( লেখাটি পড়তে প্রায় 7 মিনিট সময় লাগতে পারে )

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জীবনী: বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পীর একুশের যাত্রা

সূচি

বাঙালির প্রিয় কথাকারের গল্প

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকহৃদয়ে বাস করে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। কিশোর-কিশোরীদের ‘অদ্ভুতুড়ে’ রহস্যের জগতে ভ্রমণ করানো থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছে গভীর দার্শনিক উপন্যাস উপহার দেওয়া—সব মিলিয়ে তিনি এক ‘বহুবর্ণ’ লেখক।

১৯৫৯ সালে ‘জলতরঙ্গ’ ছোটগল্প দিয়ে আত্মপ্রকাশের পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখালেখির প্রায় সাত দশকের যাত্রা। শবর দাশগুপ্ত, অদ্ভুতুড়ে সিরিজ, ‘মানবজমিন’, ‘পারাপার’—তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি গ্রন্থ যেন বাংলা সাহিত্যের একেকটি মাইলফলক।

এই নিবন্ধে আমরা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শৈশব, শিক্ষাজীবন, সাহিত্যযাত্রা, ব্যক্তিজীবন, পুরস্কার ও সম্মাননা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

জন্ম ও শৈশব: ব্রহ্মপুত্রের ধার থেকে কলকাতার পথে

ময়মনসিংহের মাটিতে শিকড়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর। তখন বাংলা ছিল ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ। তাঁর জন্মস্থান অধুনা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়

তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার কামারখাড়া ইউনিয়নের বাইনখাড়া গ্রামে)। তাঁর ঠাকুরদা আইন ব্যবসার জন্য বিক্রমপুরের বাইনখাড়া গ্রাম থেকে ময়মনসিংহে চলে আসেন

পিতা ফণীন্দ্রলাল মুখোপাধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের রেলওয়েতে চাকরি করতেন। শীর্ষেন্দুর জন্মের সময় তিনি ময়মনসিংহে বদলি ছিলেন। মাতার নাম গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়

ঘুরে বেড়ানো শৈশব

পিতার চাকরির সুবাদে ছোটবেলাতেই শীর্ষেন্দুকে বাংলা, আসাম ও বিহারের নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। উত্তরবঙ্গের মাল জংশন, দোমোহানি, পাণ্ডু, লামডিং, বদরপুর, আলিপুরদুয়ার, শিলিগুড়ি—এসব জায়গায় তাঁর জীবনের অনেক মুহূর্ত কেটেছে

জীবনের প্রথম এগারোটি বছর ময়মনসিংহের বাড়িতেই কাটে। সেই সময়ের ময়মনসিংহকে তিনি এক ‘রূপকথার রাজ্য’ বলেছেন। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, শরৎকালে কাশফুলে ভরে যাওয়া প্রকৃতি—সবই তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিতে গেঁথে আছে

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন:

“বাল্যকালের স্মৃতি একটু তরতাজাই থাকে। কেননা ভালো সময়ের স্মৃতি মানুষ ধরে রাখে। আর সব মানুষেরই শৈশবস্মৃতি একটু বেশি মনে থাকে। কাঁচা মনের ওপর ছাপ গভীর হয় বলে স্মৃতিতে থেকে যায়।”

দেশভাগ ও কলকাতায় পাড়ি

১৯৪৭ সালের দেশভাগের টালমাটাল সময়ে শীর্ষেন্দুদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। তখন তাঁর বয়স এগারো বা সাড়ে এগারো বছর। কলকাতায় আসার সময় ছোট্ট শীর্ষেন্দুর মনে ছিল শুধু ময়মনসিংহের ফেলে আসা স্মৃতি। তাঁর নিজের ভাষায়:

“চাকরি নিয়ে বাবা কলকাতায় চলে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পরে আমরা, অর্থাৎ মা, দিদি আর আমি কলকাতায় যাই। তার আগে অবশ্য বিস্তর কান্নাকাটি, হা-হুতাশের ব্যাপার ছিল। বিশেষ করে আমার জন্য দাদুর হাহাকার। আর আমার ব্যক্তিগত বিরহ ছিল ময়মনসিংহের জন্য।”

শিক্ষাজীবন: কোচবিহার থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

বোর্ডিং স্কুলে প্রথম পড়া

পরিবার কলকাতায় চলে আসার পর শীর্ষেন্দুকে ভর্তি করানো হয় কোচবিহারের একটি মিশনারি স্কুলে। বোর্ডিংয়ে থাকা তাঁর অভ্যাস হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি কোচবিহারের কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন

এরপর তিনি কোচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন। সেই সময় থেকেই তাঁর মধ্যে বই পড়ার অদম্য আগ্রহ ছিল।

বইপাগল ছেলেটির কলকাতায় আগমন

১৯৫৫ সালে তিনি বাংলায় সাম্মানিক সহ স্নাতক স্তরে ভর্তি হন কলকাতার সিটি কলেজে। সিটি কলেজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং সমালোচক ও গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসু

এছাড়া লেখক অমলেন্দু চক্রবর্তী এবং জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তী ছিলেন শীর্ষেন্দুর সহপাঠী। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হন। যদিও কৃতিত্বের জন্য নয়, সাহিত্যসাধনার আগ্রহেই পড়াশোনা করতেন তিনি

ছোটবেলা থেকেই শীর্ষেন্দু ছিলেন ভীষণ বইপড়ুয়া। হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন। খুব ছোটবেলাতেই তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের রচনাবলি পড়ে ফেলেছিলেন। এই পড়ার অভ্যাসই তাঁর লেখক সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে

সাহিত্যজীবনের সূচনা: ‘জলতরঙ্গ’ থেকে ‘ঘুণপোকা’

প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’

১৯৫৯ সালের ঘটনা। শীর্ষেন্দু তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র। সেই সময় ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, সেই সময়েই বরেন গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রমুখের সঙ্গে তাঁর আলাপ জমে ওঠে

প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’

প্রথম গল্প প্রকাশের সাত বছর পর ১৯৬৬ সালে (কোনো কোনো সূত্রে ১৯৬৭) ‘দেশ’ পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় শীর্ষেন্দুর প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’

উপন্যাসটি প্রকাশের পরই বাংলার সাহিত্যজগতে আলোড়ন পড়ে যায়। উপন্যাসে শ্যাম চরিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির অস্তিত্বের সংকট নিয়ে এক বিরাট প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন শীর্ষেন্দু

কর্মজীবন: শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা

স্কুল শিক্ষক থেকে ‘দেশ’-এর সম্পাদক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রথমে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে। মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড়ের একটি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালে কালীঘাট ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন

১৯৭৬ সালে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন। তারপরে দীর্ঘকাল তিনি ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকের পদে আসীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত

শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও বক্তৃতা

কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা প্রসঙ্গে তিনি এক সাক্ষাৎকারে মজা করে বলেছেন:

“তারপর কিছুকাল স্কুলে মাস্টারি করেছি। পড়ানোর মতো লোক ছিলাম বটে, কিন্তু শাসন করার মতো ছিলাম না। বরাবরই ছাত্ররা আমাকে ‘ভাই’ ভাবত। ‘স্যার’ নয়।”

ব্যক্তিজীবন: সংসার ও ভাবজগৎ

বিবাহ ও সন্তান

৯৬৮ সালে সোনামন চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শীর্ষেন্দু। তাঁদের এক ছেলে সম্রাট ও এক মেয়ে দেবলীনা

শীর্ষেন্দুর লেখায় যেমন সংসারের টানাপোড়েনের ছবি আছে, ব্যক্তিজীবনেও তিনি একজন সাজানো গোছানো সংসারী মানুষ। তাঁর মেয়ে দেবলীনা মুখোপাধ্যায় ‘বৈঠকী’ বইয়ে পিতার ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক দিক নিয়ে হৃদয়স্পর্শী রচনা লিখেছেন

ধর্মীয় দর্শন ও ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র

১৯৬৫ সালের শুরুর দিকে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের কাছে দীক্ষিত হন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। এটি তাঁর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন:

“আমার লেখায় ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের প্রভাব সবচেয়ে গভীর ও ব্যাপক। আমার জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছেন তিনি। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে ঠাকুর আমার জীবনের প্রধানতম উপকরণ।”

তবে তিনি প্রচারকের ভূমিকা নিতে চান না:

“আমাকে একটা প্রচারকের ভূমিকা নিতে হবে না। মানুষের নানারকম বিচ্যুতি-ব্যথা, দুঃখ-বেদনা, তার পাপ-পুণ্য, প্রেম-ভালোবাসা—ঠাকুর সবখানে জড়িয়ে আছেন। মানুষের কথা যখন বলছি, তখন ঠাকুরের কথাই বলা হচ্ছে।”

লেখালেখির অভ্যাস ও ভালোবাসা

লেখালেখির অভ্যাস সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে শীর্ষেন্দু বলেছেন:

“না, না, পাগল নাকি। ভীষণ অলস লোক আমি। লেখার অনুরোধ এলে তারপরই ভাবনা-চিন্তা শুরু করি; আরও অনেক পরে লিখতে শুরু করি এবং লেখা জমা দিই সবার শেষে। তাই আমাকে নিয়ে সম্পাদক ও প্রকাশকের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।”

এই আত্মসমালোচনামূলক মনোভাবই শীর্ষেন্দুকে পাঠকের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছে।

খেলাধূলার অনুরাগী

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শুধু বই নিয়ে থাকেন না, তিনি ক্রীড়ামোদীও। তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বক্সিং, টেনিস ও ফুটবল। পাঠক হিসেবে তিনি পছন্দ করেন ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ, থ্রিলার ও কল্পবিজ্ঞান

সাহিত্যকর্ম: বিস্তৃত পরিসরে অনন্য প্রতিভা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যভাণ্ডার বিশাল। তিনি প্রাপ্তবয়ুষ্ক ও শিশু-কিশোর উভয়ের জন্যই লিখেছেন। কিছু সূত্র মতে তিনি মোট ৮২টি উপন্যাস, ৩৭টি গল্প সংকলন ও শিশু-কিশোরদের জন্য প্রায় ৫৪টি বই লিখেছেন। অন্য সূত্রে বলা হয়েছে ২০০-এর বেশি উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ

জনপ্রিয় উপন্যাস

শীর্ষেন্দুর কালজয়ী উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ঘুণপোকা (১৯৬৬/৬৭) – প্রথম উপন্যাস, ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকট নিয়ে

  • পারাপার (১৯৭১) – ক্যান্সার রোগাক্রান্ত চরিত্রের গল্প

  • যাও পাখি (১৯৭৬) – বাংলাদেশে ধারাবাহিক নাটক নির্মিত

  • কাগজের বউ (১৯৭৭)

  • দূরবীন (১৯৮৬) – ধর্ষকামী চরিত্র ধ্রুব

  • মানবজমিন (১৯৮৮) – সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত

  • পার্থিব (১৯৯৪)

  • ওয়ারিশ (১৯৯৫)

  • অসুখের পরে (১৯৯৫)

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: উজান, ফেরা, শূন্যের উদ্যান, জাল, কাঁচের মানুষ, আলোয় ছায়ায়, নিচের লোক উপরের লোক, ক্রীড়াভূমি, তিথি, ইত্যাদি

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ: শিশু সাহিত্যের মাইলফলক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:

“কিশোর সাহিত্যের ধারাটা আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে বলে এতগুলো বই লিখেছি। এই ধরনের লেখা কেউ কম লিখেছেন। সেটার জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশল হল একই চরিত্র বারবার এনে নতুন কাহিনি লেখা।”

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:

সিরিজের নামপ্রকাশকাল
মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি১৯৭৮
গোঁসাইবাগানের ভূত১৯৭৯
হেতমগড়ের গুপ্তধন১৯৮১
নৃসিংহ রহস্য১৯৮৪
ভুতুড়ে ঘড়ি১৯৮৪
পাগলা সাহেবের কবর১৯৮৭
ঝিলের ধারে বাড়ি১৯৮৮
পটাশগড়ের জঙ্গলে১৯৮৯
অদ্ভুতুড়ে১৯৯৬
পাতালঘর১৯৯৬
নন্দীবাড়ির শাঁখ২০১৭

২০২২ সালেও ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ প্রকাশিত হয়েছে। এই সিরিজের গ্রন্থের সংখ্যা ৫০-এর বেশি

শবর দাশগুপ্ত ও গোয়েন্দা সিরিজ

শীর্ষেন্দুর আরেকটি সৃষ্টি গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত। তিনি স্বীকার করেন যে গোয়েন্দা কাহিনি লেখার পেছনে রয়েছে এই ধারার প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুরাগ।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন:

“শবর তো জনপ্রিয় ছিল না। শুরুতে শবরকে নিয়ে একে একে পাঁচটা উপন্যাস লিখেছি। … যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন শবর খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি। পরবর্তীকালে যখন সিনেমা হলো, তখন খুবই জনপ্রিয় হয়ে গেল।”

শবর সিরিজের উপন্যাস: ঋণ (১৯৯৫), আলোয় ছায়ায় (১৯৯৭), সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে (১৯৯৭), প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম (১৯৯৮), পদক্ষেপ, রূপ, মারীচ, ঈগলের চোখ, আমাকে বিয়ে করবেন?, তীরন্দাজ

গোয়েন্দা বরদাচরণ সিরিজও রয়েছে—কুস্তির প্যাঁচ, নয়নচাঁদ, গয়াপতির বিপদ, গোয়েন্দা

পুরস্কার ও সম্মাননা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন:

আনন্দ পুরস্কার (দুই বার)

১৯৭৩ সালে ‘পারাপার’ উপন্যাসের জন্য এবং ১৯৯০ সালে ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য

বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫)

শিশু-কিশোর সাহিত্যে ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ উপন্যাসের জন্য

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৮)

‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান

১৯৮৯ সালও উল্লেখ করা হয় কোনো কোনো সূত্রে

বঙ্গবিভূষণ (২০১২)

পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান

অন্যান্য সম্মান

কিছু সূত্রে রবীন্দ্র পুরস্কারবঙ্কিম পুরস্কার নামও উল্লেখ করা হয়, তবে তা ‘ঘুণপোকা’ বা অন্যান্য গ্রন্থের নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত নয়।

চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক: লেখার পর্দার আয়না

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বহু উপন্যাস চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক নাটকে রূপ পেয়েছে:

চলচ্চিত্র/ধারাবাহিকউপন্যাসের নামবিশেষত্ব
গয়নার বাক্স[চলচ্চিত্র]গয়নার বাক্স
মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি[চলচ্চিত্র]মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি
যাও পাখি[ধারাবাহিক]যাও পাখিবাংলাদেশে নির্মিত
মানবজমিন[ধারাবাহিক]মানবজমিনবাংলাদেশে নির্মিত
পাতা(ছবি)‘ছায়াময়’ (অনুমিত)

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশেও তাঁর গল্পের ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ‘যাও পাখি’ ও ‘মানবজমিন’ অবলম্বনে বাংলাদেশে ধারাবাহিক নাটক তৈরি হয়েছে

শীর্ষেন্দুর সাহিত্যদর্শন: ‘মানবজমিন’-এর পথে

মিশনারি ওয়ার্ক হিসেবে লেখালেখি

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাছে লেখালেখি আসলে একটা ‘মিশনারি ওয়ার্ক’ অর্থাৎ হিতকারী কাজ। তাঁর গল্প-উপন্যাসের মূল কেন্দ্রে থাকে মধ্যবিত্ত সমাজের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন

প্রভাবিত ব্যক্তিত্ব

‘বৈঠকী’ বইতে উল্লেখ পাওয়া যায় যে শীর্ষেন্দুর চিন্তা ও সৃষ্টিকে প্রভাবিত করেছিলেন সাগরময় ঘোষ, সমরেশ বসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মাদার টেরেজা, সত্যজিৎ রায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

লেখক বনাম ব্যক্তি

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন:

“আমার পক্ষে এটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কেননা আমার ব্যক্তিজীবন আর লেখকজীবনকে আমি আলাদা করে দেখি না। ব্যক্তিগত জীবনযাপনের বিচ্ছুরণ হলো আমার লেখা। … লেখকজীবনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবন একাকার।”

আজ শীর্ষেন্দু: প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার

২০২৪ সালে এসেও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিনি ৯০ বছরে পা রাখবেন

এক সাক্ষাৎকারে আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:

“নিশ্চয় পারি। আমার ছেলেমেয়েরা এদের সঙ্গে কানেক্টেড। আমি তো এই সময়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশি, আমার বয়সী লোকদের সঙ্গে আমি খুব বেশি মিশি না।”

এই উক্তি থেকেই বোঝা যায়, নব্বই বছরের কাছাকাছি বয়সেও তিনি যুব সমাজের চিন্তা ও ভাষা বোঝার চেষ্টা করে চলেছেন।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম তারিখ ও স্থান কী?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহে (অধুনা বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন

তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’, যা ১৯৬৬ সালে (কোনো কোনো মতে ১৯৬৭) ‘দেশ’ পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত হয়

শিশু-কিশোর সাহিত্যের ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজের চরিত্রগুলো। এছাড়া গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত এবং বরদাচরণও খুব জনপ্রিয়

উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৮), বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫), আনন্দ পুরস্কার (১৯৭৩ ও ১৯৯০), বঙ্গবিভূষণ (২০১২) ও রবীন্দ্র পুরস্কার

বৈঠকী’ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আত্মস্মৃতিমূলক রচনা, স্মৃতিচারণা ও সাক্ষাৎকারের সংকলন

সহজ-সাবলীল ভাষা, মধ্যবিত্তের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, ব্যক্তির অস্তিত্ব সংকট, আধ্যাত্মিকতা ও রহস্য-আবেদনের মিশেল। তিনি লেখাকে ‘মিশনারি ওয়ার্ক’ মনে করেন।

‘গয়নার বাক্স’, ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ‘যাও পাখি’ (বাংলাদেশে ধারাবাহিক), ‘মানবজমিন’ (বাংলাদেশে ধারাবাহিক)

উপসংহার: বাংলা সাহিত্যের অমর পুরোহিত

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সেই বিরল লেখক যিনি একসঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের ‘অদ্ভুতুড়ে’ রহস্যের জগত উপহার দেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক পাঠককে ‘মানবজমিন’-এর মতো দার্শনিক উপন্যাস পাঠ করান। তিনি যেমন রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারের লেখক, তেমনই গভীর জীবনবোধ ও অধ্যাত্মচেতনার দার্শনিক।

‘আমার লেখা পড়ে অনেকের ধারণা, ব্যক্তি শীর্ষেন্দু আর লেখক শীর্ষেন্দু আলাদা লোক’—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি যেমন বলেছিলেন, “আমার পক্ষে এটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কেননা আমার ব্যক্তিজীবন আর লেখকজীবনকে আমি আলাদা করে দেখি না।”

ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের শিষ্য এই লেখক তাঁর প্রতিটি রচনায় ভক্তির স্পর্শ রেখে চলেছেন। শতাধিক উপন্যাস, অসংখ্য ছোটগল্প, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, বঙ্গবিভূষণ—পদক আর স্বীকৃতির ভারে অভিজ্ঞ হলেও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আজও বাঙালির ‘আপন মানুষ’।

“মাটি থেকে ইট হয়, ইট থেকে বাসা—বাসা পুরাতন হয়ে ভেঙে যায়।”

হয়তো কোনো একদিন তিনিও পুরোনো বাসার মতো ভেঙে পড়বেন। কিন্তু তাঁর লেখা—‘মানবজমিন’, ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’, ‘পারাপার’, ‘শবর দাশগুপ্ত’—এসব চিরকাল বাঙালির হৃদয়ের জানালায় আলো জ্বালাতে থাকবে। সেদিনও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন—বেঁচে থাকবেন তাঁর শব্দের পরশ নিয়ে, তাঁর গল্পের জাদু নিয়ে, বাংলা সাহিত্যের অমর এক অধ্যায় হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে