডাকনাম, যা মঙ্গলসূচক হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
বিবাহ
সেকালের প্রথা অনুযায়ী বিদ্যাসাগর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । তাঁর স্ত্রীর নাম দীনময়ী দেবী । নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (নারায়ণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) ছিলেন তাঁদের একমাত্র পুত্র ।
শিক্ষাজীবন: মেধার স্বাক্ষর
গ্রামের পাঠশালায় হাতেখড়ি
চার বছর নয় মাস বয়সে পিতা ঠাকুরদাস বালক ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন । কিন্তু সনাতন বিশ্বাস বিদ্যাদানের চেয়ে শাস্তিদানেই অধিক আনন্দ পেতেন। সেই কারণে রামজয় তর্কভূষণের উদ্যোগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক উৎসাহী যুবক বীরসিংহ গ্রামে একটি নতুন পাঠশালা স্থাপন করেন ।
আট বছর বয়সে এই পাঠশালায় ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। তাঁর চোখে কালীকান্ত ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। কালীকান্তের পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন ।
কলকাতা অভিযান ও সংস্কৃত কলেজে ভর্তি
১৮২৮ সালের নভেম্বর মাসে পাঠশালার শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পিতার সঙ্গে কলকাতায় আসেন । উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তারা পদব্রজে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় এসেছিলেন—অভাবের সংসারে যাতায়াতের খরচ জোগানো ছিল দুষ্কর । পথের ধারে মাইলফলকে ইংরেজি সংখ্যাগুলি দেখে তিনি সেগুলি অল্প আয়াসেই আয়ত্ত করেছিলেন ।
১৮২৯ সালের ১ জুন সোমবার কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে (বর্তমান সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল) ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন বিদ্যাসাগর । তার বয়স তখন মাত্র নয় বছর।
অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায়
বিদ্যাসাগরের কঠোর অধ্যবসায়ের একটি উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্যের কারণে বাড়িতে বাতির তেলের সঙ্গত ছিল না। তাই তিনি রাস্তার আলো পড়ে পড়াশোনা করতেন ।
সে যুগে রাত জেগে পড়া ও প্রচুর বই পড়ার প্রচলন সাধারণত ছিল না। কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন অপব্যয়ী—সময় ও শক্তির ব্যাপারে তিনি কৃপণতা জানতেন না। এই অসাধারণ মেধার স্বীকৃতি হিসেবে সংস্কৃত কলেজ থেকে ‘বিদ্যাসাগর’ (অর্থাৎ ‘জ্ঞানের সাগর’) উপাধি লাভ করেন তিনি । ১৮৪১ সালে কলেজ থেকে স্নাতক হন ।
শিক্ষাজীবনের মাইলফলকসমূহ
| বছর | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
|---|---|
| ১৮২৮ | কলকাতায় আগমন |
| ১৮২৯ | সংস্কৃত কলেজে ভর্তি |
| ১৮৩০ | ইংরেজি শ্রেণিতে ভর্তি |
| ১৮৩১ | বার্ষিক পরীক্ষায় মাসিক ৫ টাকা বৃত্তি ও ৮ টাকা পারিতোষিক প্রাপ্তি |
| ১৮৩৩ | ‘পে স্টুডেন্ট’ হিসেবে ২ টাকা বৃত্তি প্রাপ্তি |
| ১৮৩৪ | বিবাহ ও ৫ টাকা মূল্যের পুস্তক পারিতোষিক প্রাপ্তি |
| ১৮৩৫ | পলিটিক্যাল রিডার নং ৩ ও ইংলিশ রিডার নং ২ পারিতোষিক প্রাপ্তি |
| ১৮৩৬ | অলংকার পাঠ সমাপ্তি ও রঘুবংশম্, সাহিত্য দর্পণ প্রভৃতি গ্রন্থ পারিতোষিক প্রাপ্তি |
| ১৮৩৭ | মাসিক বৃত্তি ৮ টাকা বৃদ্ধি, স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি |
| ১৮৩৯ | হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ |
| ১৮৪১ | সংস্কৃত কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন |
কর্মজীবন: শিক্ষাবিদ থেকে সমাজসংস্কারক
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ (১৮৪১-১৮৫৮)
১৮৪১ সালের ডিসেম্বরে সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করার কিছুদিনের মধ্যেই বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন ।
১৮৪৬ সালে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ছেড়ে সংস্কৃত কলেজে ‘সহকারী সম্পাদক’ (সহকারী সেক্রেটারি) পদে যোগ দেন । প্রথম বছরেই তিনি বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। কিন্তু এই প্রতিবেদন তার ও কলেজের সম্পাদক রসময় দত্তের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি করে ।
১৮৪৯ সালে রসময় দত্তের পরামর্শের বিপরীতে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পুনরায় যোগ দেন—এবার একজন ‘হেড ক্লার্ক’ হিসেবে ।
১৮৫০ সালের ডিসেম্বরে ফের সংস্কৃত কলেজে যোগ দেন—এবার সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে । পরের মাসেই তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন । অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের নিয়মকানুনে বিপ্লব এনেছিলেন:
কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাত্রদের জন্য সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়ে সকল হিন্দুর জন্য কলেজের দরজা খুলে দেন
নূন্যতম টিউশন ফি চালু করেন
চান্দ্র মাসের ১ম ও ৮ম দিনের পরিবর্তে রবিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন করেন
সংস্কৃত ব্যাকরণ ও গণিতের পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমেও শিক্ষাদান শুরু করেন
১৮৫৫ সালের মে মাসে, উডের শিক্ষা সনদ (১৮৫৪) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে, সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের কাজের পাশাপাশি বিদ্যাসাগরকে চারটি জেলায় ইংরেজি স্কুল পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া হয় । তিনি নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় বাংলা স্কুল স্থাপন করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে মোট ২০টি স্কুল নির্মাণে ভূমিকা রাখেন । এছাড়া শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য একটি ‘নরমাল স্কুল’ স্থাপন করেন এবং নিজ গ্রামে নিজ অর্থায়নে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ।
বালিকা শিক্ষার অগ্রদূত
বালিকা শিক্ষা তৎকালীন সমাজে ছিল নিষিদ্ধ ও কলঙ্কের বিষয়। কিন্তু বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষারও একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ১৮৫৭ সালের মে মাসে তিনি বর্ধমানে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করেন । ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে তিনি ৩৪টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন । তিনি ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (পরবর্তীকালে বেথুন ফিমেল স্কুল) নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ।
মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা (১৮৫৯-১৮৭২)
বিদ্যাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন। এটি প্রথম ১৮৫৯ সালে ধনী হিন্দু পরিবারের ছাত্রদের ইংরেজি প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় হিসেবে শুরু হলেও ১৮৬১ সালের মধ্যে তা শক্তি হারায় । ১৮৬৪ সালে বিদ্যাসাগর এর দায়িত্ব নেন এবং এর নামকরণ করেন হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে এটি প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং ১৮৭৯ সালে ডিগ্রি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ।
বিদ্যাসাগর নিজের অর্থেই উচ্চশিক্ষা সাশ্রয়ী করতে এই কলেজ স্থাপন করেছিলেন। কলেজ থেকে আয় তিনি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ব্যয় করতেন।
বাংলা গদ্য ও লিপি সংস্কার
বাংলা গদ্যের জনক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি “বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী” । রামমোহন রায়ের যুগে বাংলা গদ্য তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম হলেও তা শিল্পের স্তরে উন্নীত হয়নি। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে তথ্যবাহী যন্ত্রের বদলে রসময় ও প্রাঞ্জল ভাষায় পরিণত করেন ।
তিনি বিরাম চিহ্ন (কমা, দাঁড়ি প্রভৃতি) ব্যবহারের পদ্ধতি চালু করে বাংলা গদ্যে যতি ও অর্থের মিলন ঘটান। পূর্বে বাংলা লিখনে কেবল ‘।’ (দাঁড়ি) ও ‘॥’ (দ্বি-দাঁড়ি) ব্যবহারের চল ছিল। বিদ্যাসাগর কমা, সেমিকোলন, কোলন ইত্যাদি বিরাম চিহ্ন বাংলা ভাষায় প্রবর্তন করেন ।
বর্ণপরিচয় ও লিপি সংস্কার
বর্ণপরিচয়’ (প্রথম প্রকাশ ১৮৫৪) বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ । অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলা অক্ষরজ্ঞান লাভের জন্য এটি ছিল একমাত্র ভরসা এবং শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হতো। প্রায় এককথায় বলা চলে, তৎকালীন বাংলা শিক্ষার ভিত গড়ে তুলতে বিদ্যাসাগরের এই বইটির ভূমিকা অসীম।
তিনি বাংলা লিপি ও টাইপকে যুক্তিবহ ও সহজপাঠ্য করার জন্য সংস্কার সাধন করেছিলেন, যা তখন থেকে চার্লস উইলকিন্সের (১৭৮০) সময় পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল ।
প্রধান সাহিত্যকর্মসমূহ
বিদ্যাসাগর সংস্কৃত, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর গ্রন্থাবলির মধ্যে কয়েকটি কালজয়ী সৃষ্টি নিচে তালিকাভুক্ত করা হলো:
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল | টীকা |
|---|---|---|
| বেতাল পঞ্চবিংশতি | ১৮৪৭ | সংস্কৃত থেকে অনূদিত |
| বাঙ্গালার ইতিহাস | ১৮৪৮ | |
| জীবনচরিত | ১৮৫০ | |
| বোধোদয় | ১৮৫১ | শিশুপাঠ্য |
| উপক্রমণিকা (ব্যাকরণ) | ১৮৫১ | সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ |
| বর্ণপরিচয় (ভাগ ১ ও ২) | ১৮৫৪-১৮৫৫ | সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য |
| শকুন্তলা | ১৮৫৪ | কালিদাসের নাটক অনুবাদ |
| কথামালা | ১৮৫৬ | নীতিশিক্ষামূলক গল্পসংকলন |
| বিধবা বিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব (২ খণ্ড) | ১৮৫৫ | সমাজসংস্কারের দলিল |
| সীতার বনবাস | ১৮৬০ | ১৮৬২-তেও সংস্করণ প্রকাশিত |
বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অনুবাদের চেয়ে ‘অভিযোজন’। উদাহরণস্বরূপ:
বেতাল পঞ্চবিংশতি: তিনি মাত্র অনুবাদ করেননি; বেতালের গল্পগুলো আধুনিক পাঠকের উপযোগী করে সরল, প্রকাশভঙ্গিতে পুনর্বিন্যস্ত করেছিলেন
শকুন্তলা: কালিদাসের মূল নাটক অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি শকুন্তলাকে বাঙালি হয়ে উঠতে দিয়েছিলেন
কমেডি অফ এররস (শেকসপিয়ার): বাংলায় ঠাট্টা-হাসির ন্যারেটিভ স্টাইলে রূপান্তরিত করে নতুনত্ব এনেছিলেন
সীতার বনবাস: রামায়ণের কাহিনি পুনর্কথনের সময় বাল্মীকি বা তুলসীদাসের পথ ধরে সীতার চরিত্রে করুণার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন
সমাজসংস্কার আন্দোলন: ‘দয়ার সাগর’ পরিচিতির উৎস
ঊনবিংশ শতকের বাংলা সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারে জর্জরিত। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও বিধবা নারীদের অমানবিক জীবনযাপনের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর এককভাবে সংগ্রাম করে গেছেন। এ কারণেই তিনি ‘দয়ার সাগর’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন । মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন: তিনি যেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি এক করে নিয়ে এসেছিলেন ।
বিধবা বিবাহ আন্দোলন
উনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু বিধবাদের অবস্থা ছিল নিতান্ত দুর্দশাগ্রস্ত। কুলীন ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহ প্রথা বলে বাল্যকালে অনেক মেয়ে বিধবা হয়ে যেত। তাদের সাদা শাড়ি পরতে হতো, মাথা মুণ্ডন করা হতো, ঘরের কাজে দিন কাটাতে হতো—এক কথায় সমাজের চোখে তারা ‘অশুচি’ ও ‘অভাগা’ বলে কলঙ্কিত হতো ।
বিদ্যাসাগর ১৮৪২ সালে ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’-এ বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রথম নিবন্ধ লেখেন । পরে ১৮৫৫ সালে ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন ।
৪ অক্টোবর, ১৮৫৫ সালে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ আইন করার জন্য সরকারের কাছে একটি স্মারক জমা দেন, যার ওপরে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন । কিন্তু রক্ষণশীল হিন্দুরা প্রায় ২৮টি বিপরীত আবেদন ও ৫৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা দিয়ে আইনটির তীব্র বিরোধিতা করে । তবু তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি এই আইন পাস করতে উৎসাহ দেন। অবশেষে ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ (পঞ্চদশ আইন, ১৮৫৬) পাস হয় । আইন পাস হওয়ার পর সে বছর ডিসেম্বর মাসে বিদ্যাসাগর নিজের চেষ্টায় প্রথম হিন্দু বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন ।
বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বিরোধিতা
বিদ্যাসাগর কেবল বিধবা বিবাহের পক্ষে সওয়ালই করেননি; তিনি বাল্যবিবাহ রোধেও একের পর এক যুক্তি দিয়েছেন। ১৮৯১ সালে তাঁর প্রচেষ্টার ফলে ‘কনসেন্ট অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে স্বামীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের ন্যূনতম বয়স ১২ বছর নির্ধারণ করে দেয় । তিনি বেদ ও স্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে কুলীন বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের কোন শাস্ত্রীয় অবকাশ নেই ।
মানবদরদী ‘দয়ার সাগর’ ও দর্শন
বিদ্যাসাগরের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিকটি হলো দানশীলতা ও বিপদে বন্ধুত্ব। তিনি জীবনভর নিজের উপার্জনের সিংহভাগ দান করে গেছেন। একাধিক দরিদ্র শিক্ষার্থীকে তিনি বৃত্তি দিয়ে পড়িয়েছেন, শতাধিক বিধবা ও অসহায় মানুষকে প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা দিতেন । এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ করে পরোপকার করেছেন ।
এই কারণেই সাধারণ মানুষ তাকে ‘দয়ার সাগর’ বলে ডাকতেন ।
সাঁওতাল পরগণায় কর্ম
শিক্ষকতা থেকে অবসরের পর বিদ্যাসাগর কিছুকাল সাঁওতাল পরগণায় (অধুনা ঝাড়খণ্ড) কাটান। সেখানে তিনি অসহায় সাঁওতাল, দরিদ্র ও পীড়িত মানুষের চিকিৎসার জন্য বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি স্থাপন করেন । স্থানীয় উপজাতিদের জীবনের দুর্দশা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন—এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিবছর ভাতা ও অর্থ সাহায্য দিয়ে সাহায্য করতেন।
ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ
বিদ্যাসাগর ও রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ বাঙালির ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে তাঁর কালী মন্দিরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর মূর্তিপূজাকে সরাসরি সমর্থন না করলেও সংকীর্ণতার বশবর্তী না হয়ে যুক্তিপূর্ণ তর্কই করেছিলেন । যদিও শেষ পর্যন্ত দুই মহান ব্যক্তির মধ্যে মতের আদান-প্রদান পুরোপুরি মিলিত হয়নি। কিন্তু দুই জনের স্মরণীয় সাক্ষাৎ বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় ১৮৯০-এর দশকের শুরু থেকেই বিদ্যাসাগর কলকাতায় স্থায়ীভাবে অবস্থান করতেন। তাঁর শেষ দিনগুলি উত্তর কলকাতার বাদুড়বাগান অঞ্চলে কাটে ।
১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই (বাংলা ১২৯৮ সালের ১৩ শ্রাবণ) কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহামানব । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।
উত্তরাধিকার ও স্মারক
বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে বাংলা সমাজ ও সাহিত্য অপরিমেয় শূন্যতার মুখে পড়ে। তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন নানা স্মারকে:
বিদ্যাসাগর সেতু (দ্বিতীয় হুগলি সেতু), কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী বিখ্যাত সেতুটি
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়—পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় প্রতিষ্ঠিত
কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে বিদ্যাসাগর স্ট্রিট
নিয়মিত বিদ্যাসাগর মেলা—শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আয়োজিত
বারাসতে বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গন (স্টেডিয়াম)
বিদ্যাসাগর হল, আইআইটি খড়গপুর
বিবিসি বাংলার সর্বকালের সেরা ২০ বাঙালির তালিকায় অষ্টম স্থান (২০০৪)
‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’—পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত
বিদ্যাসাগর ১৮৭৭ সালে ‘কম্প্যানিয়ন অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ (সিআইই) উপাধিতে ভূষিত হন , যা ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া একটি বিরল সম্মান।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম কী ছিল?
বিদ্যাসাগরের প্রকৃত নাম ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় । তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পেয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ।
২: ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধির অর্থ কী?
‘বিদ্যাসাগর’ একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ‘জ্ঞানের সাগর’ (‘বিদ্যা’ মানে জ্ঞান, ‘সাগর’ মানে সমুদ্র) ।
৩: বিদ্যাসাগরের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?
বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২২৭ সালের ১২ আশ্বিন) বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই (১৩ শ্রাবণ) কলকাতায় ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ।
৪: বিদ্যাসাগর কেন ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত?
দরিদ্র, পীড়িত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি অসীম দয়া ও দানশীলতার কারণে বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামে পরিচিত হন। নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি দান করতে কুণ্ঠিত হতেন না ।
৫: বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ কোনটি?
বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো ‘বর্ণপরিচয়’ (প্রথম প্রকাশ ১৮৫৪), যা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলা বর্ণমালা শিক্ষার একমাত্র আদর্শ পাঠ্য ছিল । এছাড়া ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’, ‘সীতার বনবাস’ ও ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ অমর সৃষ্টি।
৬: বিধবা বিবাহ আইন পাসে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?
বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ১৮৫৫ সালে সরকারের কাছে স্মারক জমা দেন। রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৮৫৬ সালে ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয় এবং বিদ্যাসাগর সেই বছরই প্রথম বিধবা বিবাহ সম্পন্ন করেন ।
৭: বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় কী অবদান রেখেছেন?
বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে প্রাঞ্জল ও রসময় করে তোলেন; বিরাম চিহ্ন (কমা, সেমিকোলন) বাংলায় প্রবর্তন করেন; ‘বর্ণপরিচয়’ রচনা করে বাংলা বর্ণমালা শিক্ষায় বিপ্লব আনেন; বাংলা টাইপ ও লিপিকে যুক্তিবহ করে তোলেন; এবং বাংলা সাহিত্যে অনুবাদকে ‘অভিযোজনে’ পরিণত করেন।
৮: বিদ্যাসাগর কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন?
বিদ্যাসাগর ১৮৫১ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন । তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত, সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৯: বাল্যবিবাহ রোধে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা কী ছিল?
বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৯১ সালে ‘এজ অফ কনসেন্ট অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা মেয়েদের বৈবাহিক দৈহিক সম্পর্কের ন্যূনতম বয়স ১২ বছর নির্ধারণ করে ।
১০: সমালোচক ও কবিরা বিদ্যাসাগরকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, কীভাবে চল্লিশ মিলিয়ন বাঙালির মধ্যে একজন ‘মানুষ’ তৈরি হলেন । মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগরকে দেখেছেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তির মূর্ত প্রতীক হিসেবে।
উপসংহার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলার ইতিহাসে এক অমল দীপ্তিময় নাম। শুধু ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের নক্ষত্র হিসেবেই নয়, বরং চিরন্তন মানবতার প্রতীক হিসেবেও তিনি চিরভাস্বর। পিতার অভাবে যাঁর শৈশব কেটেছে অভাবের মধ্যে, যাঁকে রাস্তার আলোয় পড়তে হয়েছে, সেই মানুষটিই একদিন বাংলা গদ্যের স্বরূপ নির্ণয় করলেন, ‘বর্ণপরিচয়’-এর মতো অমর গ্রন্থ রচনা করলেন, বাংলা যুক্তাক্ষর ও যতিচিহ্নকে সহজ করে তুললেন। কিন্তু তাঁর কৃতিত্বের পাল্লা শিক্ষা ও সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজসংস্কারে গিয়ে ঠেকল—সেখানেই তিনি ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করলেন।
তিনি একাই প্রায় পাহাড়সম রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিধবা বিবাহ আইন পাস করালেন, নারীশিক্ষার পক্ষে কলম ধরলেন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের শাস্ত্রীয় কোন অবকাশ নেই—সেটা অকপটে প্রমাণ করে গেলেন। প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখেও তিনি কুণ্ঠিত হননি। অর্থাভাবে তবু তিনি মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) গড়ে তুললেন নিজ উদ্যোগে ও অর্থে, যেখানে যে কোনো বর্ণের ছাত্র ঢোকার অধিকার পেল, যে কোনো ছাত্র নূন্যতম বেতনে মানসম্মত শিক্ষা লাভ করল।
আর তাঁর দানশীলতা? দীনময়ীকে নিয়ে সংসার, নিজের ছেলে সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা—তবুও উপার্জনের প্রায় পুরো অংশটাই দিয়ে দিতেন দরিদ্র, বিধবা ও অসহায় মানুষদের জন্য। দারিদ্র্যকে জয় করে বিদ্যাসাগরের মতো মনের মানুষ ‘দয়ার সাগর’ না হলে আর কাকে বলে?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন বলেছিলেন, তিনি যেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মোদ্যম ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি নিয়ে জন্মেছিলেন। আজ, বিদ্যাসাগরের প্রায় দেড়শো বছর পরেও যখন আমরা ‘বর্ণপরিচয়’-এর পাতা উল্টাই, ব্রাহ্মণ-বৈদ্যের গন্ডি ভাঙা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ি, বিধবা বিবাহ ও বাল্যবিবাহ আইনের সুরক্ষা পাই—তখন বোঝা যায়, এই মানুষটি চিরকাল বেঁচে থাকার মতো করে লিখে গেছেন ইতিহাসের এক সোনার অক্ষর। বাংলার নবজাগরণে বিদ্যাসাগর এক অনিবার্য নাম—ভালো থাকবেন তিনি বাংলার প্রতিটি বর্ণমালার গায়ে, প্রতিটি মানবিক আইনের পিঠে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়কম্পনে। বিদ্যাসাগর অমর, মানবতা অমর।




