( লেখাটি পড়তে প্রায় 7 মিনিট সময় লাগতে পারে )

চরিত্রহীন উপন্যাস শরৎচন্দ্র: বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত ও চিরকালীন রচনা

সূচি

যে উপন্যাস আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু রচনা আছে যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ সেই বিরল সৃষ্টিগুলোর একটি। ১৯১৭ সালে বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছিল এক তুমুল বিতর্ক । সমাজের ‘সুশীল’ মহল থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক—সবাই যেন এই উপন্যাস নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।

উপন্যাসের নামকরণটাই যেন এক চ্যালেঞ্জ। ‘চরিত্রহীন’—এই শব্দটি সমাজের সবচেয়ে বড় অভিশাপ। এই নাম দিয়েই শরৎচন্দ্র যেন সমাজের মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিলেন এক প্রশ্ন—সমাজ যাকে ‘চরিত্রহীন’ বলে বিচার করে, সে কি সত্যিই চরিত্রহীন? নাকি সমাজের সংকীর্ণ মূল্যবোধের নিরিখেই এই বিচার?

এই নিবন্ধে আমরা ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের কাহিনি, চরিত্র, বিতর্কের ইতিহাস, সমালোচকদের মত ও শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

রচনার ইতিহাস ও প্রকাশকাল

শরৎচন্দ্র ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন বার্মার রেঙ্গুনে থাকাকালীন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই উপন্যাসের প্রথম ভাগ আর শেষ ভাগের রচনার মধ্যে বেশ কয়েকবছরের ব্যবধান ছিল। শরৎচন্দ্র নিজেই স্বীকার করেছিলেন, উপন্যাসটির প্রথম অর্ধেক তিনি যৌবনে লিখেছিলেন এবং পরে শেষ করেছিলেন । এই দীর্ঘ ব্যবধান উপন্যাসের কাঠামোতে কিছু ‘ছড়ানো ভাব’ এনেছিল—যা কিছু সমালোচকের নজর এড়ায়নি।

উপন্যাসটি ১৯১৭ সালের ১১ নভেম্বর সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় । প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হয়। সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজ উপন্যাসটির নারীচরিত্রদের নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলে। বিশেষ করে কিরণময়ী ও সাবিত্রী চরিত্র দুটিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়

উপন্যাসের পটভূমি ও কাহিনি সংক্ষেপ

সময় ও স্থান

উপন্যাসটির পটভূমি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাংলা সমাজ। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে তখনও সামাজিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির শেকল বাঙালি সমাজকে বেঁধে রেখেছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল নানা বিধিনিষেধ

মূল কাহিনি

‘চরিত্রহীন’-এর কাহিনি জটিল ও বহুস্তরীয়। এটি উপেন্দ্র নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যার চারপাশে ঘুরপাক খায় চারজন নারীর জীবন—সাবিত্রী, কিরণময়ী, সুরবালা ও সরোজিনী

উপন্যাসের কাহিনিতে দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, প্রতারণা ও আত্মত্যাগের এক জটিল জাল। উপেন্দ্র তার স্ত্রী সুরবালাকে খুব ভালোবাসেন এবং তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অন্যদিকে সতীশ ও সাবিত্রীর সম্পর্ক সামাজিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়

সমাজের চোখে ‘চরিত্রহীন’ বলে চিহ্নিত নারীরাই এ উপন্যাসের প্রকৃত নায়িকা। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন, সমাজ যাদের বিচার করে, তারা আসলে কতটা পবিত্র, কতটা আত্মত্যাগী হতে পারে

চরিত্র বিশ্লেষণ: উপন্যাসের প্রাণপুরুষ ও নায়িকারা

চার নারী চরিত্র: ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র রয়েছে। এদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্ব ও জীবনদর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন :

চরিত্রবৈশিষ্ট্যবিশেষত্ব
সাবিত্রীকুলট ঘরের মেয়ে, বিধবা। সতীশের প্রতি অনুগত ও নিবেদিতপ্রাণবিশুদ্ধ, আত্মত্যাগী
কিরণময়ীপঙ্গু স্বামী হরণের স্ত্রী। সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, কিন্তু প্রচলিত নীতিধর্মে অবিশ্বাসিনীবিদ্রোহী, আধুনিক চিন্তার
সুরবালাউপেন্দ্রের স্ত্রী। ধর্মীয় গ্রন্থে অন্ধবিশ্বাসীরক্ষণশীল, ঐতিহ্যবাদী
সরোজিনীপাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, আধুনিক চিন্তাধারার অধিকারিণীপ্রগতিশীল, স্বাধীনচেতা

সাবিত্রী: চিরন্তন আত্মত্যাগের প্রতীক

সাবিত্রী উপন্যাসের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র। তিনি একজন বিধবা, দেহে-মনে পবিত্র জেনেও সমাজের চোখে নিজেকে পাপী মনে করেছেন । হিন্দু ধর্মের সনাতন মূল্যবোধে বিশ্বাস স্থাপন করেই বিধবা সাবিত্রী বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে সতীশের বিয়ের প্রস্তাবকে

তিনি সতীশের মেসে কাজ করতেন। অপরের লুব্ধদৃষ্টি তাঁর উপর পড়েছিল বলে তিনি নিজেকে অশুচি মনে করতেন। কিন্তু তাঁর ব্যবহার ছিল অতিশয় ভদ্র, সংযত ও মাধুর্যমণ্ডিত। সাবিত্রীর চরিত্রমাধুর্যের প্রভাবে পড়ে বেপরোয়া ও নেশাসক্ত সতীশের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল

কিরণময়ী: নিন্দিত বিদ্রোহী

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল ও আকর্ষণীয় চরিত্র কিরণময়ী । তিনি একজন পঙ্গু স্বামীর স্ত্রী। নারীসুলভ চরিত্রের কারণে স্বামীর কাছ থেকে সুখ বঞ্চিত হয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর উপেন্দ্রর প্রেমে পড়ে প্রত্যাখ্যান পেয়ে তিনি পালক ভাই দিবাকরের সঙ্গে মিথ্যে প্রেমের অভিনয় করেন, যাতে উপেন্দ্রকে অপমান করা যায়

কিরণময়ী প্রচলিত নীতিধর্মে অবিশ্বাসিনী ছিলেন। প্রাচীন শাস্ত্রবচনগুলিকে তিনি কানাকড়িরও মূল্য দিতেন না । কিন্তু মনে মনে তিনি পাতিব্রত্যের আদর্শের একান্ত গুণমুগ্ধা ছিলেন এবং নিজ জীবনে সেটার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে নিজের উপরেই বীতশ্রদ্ধা

শেষ পর্যন্ত কিরণময়ী পাগল হয়ে যায়। এটি অন্য কোন কারণে নয়, সে তাঁর বাইরের বিদ্রোহ ও অশ্রদ্ধাপরায়ণতার সঙ্গে ভিতরের পবিত্রতার অভিলাষের সামঞ্জস্য ঘটাতে পারেনি বলে

সরোজিনী ও সুরবালা

সরোজিনী শেষ পর্যন্ত সতীশকে বিয়ে করেন । তিনি শিক্ষিত ও আধুনিক ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে সুরবালা (উপেনের স্ত্রী) উপন্যাসের শেষে যক্ষ্মা রোগে মারা যান

পুরুষ চরিত্র: সতীশ, উপেন্দ্র ও দিবাকর

নারী চরিত্রগুলোর মতো পুরুষ চরিত্রগুলিও সমান জটিল।

সতীশকে উপন্যাসের নায়ক বলা যেতে পারে। তিনি একজন বেপরোয়া, নেশাসক্ত যুবক। কিন্তু সাবিত্রীর চরিত্রমাধুর্যের প্রভাবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়

উপেন্দ্র উপন্যাসটির স্নায়ুকেন্দ্র। তাঁর চারপাশেই আবর্তিত হয় প্রেম, টানাপোড়েন, আত্মত্যাগ আর দায়িত্ববোধের চিত্র । কিরণময়ীর প্রতি তাঁর নির্লিপ্ত ভালোবাসা ও সতীশ-সাবিত্রী সম্পর্কের প্রতি তাঁর আত্মবিসর্জন মিশ্র মনস্তত্ত্বের গভীরতা প্রকাশ করে

দিবাকর একজন অনাথ, কিরণময়ীর পালক ভাই। তিনি শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তবে শেষ দিকে কিরণময়ীর সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনভাবে কাজ করেন

‘চরিত্রহীন’ নামকরণের রহস্য ও কাহিনি

এই উপন্যাসের নামকরণ নিয়ে একটি মজার ইতিহাস রয়েছে। ‘চরিত্রহীন’ বাজারে আসার পরপরই ‘কল্লোলিনী কলিকাতা’য় আবির্ভাব ঘটে আরেক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। এই নকল শরৎচন্দ্র বাজারে ছাড়েন ‘চাঁদমুখো’, ‘হীরের দুল’, ‘শুভলগ্ন’—একাধিক উপন্যাস

ফলে পাঠক ও সমালোচকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তি—কে আসল আর কে নকল শরৎচন্দ্র? একদিন এক আড্ডায় শরৎচন্দ্রের এক রসিক বন্ধু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাংলায় তো শরৎ এখন দুজন; তো হে, আপনি কোনজন?” শরৎবাবু তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, “আমি ‘চরিত্রহীন’ শরৎচন্দ্র!”

এই রসিকতার সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে তাঁর এই বিশেষণটি ‘আমি চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। যদিও এটি এক রসিকতা মাত্র, কিন্তু শরৎচন্দ্রের আত্মব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মনোভাব এখানে স্পষ্ট।

এই ঘটনা ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটির নাম ও স্রষ্টার সঙ্গে এক অমোঘ সম্পর্ক তৈরি করে দেয়। জনপ্রিয় কথায় শরৎচন্দ্র এখন ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’, কিন্তু এক সময় তিনি ‘চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’ নামেও পরিচিত ছিলেন।

বিতর্ক ও সমালোচনা

‘চরিত্রহীন’ প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠেছিল কিরণময়ী ও সাবিত্রী চরিত্র দুটি নিয়ে

কেন বিতর্কিত?

সেই সময়ের রক্ষণশীল সমালোচকরা কিরণময়ী ও সাবিত্রীর ‘নীতিহীন’ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, এই চরিত্রগুলো সমাজের প্রচলিত নৈতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। কিরণময়ীর সংস্কারমুক্ত কথাবার্তা ও আচরণের ধরন, সাবিত্রীর ‘অশুচি’ জীবনযাপন—সব মিলিয়ে উপন্যাসটিকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দেওয়া হয়

কিন্তু শরৎচন্দ্রের সমর্থকরা যুক্তি দেখান—এই চরিত্রগুলোর মূল প্রবণতা তো প্রেমতন্ময়তার দিকে, পরিবেশের ক্লেদ থেকে উদ্ধার লাভ করে নির্মল হওয়ার দিকে। এমন চরিত্রে কেমন করে নীতিহীনতার কলুষ আরোপ করা যায়?

শরৎচন্দ্রের ‘Strictly Moral’ অবস্থান

শরৎচন্দ্র তাঁর বাল্যবন্ধু প্রমথনাথ ভট্টাচার্যকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন:

“তোমরা চরিত্রহীন নিয়ে এত শোরগোল করছ, কিন্তু তোমরা দেখো এর সমাপ্তিটি আমি ‘strictly moral’ করে আঁকব।”

এই ‘strictly moral’ কথাটির ব্যঞ্জনা লক্ষণীয়। শরৎচন্দ্রের অভিলষিত ‘morality’র ধারণায় মানব-স্বভাবকে ছাপিয়ে সামাজিক অনুশাসনের প্রবলতার কোন স্থান ছিল না। মানব-স্বভাবের নিজস্ব নীতিনিয়মকে স্বীকার করে নেওয়ার বলিষ্ঠতাই ছিল তাঁর কাঙ্ক্ষিত নীতি

শরৎ বনাম বঙ্কিম

সমালোচকদের আরেকটি আপত্তি ছিল ‘চরিত্রহীনের’ সমাপ্তি নিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রোহিণী’ চরিত্রটি সমাজের রূঢ় নিয়মের শিকার হয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। কিন্তু কিরণময়ীর বেলায় শরৎচন্দ্র তেমন নিষ্ঠুর শাস্তির প্রক্রিয়ায় যাননি

শরৎচন্দ্র কিরণময়ীর স্বভাবকে অনুসরণ করে তাঁর পরিণতি যেমন হওয়া উচিত, সেটাই দেখিয়েছিলেন; বঙ্কিমচন্দ্রের মতো শাসনদণ্ড উদ্যত করে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাগল বানাননি

উপন্যাসের মূল বক্তব্য: ‘চরিত্র’ বিচার নিয়ে প্রশ্ন

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—সমাজের বিচার কতটা সঠিক?

শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন, চরিত্র বিচারে সমাজের প্রচলিত রটনানির্ভর মূল্যায়নের অযৌক্তিকতা ও অন্তঃসারশূন্যতাই প্রকৃত সমস্যা । সমাজ যাকে ‘চরিত্রহীন’ বলে দোষারোপ করে, বাস্তবে সে অনেক সময়ই পরিস্থিতির শিকার এবং ভেতরে ভীষণ মানবিক

উপন্যাসের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র পাঠককে প্রশ্ন করেন—কার চরিত্র সত্যিই ‘হীন’? যে নারী নিজের ভালোবাসার মানুষটির ভালোর জন্য বারবার নিজের সুখ বিসর্জন দেয়? না যে সমাজ প্রচলিত আচারের নামে মানুষকে বিচার করে?

সমালোচকদের একজন যেমন মন্তব্য করেছেন: শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় গুণ হল নারী চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি। সমাজ যেভাবে নারীকে বিচার করে, শরৎচন্দ্র সেই বিচারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। ১০০+ বছর আগে এমন সাহসী লেখা খুব কমই দেখা যায়

সমাপ্তি নিয়ে বিতর্ক: ‘পয়েটিক জাস্টিসের’ অভিযোগ

উপন্যাসের সমাপ্তি নিয়েও রয়েছে তীব্র বিতর্ক। অনেক পাঠকের অভিযোগ, শরৎচন্দ্র সাবিত্রী চরিত্রটির প্রতি ‘পয়েটিক জাস্টিস’ (ন্যায়বিচার) করতে ব্যর্থ হয়েছেন

উপন্যাসের শেষে দেখা যায়, নায়ক সতীশকে বিয়ে করছে সরোজিনী—যে চরিত্রটি উপন্যাসে পার্শ্বচরিত্র, অপেক্ষাকৃত দুর্বল মননের। অথচ সারা উপন্যাস জুড়ে সাবিত্রী আত্মত্যাগ ও অসীম ভালোবাসার এক অসাধারণ চরিত্র হিসেবে ফুটে উঠেছে

একজন পাঠকের ভাষায়:

“সাবিত্রীর ভালোবাসার কোন মূল্যই এই উপন্যাসে দেওয়া হয়নি। সাবিত্রী হৃদয়ে ভালোবাসা আছে কিন্তু সে অকাল বিধবা, তাই বলে তার আর কোন সঙ্গী হবেনা ইহজগতে- এই বিশ্বাসে দৃঢ় ছিলেন শরৎবাবু?”

অন্য পাঠক অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন যে সতীশ চরিত্রটিকে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সরোজিনীকে গ্রহণ করাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল । শরৎচন্দ্র তাঁর চরিত্রগুলোর স্বভাবগত পরিণতি দেখিয়েছেন—তাই এটি ‘strictly moral’ সমাপ্তি।

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের উক্তি

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস থেকে অসংখ্য উক্তি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে। এখানে কয়েকটি নির্বাচিত উক্তি উল্লেখ করা হলো :

“যাহাকে ভালোবাসি, সে যদি ভালো না বাসে, এমন কি ঘৃণাও করে, তাও বোধ করি সহ্য হয়, কিন্তু যাহার ভালোবাসা পাইয়াছি বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি, সেইখানে ভুল ভাঙ্গিয়া যাওয়াটাই নিদারুণ। পূর্বেরটা ব্যথাই দেয়, কিন্তু শেষেরটা ব্যথাও দেয়, অপমানও করে।”

“যেদিন বুঝবে রূপটাও মানুষের ছায়া, মানুষ নয়, সেদিনই বুঝবে সত্যিকারের ভালোবাসা কী।”

“শ্রদ্ধা ছাড়া ভালোবাসা দাঁড়াতে পারে না। সমাজ যে স্ত্রীকে তাঁর সম্মানের আসনটি দেয় না, কোন স্বামীরই ত সাধ্য নেই নিজের জোরে সেই আসনটি তার বজায় করে রাখেন।”

“অভিমান করা ভালো, কিন্তু তার জন্য ভালোবাসাকে নষ্ট করা কখনো উচিত নয়।”

“মানুষের চরিত্র বিচার করা সহজ, কিন্তু তার মনের কথা বোঝা খুব কঠিন।”

“ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে সমাজের বিচার তার কাছে তুচ্ছ।”

‘চরিত্রহীন’ কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

১০০ বছরেরও বেশি আগে লেখা ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি আজও কেন পাঠকমনে দাগ কাটে?

প্রথমত, প্রশ্নটা এখনও অমীমাংসিত—সমাজ নারীকে কীভাবে বিচার করে? নারীর ব্যক্তিজীবন নিয়ে সমাজের এত মাথাব্যথা কেন?

দ্বিতীয়ত, ‘পয়েটিক জাস্টিস’ নিয়ে প্রশ্নটা এখনও ততটাই জীবন্ত। ন্যায়বিচার কি আদৌ সম্ভব? ভালোর কি পুরস্কার আছে?

তৃতীয়ত, কিরণময়ী বা সাবিত্রীর মতো চরিত্র আমাদের সমাজে এখনও বাস করেন। এখনও নারীকে ‘চরিত্র’ ও ‘আচার’-এর মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। তখনও তাই ‘চরিত্রহীন’ সময়ের সীমানা পেরিয়ে সমসাময়িক হয়ে ওঠে।

যখন ‘দেবদাস’ বা ‘শ্রীকান্ত’ বেশি আলোচিত, ঠিক তখনই ‘চরিত্রহীন’ আলাদা জায়গা দখল করে আছে—বিতর্কের, প্রশ্নের, আত্মসমীক্ষণের জায়গা।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি কবে প্রকাশিত হয়?

‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি ১৯১৭ সালের ১১ নভেম্বর সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়

উপন্যাসে চারটি প্রধান নারী চরিত্র রয়েছে—সাবিত্রী, কিরণময়ী, সুরবালা ও সরোজিনী। সাবিত্রী ও কিরণময়ীকে কেন্দ্রীয় চরিত্র ধরা হয়

সমাজের প্রচলিত বিচারে যাদের ‘চরিত্রহীন’ আখ্যা দেওয়া হয়, তারাই উপন্যাসের প্রকৃত নায়িকা—এই বক্তব্য থেকেই নামকরণ। এছাড়া ‘নকল শরৎ’ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র নিজেকে ‘চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন

সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিটি হলো— “যাহাকে ভালোবাসি, সে যদি ভালো না বাসে, এমন কি ঘৃণাও করে, তাও বোধ করি সহ্য হয়, কিন্তু যাহার ভালোবাসা পাইয়াছি বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি, সেইখানে ভুল ভাঙ্গিয়া যাওয়াটাই নিদারুণ।”

নারীচরিত্র সাবিত্রী ও কিরণময়ীর প্রচলিত নীতিবিরোধী আচরণ ও কথাবার্তার জন্য উপন্যাসটি বিতর্কিত হয়। রক্ষণশীল সমালোচকরা উপন্যাসটিকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দেন

অনেক পাঠকের মতে, সারা জীবন আত্মত্যাগী সাবিত্রী উপন্যাসের শেষে ‘পুরস্কার’ পাননি। নায়ক সতীশ সরোজিনীকে বিয়ে করেন, যা ‘ন্যায়বিচার’ নয় বলে কেউ কেউ মনে করেন

উপসংহার: চিরন্তন প্রশ্নের নাম ‘চরিত্রহীন’

‘চরিত্রহীন’ শুধু একটি উপন্যাস নয়—এটি একটি চিরন্তন প্রশ্ন। সমাজের বিচার কী আদৌ সঠিক? চরিত্র নির্ণয়ের মাপকাঠি আসলে কার হাতে? যারা মুখে যত বড় বড় নীতি-কথা বলে, তারাই কি সত্যিই চরিত্রবান?

শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের ভিতরকার ভণ্ডামি ও অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। সাবিত্রী হোক বা কিরণময়ী—সব চরিত্রই আজও আমাদের সমাজে কোন না কোন রূপে বাস করে।

একটি ব্লগার যেমন লিখেছেন, “শরৎবাবু ১০০ বছর আগেই আজকের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন” । সেটাই সত্য। নারীর স্বাধীনতা, সমাজের দ্বিচারিতা, সম্পর্কের জটিলতা—এসব প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত। তাই ‘চরিত্রহীন’ কালের সীমানা পেরিয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে এক আলোকবর্তিকার মতো—আমাদের নিজেদের চরিত্রের প্রকৃত বিচার করতে উৎসাহিত করে।

“যেদিন বুঝবে রূপটাও মানুষের ছায়া, মানুষ নয়, সেদিনই বুঝবে সত্যিকারের ভালোবাসা কী।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে