সূচি
Toggleভালোবাসার যে সংজ্ঞা শীর্ষেন্দু দিয়ে গেলেন
বাংলা সাহিত্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের স্থান অনন্য। থ্রিলার, ক্রাইম কিংবা ভূতের গল্পে যেমন তিনি সিদ্ধহস্ত, তেমনি প্রেম ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে তাঁর লেখা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। শীর্ষেন্দু যখন প্রেম নিয়ে লেখেন, তখন তা কখনোই চিকন নয়, কখনোই কেবল রোমান্টিক নয়। বরং তাঁর ভালোবাসার সংজ্ঞা প্রায়শই নির্মোহ, বাস্তব ও কাঁচা।
বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, “এমনিতেই আমি শীর্ষেন্দুর লেখার খুব ভক্ত। কী গভীরতা! আর কত ধরনের প্লট, কত বৈচিত্র। ও যে কোথা থেকে এত রসদ পায়, ও-ই জানে” ।
এই গভীরতাই শীর্ষেন্দুর প্রেমের উক্তিগুলোকে অনন্য করেছে। প্রতিটি উক্তি যেন পাঠককে বলে—তোমার জীবনের ভালোবাসার গল্পটাও ঠিক এরকমই ছিল, শুধু বলে ওঠার মতো কেউ ছিল না।
এই নিবন্ধে আমরা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের রচিত বিভিন্ন উপন্যাস ও সাক্ষাৎকার থেকে সংগৃহীত প্রেম ও সম্পর্কের উক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
ভালোবাসার সংজ্ঞা: ‘গয়নার বাক্স’-এর অমর উক্তি
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেমের উক্তিটি ‘গয়নার বাক্স’ উপন্যাসের। এটি এতটাই জনপ্রিয় যে বাংলা সাহিত্যের প্রেমের উক্তির তালিকায় এটি শীর্ষ স্থান দখল করে আছে:
“আমি যে তাকে ভালবাসি তা ওঁর রূপের জন্যও নয়, গুণের জন্যও নয়। ভাল না বেসে থাকতে পারি না বলে বাসি।”
এই উক্তির অসাধারণত্ব এখানেই যে, তিনি ভালোবাসার কোনো কারণ খোঁজেননি। প্রেমিকার রূপ বা গুণের জন্য নয়, বরং ‘ভালোবেসে ফেলেছি’ বলার বদলে তিনি বলেছেন—‘ভাল না বেসে থাকতে পারি না’। এটি ভালোবাসার এক অনন্য সংজ্ঞা, যা যুক্তির ঊর্ধ্বে—একটি অকারণ, অমূলক অনুভূতি।
শীর্ষেন্দুর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি ভালোবাসার কর্মময় রূপ নিয়ে:
“ভালোবাসা মানেই কিন্তু ভালো করা। তার ভালোর জন্যে কিছু যদি না-ই করলে তাহলে ভালোবাসা বন্ধ্যা হয়ে গেল, মিথ্যে হয়ে গেল।”
সাধারণের ধারণা ভালোবাসা নিষ্ক্রিয় অনুভূতি হলেও শীর্ষেন্দু বলছেন, ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে হবে কাজের মাধ্যমে। শুধু বলা যথেষ্ট নয়; প্রমাণ করতে হবে।
তিনি আরও এক জায়গায় লেখেন:
“ভালবাসলেই অ্যাকসেপ্ট করা যায় ঠিকই, কিন্তু অ্যাকসেপ্ট করলেই ভালবাসা যায় কি?”
ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা সমার্থক নয়—এটি সম্পর্কের গভীর সত্য। একজন মানুষকে মেনে নেওয়া মানেই তাকে ভালোবাসা নয়, আবার ভালোবাসলে সবকিছু মেনে নিতেও হয় না।
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি ভালোবাসার অস্তিত্ব নিয়েও মজার মন্তব্য করেছেন:
“ভালোবাসা নেই বলেই ভালোবাসার কথা এত শোনা যায়”
‘মানবজমিন’-এ প্রেম ও নিঃসঙ্গতার দ্বান্দ্বিকতা
‘মানবজমিন’ শীর্ষেন্দুর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কালজয়ী উপন্যাস। এখানে ভালোবাসার পাশাপাশি নিঃসঙ্গতা, অপেক্ষা ও আত্মার তৃষ্ণার গভীর বর্ণনা রয়েছে।
দীপনাথ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি লিখেছেন:
“একদিন কি পাহাড় ডাকবে না তাকে?”
পাহাড়ের ডাক—এটি যেন সেই ভালোবাসার প্রতীক, যা অধরা, যা সুদূর, কিন্তু যার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করা যায়। দীপনাথের এই প্রশ্নটি যেকোনো প্রেমিকের মনকে নাড়া দেয়।
আরেক উক্তিতে তিনি বলেছেন:
“যে জীবন তাঁর নয়, যে জীবন তাঁর কখনো হবে না তাকে সিংহাসনে বসিয়ে মানুষ মাঝে মাঝে এরকম ধূলায় পরে কাঁদে।”
অধরা প্রেম, যাকে পাওয়া যাবে না—তাকে সিংহাসনে বসিয়ে কাঁদা! কী নির্মোহ, কী বাস্তব! এই উক্তিটি যেন অপ্রাপ্তি প্রেমের বেদনার চূড়ান্ত রূপ।
‘মানবজমিন’ থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি:
“যে মানুষ নিজের বশে থাকে না সে নানা অবস্থার চাপে পরে নানারকম মানুষের একটা সমষ্টি হয়ে দাঁড়ায়।”
ভালোবাসার সম্পর্কে আমরা কতটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকি, আর কতটা পরিস্থিতির চাপে অন্য মানুষ হয়ে যাই—এ প্রশ্ন শীর্ষেন্দু এখানে ছুঁড়ে দিয়েছেন।
তিনি নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মতো চরিত্রের উক্তি দিয়েছেন:
“বিশাল বিশ্বজগতের কথা যখনই সে ভাবতে শুরু করে তখনই তুচ্ছ হয়ে যায় তার সব প্রিয়জন, তার চাকরি, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা।”
‘যাও পাখি’-তে প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক
‘যাও পাখি’ উপন্যাস থেকে শীর্ষেন্দুর একটি বিশেষ প্রেমের উক্তি:
“একজন মহাপুরুষ বলেছেন— আমি যে তোমার অন্তর্যামী তা কিন্তু এমনিতে নয়। তুমি যতক্ষণ আমাকে ভালবাসো ততক্ষণই আমি তোমার অন্তর্যামী। তোমার ভালবাসাই আমাকে অন্তর্যামী করেছে নইলে আমি তোমার কেউ নই।”
এই উক্তিতে প্রেম ও বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। ভালোবাসাই মানুষকে অন্য মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে—ভালোবাসা না থাকলে ‘আমি তোমার কেউ নই’। এটি একইসঙ্গে আধ্যাত্মিক ও বাস্তবিক বাণী।
‘সাঁতারু ও জলকন্যা’ ও ‘চক্র’-এর প্রেমের উক্তি
‘সাঁতারু ও জলকন্যা’ উপন্যাসটিও প্রেমের নানা মাত্রা তুলে ধরে:
“শুধু বেঁচে থাকতে পারলে, কোনওরকমে কেবলমাত্র বেঁচে থাকতে পারলেও জীবনে কত কী যে হয়!”
“মরতেই যে তার জন্ম এটা বনানী খুব ভাল করে জানে। বেঁচে থাকতে পারে তারাই যাদের বেঁচে থাকাটা অন্য কেউ চায়। যাদের ভালবাসার লোক আছে। বনানীর তো সেরকম কেউ নেই। কে চাইবে যে সে বেঁচে থাকুক?”
এই উক্তিতে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় সত্য প্রকাশ পায়—ভালোবাসার মানুষ না থাকলে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই কমে যায়। প্রিয় মানুষই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
‘চক্র’ উপন্যাসের একটি মর্মস্পর্শী উক্তি:
“দুঃখী মানুষ, তোমার ভালো হোক।”
সম্পর্ক ও বিয়ে: বাস্তবের কঠিন সত্য
শীর্ষেন্দু শুধু প্রেম নিয়ে লেখেননি; তিনি সম্পর্কের জটিলতা, বিয়ের বাস্তবতা ও স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বও তুলে ধরেছেন নির্মম সত্যের আলোকে।
স্বামী-স্ত্রীর অহংকারের লড়াই
“বোধ হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রবলেম হল অহংকারের লড়াই।”
“কোন কোন স্বামী-স্ত্রী বোধহয় তাদের সম্পর্কের বিষকেই বেশী উপভোগ করে। মধুর কথা তারা কানে নেবে না।”
বিবাহ ও প্রেমের সমাধি
“প্রেম জিনিসটা কম দামী সেন্টের মতো, গন্ধ টপ করে উবে যায়। একজন চিন্তাশীল, কল্পনাপ্রবন মানুষ বিয়ের পর হয়ে যায় শ্রমিকের মতো। প্রেমের সমাধির উপরেই তো বিয়ের সৌধ।”
এই উক্তিটি সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন সত্য বলেছে। প্রেম যখন বিয়েতে পরিণত হয়, তখন সেই উচ্ছ্বাস কমে আসে এবং দায়িত্বের বোঝা বাড়ে। শীর্ষেন্দু এটাকে ‘প্রেমের সমাধির ওপর বিয়ের সৌধ’ বলে অভিহিত করেছেন—যা ভাবিয়ে তোলে।
পুরুষের মানসিকতা নিয়ে কঠিন সমালোচনা
“এই সেই পুরুষ যে স্ত্রীর কাছে কেবলই আশা করে বশ্যতা, মুগ্ধতা, নতশির দাসত্ব, প্রত্যুত্তরহীন অপমানের পাত্রী। এই সেই পুরুষ যারা গুহামানবের উত্তরাধিকার এখনও রক্তে বহন করে। যারা শয্যাসঙ্গিনী ছাড়া স্ত্রীকে আর কিছুই ভাবতে পারে না। এদের চাই একটি সুন্দরী জ্যান্ত রক্তমাংসের পুতুল।”
শীর্ষেন্দু এখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক তীব্র সমালোচনা করেছেন—যেখানে স্ত্রীকে মানুষ নয়, পুতুল হিসেবে দেখা হয়।
বাঙালির প্রেম ও বিবাহ
“বাঙালিদের প্রেম হল সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার আর বিয়ে হল মস্ত কীর্তি।”
একটি ব্যঙ্গাত্মক পর্যবেক্ষণ—বাঙালির কাছে প্রেম মানে রোমাঞ্চ, বিয়ে মানে অর্জন। প্রেমকে কীর্তি বলা হয় না, বলা হয় অ্যাডভেঞ্চার। বিয়েকে অ্যাডভেঞ্চার বলা হয় না, বলা হয় কীর্তি।
‘গয়নার বাক্স’-এর অন্যান্য প্রেম ও সম্পর্কের উক্তি
‘গয়নার বাক্স’ উপন্যাসটি ভালোবাসার উক্তির ভাণ্ডার:
“বেশির ভাগ মানুষেরই অভ্যাস হল, যেখানে বলার কথা কিছু নেই, সেখানেও অকারণে কথা বলে যায়, প্রয়োজন থাক বা না থাক।”
“যাকে বোঝা যায় না, যে কম কথা বলে এবং যার অনেক কাজই স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, তার সম্পর্কে আশেপাশের লোকের খানিকটা ভয় থাকে।”
“সংসারের সম্পর্কগুলো এমন সব সূক্ষ্ম ভারসাম্যতার ওপর নির্ভর করে যে একটা মাছি বসলেও পাল্লা কেটে যায়।”
মানুষ ও সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ উক্তি
শীর্ষেন্দুর পর্যবেক্ষণী শক্তি অসাধারণ। সাধারণ মানুষের আচার-আচরণ, সম্পর্কের গতি-প্রকৃতি—সবকিছুই তিনি গভীরভাবে দেখেছেন:
“বাপ আর ছেলের মধ্যে যেমন জেনারেশন গ্যাপ থাকে, দাদু আর নাতির মধ্যে তেমনটা না থাকতেও পারে। বাপ আর ছেলে সব সময়েই সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনার মধ্যে থাকে। দাদু আর নাতির সেই ভয় নেই। প্রজন্মগত পার্থক্যটা বেশি হওয়ার দরুনই বোধহয় তাদের মধ্যে এক সমঝোতা গড়ে ওঠে।”
“আলাপ করতে একটা টিউনিং দরকার, টিউনিং না থাকলে কথা আসেনা।”
“মানুষ ‘ঘর ঘর’ করে গলা শুকায়। একখানা ঘর আর কতখানিই বা আশ্রয় দেয় মানুষকে, যদি না ঘরের লোক আপন হয়।”
“কারো আদর কাড়া কথা শুনলে, মন মরা জীবনেও মাঝে মাঝে বাঁচতে ইচ্ছে জাগে, অল্প আদর পেলেই মনে হয় অনেকখানি পেয়ে গেলাম। আর বুঝি কিছু চাওয়ার নেই।”
প্রেম নিয়ে শীর্ষেন্দুর বই
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রেম নিয়ে পৃথক কিছু বইও লিখেছেন। ‘৫০টি প্রেমের গল্প’ (50ti Premer Galpa) তাঁর এমনই একটি সংকলন। এই বইয়ে শরীরী, অশরীরী, জান্তব, যান্ত্রিক—নানা ধরনের প্রেমের গল্প স্থান পেয়েছে।
একজন পাঠকের ভাষায়: “শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘২৫টি প্রেমের গল্প’ বইটা পড়তে পড়তে মনে হলো, প্রতিটি গল্প যেন আমাদের চেনা সম্পর্কের অচেনা সব বাঁক। যারা ভালোবাসার জটিল অথচ মায়াবী সমীকরণ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই বইটি মাস্ট রিড!”
গুগল প্লে বুকস-এ ‘৫০টি প্রেমের গল্প’ বইটির রেটিং ৪.৫। শীর্ষেন্দুর ‘ভালোবাসা’ (Valobasha) নামেও একটি বই আছে।
বাস্তব জীবনে শীর্ষেন্দু: ভালোবাসা নিয়ে সাক্ষাৎকার
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবন ও ভালোবাসার ধারণা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত উক্তি:
“ভালোবাসা নেই বলেই ভালোবাসার কথা এত শোনা যায়”
“আমার পক্ষে এটা ব্যাখ্যা করা মুশকিল। কেননা আমার ব্যক্তিজীবন আর লেখকজীবনকে আমি আলাদা করে দেখি না। ব্যক্তিগত জীবনযাপনের বিচ্ছুরণ হলো আমার লেখা।”
“আমি তো এই সময়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশি, আমার বয়সী লোকদের সঙ্গে আমি খুব বেশি মিশি না।”
প্রেমের উক্তির বিষয়ভিত্তিক সারণি
| বিষয় | উক্তি | সূত্র গ্রন্থ |
|---|---|---|
| ভালোবাসার অকারণতা | “আমি যে তাকে ভালবাসি তা ওঁর রূপের জন্যও নয়, গুণের জন্যও নয়। ভাল না বেসে থাকতে পারি না বলে বাসি।” | গয়নার বাক্স |
| ভালোবাসার কর্মময় রূপ | “ভালোবাসা মানেই কিন্তু ভালো করা। তার ভালোর জন্যে কিছু যদি না-ই করলে তাহলে ভালোবাসা বন্ধ্যা হয়ে গেল, মিথ্যে হয়ে গেল।” | |
| ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা | “ভালবাসলেই অ্যাকসেপ্ট করা যায় ঠিকই, কিন্তু অ্যাকসেপ্ট করলেই ভালবাসা যায় কি?” | কোলাজ |
| অহংকারের লড়াই | “বোধ হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রবলেম হল অহংকারের লড়াই।” | মানবজমিন |
| বিষাক্ত সম্পর্ক | “কোন কোন স্বামী-স্ত্রী বোধহয় তাদের সম্পর্কের বিষকেই বেশী উপভোগ করে। মধুর কথা তারা কানে নেবে না।” | |
| প্রেমের ক্ষয় | “প্রেম জিনিসটা কম দামী সেন্টের মতো, গন্ধ টপ করে উবে যায়। প্রেমের সমাধির উপরেই তো বিয়ের সৌধ।” | |
| অধরা প্রেম | “যে জীবন তাঁর নয়, যে জীবন তাঁর কখনো হবে না তাকে সিংহাসনে বসিয়ে মানুষ মাঝে মাঝে এরকম ধূলায় পরে কাঁদে।” | মানবজমিন |
| বাঙালির প্রেম | “বাঙালিদের প্রেম হল সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার আর বিয়ে হল মস্ত কীর্তি।” | |
| ভালোবাসার মানুষ | “বেঁচে থাকতে পারে তারাই যাদের বেঁচে থাকাটা অন্য কেউ চায়। যাদের ভালবাসার লোক আছে।” | সাঁতারু ও জলকন্যা |
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেমের উক্তি কোনটি?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেমের উক্তি হলো “আমি যে তাকে ভালবাসি তা ওঁর রূপের জন্যও নয়, গুণের জন্যও নয়। ভাল না বেসে থাকতে পারি না বলে বাসি” (‘গয়নার বাক্স’ উপন্যাস থেকে)।
২: ‘গয়নার বাক্স’ উপন্যাসের প্রেমের উক্তিটি কেন এত বিখ্যাত?
এই উক্তিটি ভালোবাসার অকারণতাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। শীর্ষেন্দু এখানে প্রেমিকার রূপ বা গুণের জন্য নয়, বরং ‘ভাল না বেসে থাকতে পারি না’ বলে ভালোবাসার সংজ্ঞা দিয়েছেন, যা যুক্তির ঊর্ধ্বে।
৩: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রেম ও বিয়ে নিয়ে কী বলেছেন?
তিনি প্রেম ও বিয়ের মধ্যে গভীয় পার্থক্য দেখিয়েছেন। তাঁর একটি উক্তি— “প্রেম জিনিসটা কম দামী সেন্টের মতো, গন্ধ টপ করে উবে যায়। প্রেমের সমাধির উপরেই তো বিয়ের সৌধ”। এছাড়া তিনি বলেছেন, “বাঙালিদের প্রেম হল সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার আর বিয়ে হল মস্ত কীর্তি”।
৪: শীর্ষেন্দুর কোন বইয়ে প্রেমের গল্পের সংকলন আছে?
শীর্ষেন্দুর প্রেমের গল্পের সংকলনের মধ্যে ‘৫০টি প্রেমের গল্প’ উল্লেখযোগ্য, যা গুগল প্লে বুকস-এ ৪.৫ রেটিং পেয়েছে। এছাড়া ‘ভালোবাসা’ নামেও একটি বই রয়েছে।
৫: ‘মানবজমিন’ উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য প্রেমের উক্তি কোনটি?
‘মানবজমিন’ উপন্যাসের সবচেয়ে আলোচিত উক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে— “যে জীবন তাঁর নয়, যে জীবন তাঁর কখনো হবে না তাকে সিংহাসনে বসিয়ে মানুষ মাঝে মাঝে এরকম ধূলায় পরে কাঁদে” এবং “একদিন কি পাহাড় ডাকবে না তাকে?”।
৬: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে কী উক্তি করেছেন?
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিখ্যাত উক্তি— “বোধ হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রবলেম হল অহংকারের লড়াই”। এছাড়া তিনি লিখেছেন, “কোন কোন স্বামী-স্ত্রী বোধহয় তাদের সম্পর্কের বিষকেই বেশী উপভোগ করে। মধুর কথা তারা কানে নেবে না”।
উপসংহার: শীর্ষেন্দুর ভালোবাসা—অলংকারহীন এক নির্মোহ সত্য
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রেমের উক্তিগুলো চিকন রোমান্টিকতার চেয়ে বরং নির্মোহ বাস্তবতার কাছে বেশি সত্য। তিনি ভালোবাসার অন্ধত্ব দেখেন, আবার তার কর্মময় রূপও দেখেন। তিনি প্রেমের চিরন্তন থাকার দাবি করেন না, বরং বলেন প্রেম ক্ষয়ে যায়, ম্লান হয়, কখনো উবে যায় কম দামি সেন্টের মতো। কিন্তু সেই ক্ষয়ের ভেতরেই তিনি খুঁজে পান আরেক সত্য—ভালোবাসা না থাকলে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই কমে যায় মানুষের।
তার ‘গয়নার বাক্স’-এর অমর লাইনগুলো, ‘মানবজমিন’-এর দীপনাথের প্রশ্ন, ‘যাও পাখি’-র অন্তর্যামীর সংলাপ—এসব বাংলা সাহিত্যের অমূল্য রত্ন।
তাঁর কথায়—ভালোবাসা নেই বলেই ভালোবাসার কথা এত শোনা যায়। কিন্তু এই শোনা উক্তিগুলোর ভেতর দিয়েই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন; বেঁচে থাকবেন তাঁর লেখা ভালোবাসার প্রতিটি অক্ষরে, প্রতিটি চরিত্রের শ্বাস-প্রশ্বাসে। ভালোবাসার যে সংজ্ঞা তিনি লিখে গেলেন, তা হয়তো আর কখনও কেউ লিখতে পারবেন না। কারণ ভালোবাসার অকারণ সত্যিটা বলা যায়, কিন্তু বারবার বলা যায় না।


