ভূমিকা: যিনি পথের পাঁচালী লিখে গেছেন
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যে ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা আমরা সবাই জানি—তারাশঙ্কর, মানিক ও বিভূতিভূষণ। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পর বাংলা সাহিত্যে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন এই ত্রয়ী লেখক । তাঁদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি মাধুর্য ও আবেগ নিয়ে গ্রামবাংলার চিরায়ত জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তিনি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
পিতৃহীন যুবক, কঠোর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা স্কুলমাস্টার—এই সাধারণ মানুষটিই একদিন বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন ‘পথের পাঁচালী’র মতো অমর সৃষ্টি। যার কলম থেকে ‘অপু-দুর্গা’ সৃষ্টি হয়েছে, যার লেখা ‘চাঁদের পাহাড়’-এর মতো অভিযান উপন্যাস কিশোরদের স্বপ্ন জাগিয়েছে, সেই বিভূতিভূষণ বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি ছিল অত্যন্ত অনুরক্ত। প্রকৃতি ও মানুষকে একীভূত করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর ।
‘পথের পাঁচালী’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে যে যুবক ঘুরেছেন প্রকাশকের দরজায় দরজায়, তার সেই উপন্যাসই একদিন সত্যজিৎ রায়ের হাতে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস তৈরি করেছে। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা সিনেমাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করিয়েছিলেন ।
এই জীবনীতে আমরা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম, শৈশব, শিক্ষা, কর্মজীবন, সাহিত্যচর্চা ও অমর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
মাতুলালয়ে প্রথম আলো
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১৩০১ সালের ২৮ ভাদ্র) পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী মুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ।
পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার বনগাঁর নিকট বারাকপুর গ্রামে। তবে তাদের আদিনিবাস ছিল উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পানিতর গ্রামে। তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন একজন কবিরাজ, যিনি বনগাঁর নিকট বারাকপুর গ্রামে কবিরাজি করতেন ।
পিতা-মাতা ও ভাইবোন
পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য ও কথকতার জন্য তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন । গ্রামে গ্রামে কথকতা করেই তাঁর সংসার চলত ।
মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ । তাঁর ভাইবোনেরা হলেন ইন্দুভূষণ, নট্যুবিহারী, জাহ্নবী ও সরস্বতী ।
মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বনগাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে কাশী থেকে সংস্কৃত ও হিন্দু পুরাণে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন ।
‘বিভূতিভূষণ’ নামকরণ
পিতামহ কবিরাজ তারিণীচরণ বসিরহাট সংলগ্ন পানিতর থেকে বনগাঁর বারাকপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন । পিতা মহানন্দ নিজেও ছিলেন পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানুষ এবং কথকতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মীয় কাহিনি পৌঁছে দিতেন ।
শিক্ষাজীবন: দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই
পাঠশালায় হাতেখড়ি
বিভূতিভূষণের শিক্ষার শুরু গ্রামের পাঠশালায়। তিনি বিভিন্ন পাঠশালায় কিছুদিন করে পড়েছেন—শাগঞ্জ কেওটায় প্রসন্ন মোদকের পাঠশালা, মুরাতিপুরে বিপিন মাস্টারের পাঠশালা, বনগাঁ বারাকপুরে হরি রায়ের পাঠশালা এবং বাগবাজারে আপার প্রাইমারি পাঠশালা ।
বনগাঁ হাইস্কুল ও মেধার পরিচয়
১৯০৮ সালে তিনি বনগাঁ হাই ইংরেজি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন । সেখানে তিনি অবৈতনিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ।
১৯১৪ সালে তিনি এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স (ম্যাট্রিক) পরীক্ষা পাস করেন । স্কুল পাস করার আগেই অবশ্য তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে, ফলে তাঁকে বিশেষ অর্থকষ্টে পড়তে হয়। এক অবস্থাপন্ন ডাক্তারের বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজ করে অতি কষ্টে দিন চালাতে হতো ।
কলকাতায় উচ্চশিক্ষা
এই অর্থকষ্ট আরও বেড়ে যায় যখন তিনি কলকাতায় গিয়ে রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) ভর্তি হন । দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি ১৯১৬ সালে প্রথম বিভাগে আইএ এবং ১৯১৮ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন ।
বিএ পরীক্ষার পর তিনি দর্শন নিয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং আইনও পড়তে শুরু করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাব এবং অন্যান্য কারণে কোনোটিই সম্পূর্ণ হয়নি ।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
প্রথম বিবাহ: গৌরী দেবী
বিএ ক্লাসের প্রথম বর্ষে পড়ার সময়, ১৯১৭ সালের ১৫ আগস্ট বিভূতিভূষণের বিয়ে হয় বসিরহাটের মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর সঙ্গে। গৌরী দেবীর বয়স ছিল তখন চোদ্দ বছর ।
পরের বছর জুলাই মাসে, বিএ পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, বিভূতিভূষণ কিশোরী স্ত্রীকে নিয়ে বারাকপুরে পিতৃপুরুষের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু তাঁর প্রথম দাম্পত্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সেই নভেম্বর মাসে, অর্থাৎ বিয়ের চার মাস পরে, বাপের বাড়ি পানিতরে বেড়াতে গিয়ে গৌরী দেবী নিউমোনিয়ায় (কোনো কোনো মতে কলেরায়) মারা যান ।
গৌরী দেবীর মৃত্যুর পর বিভূতিভূষণ প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন শুরু করেন । পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়ে তিনি শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করেন ।
দ্বিতীয় বিবাহ: রমা দেবী
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর বাইশ বছর পর, ১৯৪০ সালের ৩ ডিসেম্বর (১৩৪৭ সালের ১৭ অগ্রহায়ণ) বিভূতিভূষণ বিয়ে করেন ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রমা দেবীকে ।
বিয়ের সাত বছর পর ১৯৪৭ সালে তাঁদের একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (ডাকনাম বাবলু) জন্মগ্রহণ করেন ।
কর্মজীবন: স্কুলমাস্টার থেকে সাহিত্যিক
শিক্ষকতার সূচনা
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর পড়াশোনা ছেড়ে বিভূতিভূষণ শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করেন। বাকি জীবন তিনি এই পেশাতেই নিযুক্ত ছিলেন ।
১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে হুগলি জেলার জাঙ্গিপাড়া স্কুলে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯২০ সালের মে পর্যন্ত ওই স্কুলে কাজ করার পর তিনি সোনারপুরের কাছে হরিনাভি হাই ইংলিশ স্কুলে যোগ দেন ।
গোরক্ষিণী সভার ভ্রাম্যমান প্রচারক
বিভূতিভূষণের মধ্যে একজন উদগ্র ভ্রমণপিপাসু বাস করত। এই ভ্রমণপিপাসু সত্তা তাঁকে স্কুলের কাজ ছেড়ে ‘গোরক্ষিণী সভা’র ভ্রাম্যমান প্রচারকের কাজ নিতে উদ্বুদ্ধ করে । গোরক্ষিণী সভা ছিল ১৮৯৩ সালে ভারতে গরু রক্ষার জন্য একটি মিশন, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মহারাষ্ট্রের নেতা গঙ্গাধর তিলক ।
১৯২২ সালের শেষ পর্যন্ত তিনি এই কাজ নিয়ে পূর্ববঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও আরাকান অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণ করেন—কখনও ট্রেনে, কখনও জলপথে, বেশিরভাগই পায়ে হেঁটে ।
ভাগলপুরের অধ্যায়
১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় ফিরে এলেন বিভূতিভূষণ। পাথুরিয়া ঘাটার জমিদার খেলাতচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাজ নেন। এর এক বছর পরে খেলাতচন্দ্র তাঁকে উত্তর বিহারের অরণ্য অঞ্চলে জমিদারি দেখাশোনার জন্য ভাগলপুরে এস্টেট ম্যানেজার করে পাঠান ।
ভাগলপুর বাস বিভূতিভূষণের জীবনের এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে বসেই তিনি তাঁর প্রথম কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ লিখেছিলেন। এই ভাগলপুরেই তাঁর পরিচয় হয়েছিল বিচিত্রার সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এবং মৌচাকের সম্পাদক সুধীরচন্দ্র সরকারের সঙ্গে ।
শেষ কর্মস্থল
ভাগলপুর থেকে কলকাতায় ফিরে ধর্মতলার খেলাতচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। পরে যোগ দেন বনগাঁর নিকট গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন স্কুলে। এই স্কুলেই তিনি আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন ।
বিভূতিভূষণের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি কখনো ধনী হওয়ার চেষ্টা করেননি, বরং জীবনভর দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই কাটিয়েছেন। তাঁর বৃত্তি ছিল শিক্ষকতা, যা তিনি কিছুটা কলকাতায় এবং বেশিরভাগ সময় গ্রামের বিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন ।
সাহিত্যজীবন: এক ভিন্ন আখ্যান
‘উপেক্ষিতা’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ
বিভূতিভূষণের লেখক হয়ে ওঠার গল্পটি অত্যন্ত চমকপ্রদ । ১৯২০ সালে হরিনাভি স্কুলে শিক্ষকতার সময় তাঁর পরিচয় হয় পাঁচুগোপাল (যতীন্দ্রমোহন রায়) নামে এক সহকর্মীর সঙ্গে। পাঁচুগোপাল বিভূতিভূষণকে দুজনে মিলে একটা বই লেখার প্রস্তাব দেন ।
বিভূতিভূষণ প্রস্তাবে রাজি না হলেও পরের দিন স্কুলে গিয়ে দেখেন, তাঁর উপন্যাস বেরোচ্ছে মর্মে দেয়ালে বিজ্ঞাপন সাঁটা। পাঁচুগোপালের এই কৌশলে বাধ্য হয়ে তিনি একটি গল্প লেখেন এবং কলকাতার একটি মাসিক পত্রিকায় পাঠান ।
সপ্তাহখানেক পর ফেরত খাম আসে—কিন্তু খামের মধ্যে লেখার বদলে সম্পাদকের চিঠি: “আপনার রচনা মনোনীত হয়েছে, শীঘ্রই প্রকাশিত হবে” ।
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দ) ‘প্রবাসী’ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় ‘উপেক্ষিতা’ নামক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে । সে বছর শ্রেষ্ঠ গল্পের মর্যাদাও পায় এটি ।
পথের পাঁচালী: এক অমর সৃষ্টির জন্ম
ভাগলপুরে এস্টেট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সময় ১৯২৫ সালে বিভূতিভূষণ ‘পথের পাঁচালী’ রচনা শুরু করেন। বই লেখার কাজ শেষ হয় ১৯২৮ সালে ।
ভাগলপুরে আড্ডায় উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। উপেন্দ্রনাথ যখন বিভূতিভূষণকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গল্প, কবিতা কিছু লেখেন?’ তখন বিভূতি জানান, ‘একটা উপন্যাস লিখেছি’ ।
উপেন্দ্রনাথ পাণ্ডুলিপি পড়ে মুগ্ধ হন এবং তাঁর নতুন পত্রিকা ‘বিচিত্রা’-তে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৮ সালের জুলাই থেকে ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘পথের পাঁচালী’ ।
প্রকাশের পর পাঠকদের এক বড় অংশ ‘পথের পাঁচালী’-কে সাদরে গ্রহণ করলেও, বিচিত্রায় ধারাবাহিক প্রকাশের পর কোনও প্রতিষ্ঠিত প্রকাশক বইটি ছাপতে রাজি ছিলেন না । শেষ পর্যন্ত সজনীকান্ত দাস তাঁর নতুন প্রকাশনা রঞ্জন প্রকাশালয় থেকে ১৯২৯ সালের ২ অক্টোবর (মহালয়ার দিন) ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশ করেন । বিভূতিভূষণ পিতৃতর্পণ হিসেবে তাঁর বাবার স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন এই বই ।
অপরাজিত ও অন্যান্য উপন্যাস
‘পথের পাঁচালী’র সাফল্যের পর বিভূতিভূষণ এর পরবর্তী অংশ ‘অপরাজিত’ রচনা করেন। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এই উপন্যাস ।
উভয় উপন্যাসেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে । ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটি ইংরেজি ও ফরাসি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে ।
বিভূতিভূষণের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
আরণ্যক (১৯৩৯) – ভাগলপুরের অরণ্য ও অরণ্যচারী মানুষের জীবন
আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০) – হাজারী ঠাকুরের অক্লান্ত পরিশ্রমের কাহিনি
ইছামতী (১৯৫০) – নীলচাষ ও নারী জাগরণের কাহিনি
দৃষ্টিপ্রদীপ (১৯৩৫)
বিপিনের সংসার (১৯৪১)
অশনি সংকেত (মরণোত্তর, ১৯৫৯) – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমি
চাঁদের পাহাড়: কিশোর সাহিত্যের মাইলফলক
১৯৩৮ সালে ‘মৌচাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘চাঁদের পাহাড়’ । আফ্রিকার পটভূমিতে রচিত এই অভিযান উপন্যাসটি কিশোর সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ । বিভূতিভূষণ বহু বছর আগে এই উপন্যাসটি লিখেছিলেন, কিন্তু আজও পড়লে সেটাকে আধুনিক অভিযান কাহিনি মনে হয় ।
২০১৩ সালে পরিচালক কমলেশ্বর মুখার্জী ‘চাঁদের পাহাড়’ চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেন, যা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে ।
ছোটগল্প ও অন্যান্য রচনা
বিভূতিভূষণের ছোটগল্পের সংগ্রহ ১৯টি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ:
মেঘমল্লার (১৯৩১)
মৌরীফুল (১৯৩২)
যাত্রাবদল (১৯৩৪)
কিন্নর দল (১৯৩৮)
তালনবমী (১৯৪৪)
তিনি ভ্রমণকাহিনি ও দিনলিপিও লিখেছেন। ‘অভিযাত্রিক’ (১৯৪০) , ‘স্মৃতির রেখা’ (১৯৪১) , ‘তৃণাঙ্কুর’ (১৯৪৩) , ‘উর্মিমুখর’ (১৯৪৪) , ‘হে অরণ্য কথা কও’ (১৯৪৮) তাঁর উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ সাহিত্য ।
সম্পাদনা
বিভূতিভূষণ কিছুদিন সম্পাদনার কাজও করেছেন। তিনি ‘চিত্রলেখা’ (১৯৩০) নামে একটি সিনেমা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং হেমন্তকুমার গুপ্তের সঙ্গে যৌথভাবে ‘দীপক’ (১৯৩২) পত্রিকা সম্পাদনা করেন ।
সাহিত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য
বিভূতিভূষণের সাহিত্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—মানুষ, প্রকৃতি ও ঈশ্বর ।
প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা
বিভূতিভূষণের রচনায় প্রকৃতি কেবল প্রকৃতিরূপেই আবির্ভূত হয়নি, বরং প্রকৃতি ও মানবজীবন একীভূত হয়ে অভিনব রসমূর্তি ধারণ করেছে । মানুষ যে প্রকৃতিরই সন্তান—এই সত্য তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে । প্রকৃতির লতাপাতা, ঘাস, পোকামাকড় সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে ।
গ্রামবাংলার জীবনচিত্র
‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘অশনি সংকেত’ পর্যন্ত তাঁর সাহিত্য পরিক্রমায় তিনি গ্রাম জীবনের রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন । শিশুর মতো কৌতূহল, কবির মতো কল্পনার প্রলেপ দিয়ে তিনি এমন গ্রামীন চিত্র এঁকেছেন যা অনবদ্য ও অনতিক্রমনীয় ।
দারিদ্র্য ও মানবতা
দুঃখ-দারিদ্র্যের ছবি তিনি এঁকেছেন, কিন্তু সে ছবি কোনো সমাজ বা অর্থনীতিজনিত প্রশ্ন উত্থাপন করেনা । প্রেমের চিত্রও এঁকেছেন, কিন্তু তাতে উত্তপ্ত কামনা ও রোমান্টিক বৈচিত্র্যের চেয়ে স্নিগ্ধ মধুর শান্ত ও গার্হস্থ্যের রূপটিই বেশি প্রকাশ পেয়েছে ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫১)
‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মরণোত্তর ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ লাভ করেন । এটি পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার।
অন্যান্য সম্মাননা
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমায় (লেখকের জন্মস্থান) অবস্থিত একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নাম লেখকের সম্মানার্থে রাখা হয়েছে ‘বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ ।
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে বিভূতিভূষণ
বিভূতিভূষণের রচনাকে চলচ্চিত্রে রূপায়নের মাধ্যমে বাংলা সিনেমা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে:
পথের পাঁচালী (১৯৫৫) – সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি এই উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা করেছিলেন ।
অপরাজিত (১৯৫৬) – পথের পাঁচালীর পরবর্তী অংশ। ‘অপু ত্রয়ী’-এর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ।
অপুর সংসার (১৯৫৯) – ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের একটি অংশ নিয়ে সত্যজিৎ রায় এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ।
অশনি সংকেত (১৯৭৩) – বঙ্গীয় সমাজের এক অস্থির সময়ের গল্প ।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) ঘাটশিলায় মাত্র ৫৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ।
তিনি তাঁর বাড়ির নাম রেখেছিলেন স্ত্রীর নামে ‘গৌরীকুঞ্জ’ । তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটি ‘অপুর পথ’ নামে পরিচিত ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১৩০১ সালের ২৮ ভাদ্র) উত্তর ২৪ পরগনার মুরাতিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর বিহারের ঘাটশিলায় ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ।
২: বিভূতিভূষণের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি?
বিভূতিভূষণের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ । এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস, যা ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ।
৩: বিভূতিভূষণ কোন পুরস্কার পেয়েছেন?
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য ১৯৫১ সালে মরণোত্তর ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ লাভ করেন ।
৪: বিভূতিভূষণের কিশোর উপন্যাস কোনটি?
তাঁর রচিত কিশোর উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’ (১৯৩৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকার পটভূমিতে রচিত এই অভিযান উপন্যাসটি আজও কিশোর পাঠকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ।
৫: বিভূতিভূষণের প্রধান চরিত্র কারা?
বিভূতিভূষণের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের অপু ও দুর্গা । এছাড়া ‘আরণ্যক’-এর অরণ্যচারী মানুষ, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর হাজারী ঠাকুর, ‘ইছামতী’-এর নারী চরিত্র এবং ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শঙ্কর তাঁর অমর সৃষ্টি ।
৬: বিভূতিভূষণ কোথায় শিক্ষকতা করতেন?
তিনি হুগলির জাঙ্গিপাড়া স্কুল, সোনারপুরের হরিনাভি হাই ইংলিশ স্কুল, কলকাতার ধর্মতলার খেলাতচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুল এবং শেষ জীবনে গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন ।
৭: ‘পথের পাঁচালী’ কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল?
‘পথের পাঁচালী’ প্রথমে ১৯২৮-২৯ সালে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯২৯ সালের ২ অক্টোবর সজনীকান্ত দাসের রঞ্জন প্রকাশালয় থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সময় কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রকাশক প্রথমে বইটি ছাপতে রাজি ছিলেন না ।
উপসংহার: গ্রামবাংলার চিরন্তন রূপকার
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা। যিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়েছেন—সাধারণ মানুষের কষ্ট, তাদের দারিদ্র্য, তাদের সংগ্রামই হয়ে উঠতে পারে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপাদান।
পাঁচুগোপালের কৌশল , উপেন্দ্রনাথের হাত ধরে ‘পথের পাঁচালী’র প্রকাশ —এ সব ঘটনা তাঁর জীবনকে এক রূপকথার মতো করে তুলেছে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন, স্কুলমাস্টারি করেছেন, কিন্তু কখনও লেখার নেশা ত্যাগ করেননি। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার চিরায়ত জীবন, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মানুষের সহজ-সরল আবেগ। ‘পথের পাঁচালী’-তে অপু-দুর্গার যে জীবন, তা যেন বিভূতিভূষণের নিজের শৈশবেরই প্রতিচ্ছবি। আর ‘আরণ্যক’-এ অরণ্যের যে গভীর অনুভূতি, তা ভাগলপুরে জঙ্গল ঘেরা সেই বছরগুলোরই প্রতিফলন ।
‘ইছামতী’র জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পেলেও মৃত্যুর আগে তিনি হয়তো জানতেন না যে তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ একদিন সত্যজিৎ রায়ের হাতে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস তৈরি করবে । সেটাই তাঁর অমরত্ব।
বিভূতিভূষণের আজীবন সঙ্গী ছিল দারিদ্র্য, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ যতদিন বাঙালি পাঠকের হাতে থাকবে, ততদিন বিভূতিভূষণ বেঁচে থাকবেন—বেঁচে থাকবেন বাংলার প্রতিটি নদী, প্রতিটি পথ, প্রতিটি মানুষের গল্পের ভেতর দিয়ে।


