বিভূতিভূষণের শেষ উপন্যাস
১৯৫০ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনেই প্রকাশিত হয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ উপন্যাস ‘ইছামতী’ । এই উপন্যাসটি প্রকাশের মাত্র কয়েক মাস পরেই ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলায় মারা যান এই মহান সাহিত্যিক । তাঁর মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই উপন্যাসের জন্য তাঁকে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫০-৫১) প্রদান করে ।
‘ইছামতী’ উপন্যাসটি শুধু বিভূতিভূষণের শেষ উপন্যাসই নয়, এটি তাঁর সাহিত্য প্রতিভার এক অনন্য স্বাক্ষর। ‘পথের পাঁচালী’ যেমন গ্রামবাংলার শৈশবের কাহিনি, ‘আরণ্যক’ যেমন অরণ্যের গভীর অনুভূতি, তেমনি ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি তুলে ধরে উনিশ শতকের নীলবিদ্রোহের পটভূমি, সামাজিক বৈষম্য আর মানুষের সংগ্রামের এক হৃদয়স্পর্শী আখ্যান ।
এই নিবন্ধে আমরা ‘ইছামতী’ উপন্যাসের কাহিনি, চরিত্র, ঐতিহাসিক পটভূমি, সাহিত্যমূল্য ও বিভূতিভূষণের সাহিত্যজীবনে এর গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
পটভূমি: ইছামতী নদীর তীরে মোল্লাহাটি নীলকুঠি
‘ইছামতী’ উপন্যাসের পটভূমি উনিশ শতকের শেষ প্রান্তের বাংলা । ইছামতী নদীটি বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনের বিশাল ম্যানগ্রোভ বদ্বীপে মিশেছে । এই নদীর তীরে অবস্থিত মোল্লাহাটি নীলকুঠি ছিল উপন্যাসের কেন্দ্রীয় স্থান ।
বিভূতিভূষণের জন্মস্থান বারাকপুর তথা নিশ্চিন্দিপুরের মোল্লাহাটি নীলকুঠির কাহিনিই এই উপন্যাসে স্থান পেয়েছে । উনিশ শতকের নীলবিদ্রোহের পটভূমিতে সাধারণ মানুষের উত্থান-পতনের মর্মন্তুদ ইতিহাস ধরা পড়েছে এই রচনায় ।
১৮৫৯-১৮৬২ সালের নীলবিদ্রোহ (Indigo disturbances)-এর সময় বাংলার নিম্নাঞ্চলে যে নীলকুঠিগুলো গড়ে উঠেছিল, তাদের অত্যাচার ও শোষণের কাহিনিই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য । এই মোল্লাহাটি নীলকুঠির অত্যাচারকে অবলম্বন করেই উনিশ শতকের মধ্যভাগে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর বিখ্যাত ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকটি রচনা করেছিলেন ।
কাহিনি সংক্ষেপ: ইছামতীর স্রোতে ভেসে ওঠা জীবনকথা
উপন্যাসটির কাহিনি শুরু হয় মোল্লাহাটি নীলকুঠির চারপাশে আবর্তিত বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনকে ঘিরে। কিরকাস রিভিউ ‘ইছামতী’কে ‘একটি সমৃদ্ধ, উল্লেখযোগ্য উপন্যাস যা মানবসমাজের জটিল ভঙ্গুরতা এবং যে পরিবেশে সেগুলি গড়ে ওঠে তার চিত্র ধারণ করে’ বলে বর্ণনা করেছে ।
মূল চরিত্রসমূহ
ভবানী বাড়ুয্যে – উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। একজন ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী যিনি বিবাহ করেন এবং সংসারী জীবন শুরু করেন ।
তিলু – ভবানীর সেবাপরায়ণা স্ত্রী । ভবানী তিলুকে ও তাঁর পুত্রকে (এবং পরবর্তীতে নিস্তারিণীকে) ব্রহ্ম সম্পর্কে সচেতন জ্ঞানে দীক্ষিত করেন 。
শিপ্টন সাহেব – অত্যাচারী নীলসাহেব, যিনি মোল্লাহাটি নীলকুঠির মালিক ।
গয়া-মেম – নিম্নবর্ণের সুন্দরী নারী, যিনি শিপ্টন সাহেবের উপপত্নী হয়ে উঠে সমাজে উত্থান ঘটান ।
রাজারাম রায় – শিপ্টন সাহেবের প্রশাসক, যিনি সাহেবের প্রতি তোষামোদ করার জন্য সমাজে অপছন্দের পাত্র ।
রামকানাই কবিরাজ – গ্রামের বৃদ্ধ কবিরাজ, যিনি আক্রমণ ও সামাজিক বয়কট অতিক্রম করে একজন আদর্শ কবিরাজ ও ঈশ্বরপ্রেমিক হিসেবে আবির্ভূত হন ।
প্রসন্ন চাক্কোত্তি – জরিপকারী, যিনি মিথ্যাকে সত্যে রূপান্তরিত করার জন্য কুখ্যাত ।
কেন্দ্রীয় কাহিনি
উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে রাজারাম রায়ের তিন অবিবাহিত বোন—তিলু, বিলু ও নিলু। তাদের বিয়ে হয় ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী ভবানী বাড়ুয্যের সঙ্গে। এই পরিবারের ভাগ্য ওঠানামা করে গ্রামের সাথে । ইছামতী নদীর বাঁকা স্রোতের মতোই মানুষদের জীবনেও ঘটে আকস্মিক পরিবর্তন ।
উপন্যাসে নীলচাষের জোরজবরদস্তি, ইংরেজ ম্যানেজার ও ব্রাহ্মণ দেওয়ানের মধ্যে জটিল সম্পর্ক, কৃষকদের (হিন্দু ও মুসলিম) দুর্দশা এবং নীলবিদ্রোহের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নীলবিদ্রোহের পটভূমি
‘ইছামতী’ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। বিভূতিভূষণ এখানে একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সময়ের নথি তৈরি করেছেন।
নীলচাষের জোরজবরদস্তি: কম্পানি শাসনের অধীনে বাংলার নিম্নাঞ্চলে অসংখ্য নীলকুঠি গড়ে উঠেছিল। কৃষকদের নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো, যা তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল ।
নীলবিদ্রোহ (১৮৫৯-৬২): এই জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের প্রসঙ্গ উপন্যাসে স্থান পেয়েছে ।
ব্রিটিশ ও ব্রাহ্মণ দেওয়ানের নেক্সাস: ইংরেজ ম্যানেজার এবং স্থানীয় ব্রাহ্মণ দেওয়ানদের মধ্যে শোষণের যে জটিল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার চিত্র উপন্যাসে ফুটে উঠেছে ।
একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিভূতিভূষণ ‘নৃতাত্ত্বিক গ্রন্থ’ লিখতে চাননি, কিন্তু নীলচাষে যে জোরজবরদস্তি ছিল, ইংরেজ ম্যানেজার ও ব্রাহ্মণ দেওয়ানের জটিল সম্পর্ক, কৃষকদের দুরবস্থা—এই সব বিষয় উপন্যাসে যথেষ্ট স্থান পেয়েছে ।
‘ইছামতী’-র সামাজিক ও দার্শনিক দিক
সমাজের কঠোর সমালোচনা
ইছামতী’ উপন্যাসে বর্ণপ্রথার কঠোর সমালোচনা রয়েছে। ব্রাহ্মণরা এই সমালোচনার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য । অন্তত তিনবার উপন্যাসের কথক সরাসরি মন্তব্য করেছেন—যজ্ঞমণ্ডপে বসে যারা সময় কাটায়, তামাক খায়, পাশা খেলে এবং গপ্পো করে, সেই অলস জমিদার ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ।
এই সমালোচনার পাশাপাশি বিভূতিভূষণ নীলচাষের সহিংসতা এবং বর্ণ ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকড় থেকে মুক্তিরও পথ দেখিয়েছেন ‘অসাধারণ ব্রাহ্মণ’ চরিত্রগুলোর মাধ্যমে ।
আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন
উপন্যাসে ভগবদ গীতা ও উপনিষদের ব্যাখ্যা স্থান পেয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের কথোপকথনের মাধ্যমে। ভবানী, চৈতন্যভারতী ও রামকানাই কবিরাজের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনায় সংস্কৃত শ্লোক এবং উপনিষদের উদ্ধৃতি স্থান পেয়েছে ।
একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে: “এই ব্যাখ্যাগুলো ধর্মীয়ের চেয়ে আধ্যাত্মিক। উপন্যাসের সারমর্ম অনুবাদে হারিয়ে যায়নি” ।
প্রকৃতি ও পরিবেশ
বিভূতিভূষণের অন্যান্য রচনার মতো ‘ইছামতী’-তেও প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা রয়েছে। নদীর পাড়, ফুল, গাছ, পোকামাকড়—সবকিছুই তিনি সুনিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন। কিরকাস রিভিউতে একটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে:
“সেখানে হলুদ বাবলা ফুল জলে পড়েছিল, যা কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ছিল। অ্যানাটো শাখা থেকে চন্দ্রমল্লিকার একটি সরু লতা ঝুলছিল। তিলুর স্তনের কাছে টেচোকো মাছের ছোট দল সাঁতার কাটত, সে যখন ধরা চেষ্টা করত তখন মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যেত” ।
একটি দার্শনিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিভূতিভূষণ ‘ইছামতী’-তে উদ্ভিদজগতের ইতিহাস—ভূমিতে তাদের বসতি স্থাপন ও মৃত্যু—কে জাতীয় ইতিহাসের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা কেবল রাজা-রানিদের জীবন দিয়েই ইতিহাস গঠিত নয় ।
রবীন্দ্র পুরস্কার ও স্বীকৃতি
‘ইছামতী’ উপন্যাসটি প্রকাশের পরপরই ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ১৯৫১ সালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন । এটি পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার।
ফ্লিপকার্টে বইটির একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে:
“একটি সুন্দর ক্লাসিক যা আপনাকে আনন্দময় স্মৃতি রেখে যায়। উপন্যাসটি নীলবিদ্রোহের সময় থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীতে বাংলার রূপান্তরের কাহিনি নিয়ে যায়। বিভূতিভূষণের শৈলীতে, এটি সবকিছুর প্রতি দিব্য সহানুভূতির সাথে আচরণ করে যাতে আপনি ‘খলনায়কদের’ প্রতি রাগও করেন না এবং জগৎ যেমন আছে তাকে শান্ত ও নিরপেক্ষভাবে মেনে নেওয়ার অনুভূতি নিয়ে থাকেন” ।
বিভূতিভূষণের সাহিত্যকর্মে ‘ইছামতী’-র স্থান
বিভূতিভূষণ মোট ১৬টি উপন্যাস ও ২০০টির বেশি ছোটগল্প রচনা করেছেন । তাঁর সাহিত্যকর্মে ‘ইছামতী’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে:
| বৈশিষ্ট্য | ‘ইছামতী’ | অন্যান্য উপন্যাস |
|---|---|---|
| প্রকাশকাল | ১৯৫০ (শেষ উপন্যাস) | ‘পথের পাঁচালী’ (১৯২৯), ‘অপরাজিত’ (১৯৩১) |
| পটভূমি | নীলবিদ্রোহ-পরবর্তী বাংলা | গ্রামীণ জীবন, অরণ্য |
| ঐতিহাসিক উপাদান | ঐতিহাসিক নথি | তুলনামূলক কম |
| বর্ণপ্রথার সমালোচনা | তীব্র | অন্যান্য রচনায়ও আছে |
| আধ্যাত্মিক উপাদান | উপনিষদের ব্যাখ্যা | ‘পথের পাঁচালী’-তেও আছে |
| রবীন্দ্র পুরস্কার | প্রাপ্ত | অন্য কোনো উপন্যাস পায়নি |
অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
‘ইছামতী’ উপন্যাসটি ইংরেজি সহ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। রিমলি ভট্টাচার্যের অনুবাদ ‘Restless Waters of the Ichhamati’ শিরোনামে ২০১৮ সালে রূপা পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় । ২০২৪ সালে চন্দা চট্টোপাধ্যায় বেওত্রার আরেকটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ।
কিরকাস রিভিউ এই অনুবাদকে ‘একটি গতিশীল বাংলা মহাকাব্য যা একটি চমৎকার নতুন অনুবাদে জ্বলজ্বল করে’ বলে বর্ণনা করেছে ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: ‘ইছামতী’ উপন্যাসটির লেখক কে?
‘ইছামতী’ উপন্যাসটির লেখক হলেন বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ।
২: ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি কবে প্রকাশিত হয়?
‘ইছামতী’ উপন্যাসটি ১৯৫০ সালের ১৫ জানুয়ারি মিত্রালয় প্রকাশনা থেকে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় । এটি বিভূতিভূষণের জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ উপন্যাস ।
৩: ‘ইছামতী’ উপন্যাসের পটভূমি কী?
উপন্যাসটির পটভূমি উনিশ শতকের নীলবিদ্রোহ-পরবর্তী বাংলার মোল্লাহাটি নীলকুঠি এলাকা । ইছামতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই নীলকুঠির অত্যাচার ও শোষণের কাহিনি এতে স্থান পেয়েছে ।
৪: ‘ইছামতী’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কারা?
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হলো ভবানী বাড়ুয্যে, তিলু (ভবানীর স্ত্রী), অত্যাচারী নীলসাহেব শিপ্টন সাহেব, শিপ্টনের উপপত্নী গয়া-মেম, রাজারাম রায় ও রামকানাই কবিরাজ ।
৫: ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি কোন পুরস্কার পেয়েছে?
‘ইছামতী’ উপন্যাসটির জন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৫১ সালে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন ।
৬: ‘ইছামতী’ উপন্যাসের বিশেষত্ব কী?
‘ইছামতী’ উপন্যাসের বিশেষত্ব হলো এর ঐতিহাসিক পটভূমি (নীলবিদ্রোহ), বর্ণপ্রথার তীব্র সমালোচনা, উপনিষদের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা এবং প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা । এটি বিভূতিভূষণের জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ উপন্যাসও বটে ।
৭: ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে?
হ্যাঁ, ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি একাধিকবার ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। রিমলি ভট্টাচার্যের অনুবাদ ‘Restless Waters of the Ichhamati’ (২০১৮) এবং চন্দা চট্টোপাধ্যায় বেওত্রার অনুবাদ (২০২৪) উল্লেখযোগ্য ।
উপসংহার: ইছামতীর স্রোতে বাঙালির ইতিহাস
‘ইছামতী’ শুধু একটি উপন্যাস নয়—এটি বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত নথি, যা বিভূতিভূষণের অমর কলমে ধরা পড়েছে। উনিশ শতকের নীলবিদ্রোহের উত্তাল সময়কে তিনি এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পের আয়নায়। উপন্যাসের পাতায় পাতায় ভেসে ওঠে ইছামতী নদীর স্রোতের মতোই অবিরাম বয়ে চলা মানুষগুলোর জীবন—তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের উত্থান-পতন, তাদের স্বপ্ন আর সংগ্রাম।
নীলকুঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেমন ‘নীলদর্পণ’-এ স্থান পেয়েছে, তেমনি বিভূতিভূষণ তাঁর ‘ইছামতী’য় কুঠির চারপাশের মানুষের গল্প বলেছেন । তিনি উদ্ভিদ, নদী, প্রকৃতিকেও উপন্যাসের চরিত্রে পরিণত করেছেন—যেখানে গাছ, ফুল, পোকামাকড় সবকিছুর আছে নিজস্ব ইতিহাস ।
আজকের দিনে, যখন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ইছামতী নদীর নাম উচ্চারণ করে, তখন শুধু নদীটিই নয়, বিভূতিভূষণের এই কালজয়ী উপন্যাসটিও স্মরণে আসে। যে উপন্যাসটি নীলবিদ্রোহের ইতিহাস, বর্ণপ্রথার সমালোচনা, আধ্যাত্মিকতার গভীরতা আর প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা—সবকিছু একসঙ্গে ধারণ করে গেছে ।
‘ইছামতী’ রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছে প্রমাণ হিসেবে , কিন্তু সত্যিকারের পুরস্কার হলো এই যে, আজও পাঠক এই উপন্যাস পড়ে মন মুগ্ধ করেন । যারা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’-তে অপু-দুর্গার জীবন উপভোগ করেছেন, তাদের জন্য ‘ইছামতী’ এক ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা—ঐতিহাসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক—যা বাংলা সাহিত্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।



