সূচি
Toggleবাংলা সাহিত্যে ভূতের এক ভিন্ন স্বাদ
বাংলা সাহিত্যে ভূতের গল্পের কমতি নেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘ভূতুড়ে’ হোক বা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভৌতিক কাহিনি—প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বাদ রয়েছে। কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যে ভূতের সৃষ্টি করেছেন, তা সব রকমের ভূতের ধারণাকেই বদলে দেয়। শীর্ষেন্দুর ভূতেরা যেমন কখনও কখনও ভয় দেখায়, তেমনই কখনও তারা হাসিয়ে তোলে। কখনও তারা ‘গা ছমছমে’ নয়, বরং ‘মচমচে’—যেন সন্ধ্যার মুড়ি ভাজার মতো আনন্দময়!
‘২৫টি সেরা ভূত’ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম জনপ্রিয় ভৌতিক গল্প সংকলন । বইটিতে মোট পঁচিশটি ছোট গল্পের সমাহার ঘটেছে, যেখানে প্রতিটি গল্পে ভূতের ভিন্ন এক রূপ ফুটে উঠেছে। তবে এই ভূতেরা শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়; তারা বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের নানা অসঙ্গতি, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ব্যঙ্গবিদ্রূপের প্রতিচ্ছবিও বহন করে।
এই নিবন্ধে আমরা ‘২৫টি সেরা ভূত’ বইয়ের প্রতিটি গল্পের সারসংক্ষেপ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভূতচিন্তা, এই গ্রন্থের বিশেষত্ব ও পাঠকমহলে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যের বহুমুখী প্রতিভা
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভূতের গল্প পড়ার আগে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহে (অধুনা বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন । ভারত বিভাজনের পর তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে, এবং রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটান ।
শীর্ষেন্দু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং শিক্ষকতা পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন । বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ।
সাহিত্যকর্ম ও পুরস্কার
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রথম গল্প ‘জলতরঙ্গ’ ১৯৫৯ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । তার সাত বছর পর, ১৯৬৬ সালে, দেশ পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণ পোকা’ । ছোটদের জন্য তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ বাংলা সাহিত্যের কিশোর পাঠকদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয় ।
১৯৮৮ সালে তিনি তাঁর ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন । তিনি ছোট ও বড় সবার জন্য সমান স্বাচ্ছন্দ্যে লেখেন। কিশোর সাহিত্যে তাঁর অন্যান্য জনপ্রিয় সৃষ্টি ‘গোসাঁই-বাগানের ভূত’ বাংলা ভৌতিক সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ।
‘২৫টি সেরা ভূত’: বইয়ের পরিচিতি
প্রকাশনার তথ্য
‘২৫টি সেরা ভূত’ গ্রন্থটি মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত । বইটির প্রথম প্রকাশ হয় কলকাতা পুস্তকমেলায়, মাঘ ১৪০২ বঙ্গাব্দে । প্রচ্ছদপট এঁকেছেন সুধীর মৈত্র এবং মুদ্রণ করেছেন রাজা প্রিন্টার্স ।
বইটির আইএসবিএন ৮১-৭২৯৯৩-৩৪৬-০ । গুগল প্লে বুকস-এ ই-বুক আকারেও বইটি উপলব্ধ, যেখানে পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২১ এবং পাঠকদের রেটিং ৪.৭ (২৯টি রিভিউয়ের ভিত্তিতে) ।
সম্পাদনার প্রেক্ষাপট
বইটির ‘নিবেদন’ অংশে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় নিজেই লিখেছেন—এই সংকলনটি ‘অনেকগুলো মাথা এক হয়ে’ তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি মাথা তাঁর নিজের । তিনি স্বীকার করেছেন, “সম্পাদকের অনেক দোষ, তবু বলি দৌষগুলো ধরতে পারলে সংশোধন করা যাবে।” এই আত্মসমালোচনামূলক মনোভাবই শীর্ষেন্দুকে বাঙালির প্রিয় করে তুলেছে।
শীর্ষেন্দুর ভূতচিন্তা: ভয়ের চেয়ে মজাই বড়
‘২৫টি সেরা ভূত’ এর শুরুতেই আছে ‘ভূতিকা’ শিরোনামের একটি দীর্ঘ ভূমিকা । এই ভূমিকায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ভূত নিয়ে তাঁর নিজস্ব তত্ত্ব ও দর্শন তুলে ধরেছেন।
ভূত মানে শুধু ভয় নয়
শীর্ষেন্দু লিখেছেন:
“ভূত প্রসঙ্গটাই আবহাওয়া বদলে দেয়, রহস্য ঘনীভূত করে তোলে, মানুষ নড়েচড়ে বসে৷ ভূত আছে কি নেই এই প্রশ্ন তো অবান্তর, কারণ কেউই জানে না তা৷ তবে ভূত আমাদের প্রিয় বিষয়। ভূত এবং ভৌত পরিমন্ডল আমাদের জীবনের ধরাবাঁধা সীমানাকে প্রসারিত করে দেয়। ভূত মানে শুধু ভয় নয়, মজা, কল্পনার চিন্তার এবং অবশ্যই এক প্রয়োজনীয় অসঙ্গতি।”
এই উক্তিতে ফুটে ওঠে শীর্ষেন্দুর ভূতচিন্তার মূলমন্ত্র। ভূতের গল্প যেন একদিকে যেমন রহস্যময়, অন্যদিকে তেমনি হাস্যরসেরও উৎস।
সব দেশেই ভূতের কদর
শীর্ষেন্দু তাঁর ভূমিকায় বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির ভূতের উল্লেখ করেছেন:
“সব দেশেই ভূতের এক একটা নাম আছে। বেদের আমল থেকে ভূতেদের অগ্রগতি ও প্রগতি শুরু হয়েছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সব দেশেই ভূতেদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি আছে। স্পুক, স্পিকি, গবলিন প্রভৃতি বিলিতি ভূতেরা গোস্ট, স্পিরিটদের পাশে নিশ্চয়ই বর্তমান আছেন। জিন, জান, আফিদ, মারিদ প্রভৃতি আরবি-কাবুলি ভূতেদের দাপাদাপি নিশ্চয়ই অব্যাহত।”
তিনি সত্যজিৎ রায়ের ভূতের চলচ্চিত্রের কথাও স্মরণ করেছেন: “সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত ভূতের নাচ ছবিতে দেখিয়ে বাজার মাত করেছিলেন।”
লোডশেডিং ও ভূতের প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে চিরচেনা এক প্রসঙ্গ টেনেছেন শীর্ষেন্দু:
“যেরকম লোডশেডিং চলছে তাতে তাঁদের ফিরে আসার প্রচুর সম্ভাবনা। কারণ ভূত-ভূতিনীরা অন্ধকারটাকেই বেশি পছন্দ করে। দুর্যোগপূর্ণ অমাবস্যার রাত্রিতে তাঁরা একটু বেশি সচল হন।”
এই রসবোধ ও বাস্তবতার চমৎকার মিশ্রণই শীর্ষেন্দুর ভূতের গল্পকে অনন্য করে তুলেছে।
২৫টি গল্পের সম্পূর্ণ তালিকা
‘২৫টি সেরা ভূত’ সংকলনে নিচের গল্পগুলো স্থান পেয়েছে :
| ক্রমিক | গল্পের নাম | ইংরেজি বানান |
|---|---|---|
| ১ | ভূতের ভবিষ্যৎ | Bhuter Bhabishyat |
| ২ | দুই পালোয়ান | Dui Palowan |
| ৩ | গন্ধটা খুব সন্দেহজনক | Gandhata Khub Sandehejanak |
| ৪ | কৌটোর ভূত | Koutor Bhut |
| ৫ | শিবেনবাবুর ইস্কুল | Shibenbabur Iskul |
| ৬ | কৃপণ | Kripan |
| ৭ | লালটেম | Lalotem |
| ৮ | ইঁদারায় গন্ডগোল | Indaray Gandogol |
| ৯ | পুরোনো জিনিস | Purono Jinis |
| ১০ | কালীচরণের ভিটে | Kalicharaner Bite |
| ১১ | টেলিফোনে দুই ভূত | Telephone-e Dui Bhut |
| ১২ | নফরগঞ্জের রাস্তা | Noforganjer Rasta |
| ১৩ | ভূত ও বিজ্ঞান | Bhut O Bigyan |
| ১৪ | আয়নার মানুষ | Aynar Manush |
| ১৫ | মাঝি | Majhi |
| ১৬ | কালাচাঁদের দোকান | Kalachander Dokan |
| ১৭ | কোগ্রামের মধু | Kogramer Modhu |
| ১৮ | পন্ডিত | Pondit |
| ১৯ | ধুলোটে কাগজ | Dhulote Kagaj |
| ২০ | গুপ্তধন | Guptodhon |
| ২১ | লোকটা | Lokta |
| ২২ | শিবেনবাবু ভালো আছেন তো | Shibenbabu Bhalo Aachen To |
| ২৩ | ঢেকুর | Dhekur |
| ২৪ | নয়নচাঁদ | Noyonchand |
| ২৫ | জকপুরের হাটে | Jakpurer Hate |
গল্পের বৈচিত্র্য: ‘অদ্ভুতুড়ে’ সব কাণ্ডকারখানা
বইটির প্রচ্ছদের ভাষায় বলা হয়েছে: “ভূত নিয়ে অদ্ভূত! না শুধু অদ্ভুতই নয়, রীতিমতো অদ্ভুতুড়ে সব কাণ্ড।”
ভয় ও হাসির মিশেল
এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে: “শীর্ষেন্দু বাবুর ভূতগুলো বেশিরভাগই নিরীহ। তারা ভাল করে মানুষের, গল্প গুজবে সন্ধ্যার মুড়ি ভাজার মতো মচমচে, ঘুগনির মতো নরম। তাদের নিয়ে শীতের রাতে কনকনে গা কাঁপানো অনুভূতি একটু কম কিন্তু তাতে কারো আপত্তি নেই।”
অন্য এক পাঠকের মতে: “শীর্ষেন্দুর ভূতগুলো বেশিরভাগই নিরীহ। তারা ভালোবাসে মানুষের। বইয়ের নাম ভৌতিক গল্পসমগ্র হলেও এগুলোকে আদতে ভৌতিক রম্যগল্প বলা চলে।”
সাই-ফাইয়ের স্পর্শ
এই সংকলনের বেশ কয়েকটি গল্পে ভৌতিকতার সঙ্গে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির স্পর্শ রয়েছে। ‘ভূত ও বিজ্ঞান’ গল্পটি যেমন বিজ্ঞানের চোখে ভূতকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস, তেমনি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ গল্পটি ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও ভূতের সম্মিলন। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে: “আবার কিছু গল্পে শুধু ভৌতিক ব্যাপারটাই না বরং সাই-ফাই ব্যাপারটাকেও টেনে এনেছেন লেখক।”
গণপিতেক ধরার উপায়?
এক রিভিউতে দারুণ মজার একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে:
“নইলে গণপিতেক সপাটে ধরার মুহূর্তেই হঠাৎ পোঁ করে একটা মশা কিশোরীর নাকে ঢুকে যেন বিপত্তি বাঁধাতে যাবে ? কেনই বা প্রথমে জাল ফেলে, পের আটাকাঠি দিয়ে চেষ্টা করেও জয়তিলকবাবু ভূত ধরতে পারবেন না? ঘাড়টা কেমক্কা কেন সুড়সুড় করে উঠবে নয়নচাঁদের? লালু-ভুলুকে বেকুব বানিয়ে যতীন মুৎসুদ্দির আত্মা শরীর ছেড়ে কেন হঠাৎ চোঁ করে এরোপ্লেনের মতো উড়ে যাবে নাকের ফুটো দিয়ে?”
এই রকম অসংখ্য ‘তুলকালাম’ কাণ্ডকারখানা প্রতিটি গল্পে পাঠককে মুগ্ধ করে।
‘২৫টি সেরা ভূত’-এর বিশেষত্ব
১. কিশোরদের জন্য অনন্য উপহার
এই বইটি বিশেষভাবে কিশোর-কিশোরীদের কথা মাথায় রেখে লেখা। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখনী এতটাই সাবলীল যে যে কোনো বয়সের পাঠক সহজেই এর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে। গল্পের ভাষা ও ঘটনাবলি সেরকম ‘গা ছমছমে’ নয়, বরং মজাদার ও উপভোগ্য ।
২. বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ানো ভূত
শীর্ষেন্দুর ভূতেরা উড়তে পারে না, শিকল ঝনঝনায় না, আর দশজনের মতো বাঙালি ঘরের নিত্যদিনের নানা সমস্যায় জর্জরিত। তাঁরা যেমন অশরীরী আবার তেমনই শরীরী। ‘গন্ধটা খুব সন্দেহজনক’ গল্পের ভূতের গন্ধ টের পাওয়া যায়, আবার ‘টেলিফোনে দুই ভূত’ গল্পে ভূতেরা ফোনে কথা বলে!
৩. বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি
প্রতিটি গল্পে ফুটে ওঠে বাঙালি সমাজের চিরচেনা ছবি। বস্তির গলি থেকে শুরু করে জমিদারবাড়ির ভিটে, আধুনিক অফিস থেকে শুরু করে গ্রামের হাট—ভূতেরা সর্বত্রই উপস্থিত। এই বৈচিত্র্য বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
৪. সম্পাদকীয় নিষ্ঠা
শীর্ষেন্দু নিজেই সম্পাদক হিসেবে সতর্ক থেকেছেন। ‘নিবেদন’ অংশে তিনি লেখকের পাশাপাশি সম্পাদকের দায়বদ্ধতার কথাও লিখেছেন। এই স্বীকৃতি ও নম্রতা পাঠকের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছে।
বিতর্ক ও সমালোচনা: ‘সেরা’ ধারণাটি কতটা সত্যি?
যেকোনো জনপ্রিয় বই নিয়ে যেমন নানা মতামত থাকে, তেমনি ‘২৫টি সেরা ভূত’ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কিছু পাঠক বইটির নাম ও বিষয়বস্তুর মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নেতিবাচক মতামত
“কারা যে এই তথাকথিত ‘সেরা’ বেছে নেয়! বইয়ের গোটাচারেক গল্প ভূতের গল্প হিসেবে স্মরণীয়। কিন্তু সেগুলো আমরা ইতিমধ্যেই অজস্র সংকলনে অজস্রবার পড়েছি। বাকি গল্পগুলো আজকের ছোটো-বড়ো কোনো পাঠকেরই ‘ভূতের গল্প’ হিসেবে পোষাবে না।”
অন্য এক পর্যালোচক মত দিয়েছেন:
“২৫টি গল্পের মধ্যে ২-৩টিই ভালো, বাকিগুলো খুবই সাধারণ মানের গল্প এবং মোটেই মনে রাখার মতো নয়।”
কেউ কেউ বইটিকে ‘অসম্ভব শিশুতোষ’ আখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ বলেছেন ‘প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে পড়ে আদৌ মজা পাওয়া যাবে না’ ।
ইতিবাচক সাড়া
অন্যদিকে অনেকে বইটির প্রশংসাও করেছেন। একজন বলেছেন:
“ভয় অনেক দূরের ব্যাপার; এমনকি গা ছমছমে ভাবও আসবে না এই গল্পগুলো পড়ে। বরং কয়েকটা গল্প হাসির খোরাক যোগায়। ... শীর্ষেন্দুর লেখনশৈলী চমৎকার।”
গুগল প্লে বুকস-এ বইটির রেটিং ৪.৭ (২৯টি রিভিউয়ের ভিত্তিতে) , যা বেশ উঁচু। তবে এই রিভিউ সংখ্যা কম হওয়ায় এটিকে প্রতিনিধিত্বমূলক বলা যাবে না।
শীর্ষেন্দুর ভূত: সাহিত্যের ক্যানভাসে এক ভিন্ন রঙ
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা বইয়ের তুলনায় তাঁর কিশোর সাহিত্যের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ‘গোসাঁই-বাগানের ভূত’, ‘ভৌতিক গল্পসমগ্র’—এসব বই কিশোর সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ ।
শীর্ষেন্দুর ভূতেরা সাধারণ ভূতের গল্পের ভূতদের মতো নয়। তারা ভয় দেখায় না; বরং ‘বন্ধু’ হয়ে উঠতে চায়। এক পর্যালোচকের মন্তব্য:
“ব্র্যান্ড শীর্ষেন্দুর ভালো ভূত, ছাপোষা ভূতের কথা। পড়ুন, মন ভালো করুন, আর নিজদের বাড়ির সব কোণে কোণে লেড লাইট লাগাবেন না, কিছুটা অন্ধকার ছাড়ুন, নইলে বেচারারা অবলুপ্ত হয়ে যাবে!”
আরও পড়তে পারেন: ‘ভূতের ১০০ বাড়ি’
‘২৫টি সেরা ভূত’-এর সাফল্যের পর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত আরেকটি ভৌতিক সংকলন ‘ভূতের ১০০ বাড়ি’ প্রকাশিত হয়েছে, যাতে রয়েছে ১০০টি ভৌতিক গল্প । বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৮৮ এবং মূল্য ২৫০ টাকা যারা ভূতের গল্পের বড় সংকলন খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি আদর্শ সংগ্রহ।
উপসংহার: শীর্ষেন্দুর ভূতের জাদু
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘২৫টি সেরা ভূত’ বাংলা ভৌতিক সাহিত্যে এক ভিন্ন স্বাদের সংযোজন। যেখানে অন্যরা ভূত দিয়ে ভয় দেখাতে চান, শীর্ষেন্দু সেখানে এনেছেন হাসি ও মমতা। যেখানে অন্য ভৌতিক গল্প পাঠকের শরীরে শিরশিরানি তৈরি করে, শীর্ষেন্দুর গল্পগুলো হাসির খোরাক জোগায়।
এক পর্যালোচক যেমনটি লিখেছেন: “শীতের রাতে কনকনে গা কাঁপানো অনুভূতি এ বইয়ে একটু কম, কিন্তু তাতে কারো আপত্তি নেই” । বরং, এই বই পড়ে যে উষ্ণতা ও আনন্দ পাওয়া যায়, তা অসাধারণ।
বইটি আদৌ ‘সেরা’ ভূতের গল্পের সংকলন কিনা, সে নিয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু একটি বিষয়ে সবাই একমত—শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে ‘ভিন্ন রকম’ এক ভূতের সৃষ্টি করেছেন, যারা আমাদের ভয় দেখানোর বদলে আমাদের হাসায়, ভাবায় এবং সবচেয়ে বড় কথা, অন্ধকারেও বন্ধুর মতো পাশে থাকে।
“পড়ুন, মন ভালো করুন, আর নিজদের বাড়ির সব কোণে কোণে লেড লাইট লাগাবেন না, কিছুটা অন্ধকার ছাড়ুন, নইলে বেচারারা অবলুপ্ত হয়ে যাবে!”
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
‘২৫টি সেরা ভূত’ বইটির লেখক কে?
বইটির সম্পাদক ও প্রধান লেখক হলেন বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় । তবে শীর্ষেন্দু নিজেই স্বীকার করেছেন যে এটি ‘অনেকগুলো মাথা এক হয়ে’ তৈরি একটি সংকলন ।
২: বইটিতে মোট কয়টি গল্প আছে?
বইটির নাম অনুসারে এতে মোট ২৫টি ভৌতিক গল্প রয়েছে ।
৩: এই বইটি কোন বয়সীদের জন্য উপযোগী?
বইটি প্রধানত কিশোর ও তরুণ পাঠকদের জন্য লেখা। পর্যালোচকদের মতে গল্পগুলো বেশ শিশুতোষ ও হালকা প্রকৃতির । প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এতে ‘গা ছমছমে’ ভয়ের অভাব থাকতে পারে, তবে হালকা মনোরঞ্জনের জন্য যে কেউ পড়তে পারেন ।
৪: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ভৌতিক বই কোনটি?
‘২৫টি সেরা ভূত’ এবং ‘গোসাঁই-বাগানের ভূত’ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভৌতিক রচনা। এছাড়া ‘ভৌতিক গল্পসমগ্র’ নামেও একটি সংকলন রয়েছে ।
৫: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কোন পুরস্কার পেয়েছেন?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৮৮ সালে ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করেন ।
৬: শীর্ষেন্দুর ভূতের গল্পের বিশেষত্ব কী?
শীর্ষেন্দুর ভূতেরা নিরীহ, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক। তিনি ভূত নিয়ে ভয়ের চেয়ে মজা ও রসবোধকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর ভূতের গল্পগুলো প্রায়ই হাস্যরস ও রহস্যের মিশেলে তৈরি ।
৭: বইটির ই-বুক সংস্করণ কোথায় পাওয়া যায়?
‘২৫টি সেরা ভূত’ বইটির ই-বুক সংস্করণ গুগল প্লে বুকস-এ পাওয়া যাবে ।



