সূচি
Toggleরাঢ় বাংলার মাটি ও মানুষের গল্পকার
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রোত্তর যুগের ত্রয়ী—তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ ও মানিক—এর মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সবচেয়ে বেশি গ্রামীণ জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। বিভূতিভূষণ যেমন প্রকৃতির মাধুর্য এঁকেছেন, মানিক যেমন মানুষের মনের জটিলতা বিশ্লেষণ করেছেন, তারাশঙ্কর এঁকেছেন রাঢ় বাংলার মাটি, গ্রামীণ সমাজের ভাঙন ও সাধারণ মানুষের জীবনের সংগ্রাম।
ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান হয়ে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন কীভাবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়, কীভাবে নব্য ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয় এবং কীভাবে গ্রামের মানুষ শহরের নাগালে এসে পরিবর্তিত হয় । তার কলমে উঠে এসেছে সাঁওতাল, বাগদি, বাউরি, ডোম, পটুয়া, বেদে, মালাকার—গ্রামীণ মানুষের নানা সম্প্রদায়ের জীবন । ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটগল্প সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি আত্মজীবনী ও ৪টি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন ।
আরোগ্য নিকেতনের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ও গণদেবতার জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার , ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন —এসব তার সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি। কিন্তু প্রকৃত পুরস্কার হলো, বাংলার মাটি ও মানুষের গল্প আজও পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
এই জীবনীতে আমরা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শৈশব, শিক্ষা, রাজনৈতিক জীবন, সাহিত্যযাত্রা, পুরস্কার ও অমর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
জন্ম ও শৈশব: লাভপুরের জমিদারবাড়ির ছেলে
বীরভূমের মাটিতে শিকড়
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই (বাংলা ১৩০৫ সালের ৫ শ্রাবণ) ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।
লাভপুর ছিল তখন বীরভূমের এক প্রান্তিক গ্রাম, যেখানে জমিদারি প্রথার চিহ্ন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। এই জমিদারি পরিবারের ভাঙন ও লাভপুর-সন্নিহিত অঞ্চলের সাধারণ জনজীবন পরবর্তীকালে তারাশঙ্করের আঞ্চলিক উপন্যাসগুলোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল ।
পিতা-মাতা ও পরিবার
তার পিতার নাম হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম প্রভাবতী দেবী । পিতামহ যাদবলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন লাভপুরের জমিদার ।
তারাশঙ্করের বাল্যকালেই পিতৃবিয়োগ ঘটে। ১৯০৬ সালের আশ্বিন মাসে নবমীর দিন (তারাশঙ্করের বয়স তখন আট বছর) পিতা মারা যান । এরপর তিনি মাতা ও বিধবা পিসিমার আদর-যত্নে লালিত-পালিত হন ।
জমিদার পরিবারের সন্তান হলেও অভিজাত জীবনের তুলনায় তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার শৈশবের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে স্থানীয় লোককথা, উৎসব এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি—এগুলো তার পরবর্তী সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল ।
শিক্ষাজীবন: অসমাপ্ত অধ্যায়
স্কুলজীবন
তারাশঙ্করের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলেই শুরু হয় । তিনি লাভপুরের যাদবলাল হাই ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১৯১৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য, আগের বছর পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেননি; ১৯১৬ সালে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন ।
কলেজ ও রাজনীতির পথে
ম্যাট্রিক পাস করে উচ্চশিক্ষার্থে কলকাতায় আসেন এবং প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ও পরে সাউথ সুবারবান কলেজে (অধুনা আশুতোষ কলেজ) ভর্তি হন ।
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে আইএ পড়ার সময় মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি এক বছর অন্তরীণ থাকেন । ফলে তার শিক্ষাজীবনের এখানেই সমাপ্তি ঘটে ।
ভগ্ন স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি লেখাপড়া সম্পূর্ণ করতে পারেননি ।
রাজনৈতিক জীবন: স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বিধান পরিষদ
অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন
তারাশঙ্কর পুরোপুরিভাবে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন । ১৯৩০ সালে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে প্রায় এক বছর কারাবরণ করেন । ১৯৩০ সালের ডিসেম্বর মাসে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ।
কারামুক্তির পর কিছুকাল গ্রামে কাটিয়ে তিনি সাহিত্যকর্মে মনোনিবেশ করেন ।
ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও বিধান পরিষদের সদস্য
যদিও তিনি কখনো বিধানসভার সদস্য হননি, ১৯৫২ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের মনোনীত সদস্য হন এবং ১৯৬০ সালে রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই পদে ছিলেন । তার কর্মজীবনে তিনি কিছুকাল কলকাতায় কয়লার ব্যবসা এবং কিছুকাল কানপুরে চাকরি করেন ।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ
১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় তারাশঙ্করের । সেই বছরই প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ ।
সাহিত্যকর্ম: রাঢ় বাংলার দলিল
প্রথম প্রকাশনা
তারাশঙ্করের প্রথম গল্প ‘রসকলি’ সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা ‘কল্লোল’-এ প্রকাশিত হয় । এছাড়া কালিকলম, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, প্রবাসী, পরিচয় প্রভৃতি প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয় ।
প্রথম জীবনে কিছু কবিতা লিখলেও কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তারাশঙ্করের প্রধান খ্যাতি । তার প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে ।
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস
তারাশঙ্কর প্রায় ৬৫টি উপন্যাস রচনা করেন । তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর তালিকা:
| উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| চৈতালী ঘূর্ণি | ১৯৩২ | প্রথম উপন্যাস |
| রাইকমল | ১৯৩৫ | প্রেমের উপন্যাস |
| জলসাঘর | ১৯৩৮ | সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে রূপায়িত |
| ধাত্রীদেবতা | ১৯৩৯ | জমিদারি প্রথার শেষ পর্যায়ের গল্প |
| কালিন্দী | ১৯৪০ | নদীকে কেন্দ্র করে জমিদার, প্রজা ও সাঁওতালদের গল্প |
| গণদেবতা | ১৯৪৩ | জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস |
| পঞ্চগ্রাম | ১৯৪৪ | গণদেবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ |
| কবি | ১৯৪৪ | নিচু বর্ণের ছেলের কবি হওয়ার গল্প |
| হাঁসুলী বাঁকের উপকথা | ১৯৪৭ | কাহার সমাজের ভাঙনের কাহিনি |
| আরোগ্য নিকেতন | ১৯৫৩ | রবীন্দ্র পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার |
| নিশিপদ্ম | ১৯৬২ | — |
সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য
তার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলা । বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনচিত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তির মহিমা ও বিদ্রোহ, সামন্ততন্ত্র ও ধনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ধনতন্ত্রের বিজয়—এসব তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু । শরৎচন্দ্রের পরে যারা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তারাশঙ্কর ছিলেন তাদের একজন ।
চলচ্চিত্রায়ন: পর্দায় তারাশঙ্কর
তারাশঙ্করের বহু উপন্যাস ও গল্প চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
জলসাঘর (সত্যজিৎ রায়) – আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে
অভিযান (সত্যজিৎ রায়)
সপ্তপদী (অজয় কর)
গণদেবতা (তরুণ মজুমদার)
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (তপন সিংহ)
তার রচনা অবলম্বনে প্রায় ৪০টির বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তার সাহিত্য সাধনার জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন:
| পুরস্কার/সম্মাননা | বছর | সূত্র |
|---|---|---|
| শরৎ স্মৃতি পদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) | ১৯৪৭ | |
| রবীন্দ্র পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ সরকার) | ১৯৫৫ | ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর জন্য |
| জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) | ১৯৫৬ | |
| সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার | ১৯৫৬ | ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর জন্য |
| পদ্মশ্রী | ১৯৬২ | ভারত সরকার |
| জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৬৬/৬৭ | ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্য |
| পদ্মভূষণ | ১৯৬৮ | ভারত সরকার |
| বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি | ১৯৭০ |
নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন
১৯৭০ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন । তার নামে মনোনয়ন প্রস্তাব করেছিলেন সাহিত্য অকাদেমির সেক্রেটারি কৃষ্ণ কৃপালিনী । কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। নিয়ম অনুযায়ী কাউকে মরণোত্তর নোবেল দেওয়া হয় না, তাই আর বিবেচিত হয়নি । সে বছর নোবেল পেয়েছিলেন চিলির কবি পাবলো নেরুদা ।
তারাশঙ্কর ১৯৭০ সালে যে বিশ্বসাহিত্যের দিকপালদের সঙ্গে মনোনয়ন পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন হোর্হে লুই বোর্হেস, এজরা পাউন্ড, ভ্লাদিমির নাবোকভ, আর্থার মিলার, গুন্টার গ্রাস ও উইলিয়াম গোল্ডিং ।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । তার মৃত্যু বাংলা সাহিত্য জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে ।
তার সমস্ত পুরস্কার ও স্মৃতিচিহ্ন বর্তমানে টালার বাসভবনে (এখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের এক্তিয়ারভুক্ত), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমিতে এবং কলকাতা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই বীরভূমের লাভপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ।
২: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস কোনটি?
তার প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণি’, যা ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয়। তার প্রথম গল্প ছিল ‘রসকলি’ (১৯২৮) ।
৩: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কয়টি উপন্যাস রচনা করেন?
তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটগল্প সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধ সংকলন, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণকাহিনি ও একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন ।
৪: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কোন কোন পুরস্কার পান?
তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫৫), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৬), পদ্মশ্রী (১৯৬২), জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৬৬) ও পদ্মভূষণ (১৯৬৮) লাভ করেন ।
৫: তারাশঙ্করের কোন উপন্যাসের জন্য তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান?
‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্য ১৯৬৬/৬৭ সালে তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন ।
৬: তারাশঙ্করের কোন উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে?
জলসাঘর’ ও ‘অভিযান’ (সত্যজিৎ রায়), ‘সপ্তপদী’ (অজয় কর), ‘গণদেবতা’ (তরুণ মজুমদার), ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ (তপন সিংহ) উল্লেখযোগ্য । মোট প্রায় ৪০টির বেশি চলচ্চিত্র তার রচনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ।
৭: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন?
হ্যাঁ, ১৯৭০ সালে সাহিত্য অকাদেমির সেক্রেটারি কৃষ্ণ কৃপালিনী তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হওয়ায় আর বিবেচিত হয়নি ।
উপসংহার: রাঢ়ের চিরন্তন কণ্ঠস্বর
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান থেকে রাজনৈতিক কর্মী, তারপর বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী—তার যাত্রাপথ ছিল এক বিরল সংগ্রামের কাহিনি। ৭৩ বছরের জীবনে তিনি ৬৫টি উপন্যাস রচনা করে দেখিয়েছেন—গ্রামীণ মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তর, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও পরাজয়।
তার লেখার সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানুষকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা। সাঁওতাল, বাগদি, ডোম, কবিয়াল, জেলে, কৃষক—গ্রামীণ জীবনের যত বৈচিত্র্য আছে, সবই তার কলমে স্থান পেয়েছে । জমিদারি প্রথার ভাঙন থেকে শিল্পায়নের আবির্ভাব, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে মন্বন্তরের করুণ চিত্র—সমাজের প্রতিটি পরিবর্তন তিনি ধারণ করেছেন তার সাহিত্যে ।
‘আরোগ্য নিকেতন’ যেমন তাকে এনে দিয়েছে সাহিত্য অকাদেমি ও রবীন্দ্র পুরস্কার , ‘গণদেবতা’ তাকে এনে দিয়েছে জ্ঞানপীঠ । ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন তার সাহিত্যের আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রমাণ ।
তিনি হয়তো নোবেল পাননি, কিন্তু বাংলার মানুষ তাকে নোবেলের চেয়েও বড় কিছু দিয়েছে—ভালোবাসা। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো আজও আমাদের মনের মধ্যে বাস করে। ‘গণদেবতা’-র জমিদারি থেকে ‘হাঁসুলী বাঁকের’ কাহার সমাজ, ‘জলসাঘর’-এর নায়ক থেকে ‘কবি’-র নিতাইচরণ—প্রত্যেকেই যেন আমাদের পরিচিত, আমাদের আপন।
তারাশঙ্কর নেই, কিন্তু তার বাংলা আছে। তার সাহিত্যে বেঁচে আছে রাঢ় বাংলার মাটি, তার মানুষ, তার ইতিহাস। আর এই উত্তরাধিকার চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অমলিন থাকবে।




