( লেখাটি পড়তে প্রায় 9 মিনিট সময় লাগতে পারে )

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ তালিকা: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কিশোর রহস্যের অমর সৃষ্টি

সূচি

বাংলা কিশোর সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব সংযোজন

বাংলা সাহিত্যে কিশোরদের জন্য লেখা রহস্য-রোমাঞ্চের ধারাটি চিরকাল সমৃদ্ধ। সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাকাবাবু’—প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বাদ ও আবেদন রয়েছে। কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’ এই ধারায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। যেমন এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, “অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো পড়লে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রহস্যের পাশাপাশি হাস্যরস আর অ্যাডভেঞ্চারের অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছে এতে”

সিরিজটির নামকরণ ‘অদ্ভুতুড়ে’ শব্দটি দিয়েই বোঝা যায় এর বৈশিষ্ট্য। শুধু ভূত নয়, ভয় নয়—এখানে আছে ‘অদ্ভুত’-এর সঙ্গে ‘অতিপ্রাকৃত’-এর এক চমৎকার মিশেল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্ট এই সিরিজটি শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বড়রাও পড়তে পারেন এই বইগুলো গল্পের মজা ও পাঠের স্বাচ্ছন্দ্যে।

এই নিবন্ধে আমরা অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সমগ্র তালিকা, উপন্যাসগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, সিরিজের জনপ্রিয়তার কারণ এবং পাঠকদের জন্য পড়ার গাইড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়: সিরিজের স্রষ্টা

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের জনক হলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (জন্ম: ২ নভেম্বর, ১৯৩৫), যিনি বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি নাম। ‘মানবজমিন’, ‘পারাপার’, ‘যাও পাখি’র মতো প্রাপ্তবয়স্কদের কালজয়ী উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি কিশোর সাহিত্যেও সমান পারদর্শী

শীর্ষেন্দু তাঁর সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন, “কিশোর সাহিত্যের ধারাটা আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে বলে এতগুলো বই লিখেছি। এই ধরনের লেখা কেউ কম লিখেছেন। সেটার জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৌশল হল একই চরিত্র বারবার এনে নতুন কাহিনি লেখা।” এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় অদ্ভুতুড়ে সিরিজ।

সিরিজটির প্রথম বই ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় এবং তখন থেকেই এটি বাংলার কিশোর সাহিত্যে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বৈশিষ্ট্য

সিরিজটিকে অন্যান্য কিশোর সাহিত্য থেকে আলাদা করে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

১. হাস্যরস ও রহস্যের অনন্য মিশ্রণ

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের গল্পগুলো যেমন রহস্যময়, তেমনি হাস্যরসে ভরপুর। এক পাঠকের ভাষায়, “প্রতিটি গল্পের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার ও হাস্যরস মিশে আছে। পুরো উপন্যাস জুড়ে গলার আওয়াজ বের হবে, মুখে হাসি থাকবে” । কোনো গল্পে আবার বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ছোঁয়াও রয়েছে।

২. চিরচেনা বাঙালি প্রেক্ষাপট

এই সিরিজের গল্পগুলোর পটভূমি মূলত বাংলার ছোট শহর ও গ্রাম। চরিত্রগুলো এমন নয় যে দূর কোন অজানা দেশে ঘুরে বেড়ায়—বরং এরা আমাদেরই চারপাশের মানুষ। এই আবহ ও চরিত্রায়ন পাঠককে সহজেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে। যেমন Goodreads-এ বর্ণিত হয়েছে, এই বইগুলোতে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের কাহিনি স্থান পেয়েছে

৩. চমৎকার চরিত্র সৃষ্টি

সিরিজটির বিশেষত্ব হলো প্রতিটি গল্পেই নতুন চরিত্রের আবির্ভাব। শীর্ষেন্দু একই চরিত্রের পুনরাবৃত্তি না করে প্রতিটি কাহিনিতে নতুন মুখ এনেছেন, যা সিরিজটিকে কখনও একঘেয়ে হতে দেয়নি।

৪. কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী ভাষা

শীর্ষেন্দুর গদ্য এতটাই সরল ও সহজ যে কোনো বয়সের পাঠক সহজেই তা পড়তে পারেন। তবে অন্যান্য কিশোর উপন্যাসের চেয়ে এখানে ভাষার গভীরতা একটু বেশি। “এতে বড়োদেরও পড়তে মজা লাগবে,” বলেছেন এক পাঠক

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সম্পূর্ণ তালিকা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই জনপ্রিয় সিরিজে মোট ৫১টি উপন্যাস রয়েছে । নিচে সেগুলোর কালানুক্রমিক তালিকা ও প্রতিটি উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনি দেওয়া হলো:

ক্রমিকউপন্যাসের নামকাহিনি সংক্ষেপ
মনোজদের অদ্ভুত বাড়িমনোজদের বাড়িতে অনেক লোকজন, আর তাদের প্রত্যেকেরই নানা অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে গল্প। সিরিজের সূচনা করে এই উপন্যাসটি কিশোর-কিশোরীদের মুখে মুখে ফিরেছিল।
খেয়ালী স্যারবার্ষিক পরীক্ষায় অঙ্কে বুরুন মাত্র তেরো পেলো। রাশেদ স্যার তার পড়ানোর ধরন বদলে ফেললেন। এ নিয়ে অদ্ভুত সব ঘটনার সূত্রপাত।
নদীর নাম ছায়ামাধববাবুর পিতৃ-পিতামহের বিরাট সম্পত্তি সরস্বতী নদীর গর্ভে বিলীন। সেই নদীর নাম ‘ছায়া’। তার সঙ্গে রহস্যের কী সম্পর্ক?
বাড়ি থেকে বিদায়কারো সাতে-পাঁচে না থাকা নিপাট ভদ্রলোক গয়েশবাবু হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে অদৃশ্য! কেন? কী ঘটনা?
বক্সার রতনবক্সার রতনের মা মারা গেছেন, বাবা পাগল। বক্সিং করে সে টাকা উপার্জন করে। কিন্তু তার জীবনে হঠাৎ দেখা দেয় অদ্ভুতুড়ে এক রহস্য।
পাগলাদেবীহারানবাবুর প্রায়ই ঘড়ি হারিয়ে যান, আবার ঘড়ি চুরি হওয়ার পর তিনি নিজেই একজন তদন্তকারীর ভূমিকা নেন।
আঁধিয়ার পাহাড়দাদার সংসারে অনাদরে থাকে গৌরগোপাল আর তার মা। মা একদিন গভীর অরণ্যে হারিয়ে যান। তাকে খুঁজতে গিয়ে গৌরগোপালের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘আঁধিয়ার পাহাড়’ নামক এক অদ্ভুত জায়গা।
সুদূর ঝর্ণার জলরতনলাল বাঁড়ুজ্যে সৎ ও রাশভারী মানুষ বলে সবাই ভয় পায়। কিন্তু তার শাসনে গ্রামের ছেলেরা অতিষ্ঠ। তখন বাঁড়ুজ্যের বাড়ির পেছনের দিকে এক ঝরনার সন্ধান পেল তারা। সেই ঝরনা কিন্তু সাধারণ নয়।
কৃষ্ণবিবরপড়াশোনায় হরিবন্ধুর মন ছিল না মোটেও। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় সে চমকে দেওয়ার মতো কিছু আবিষ্কার করেছিল। সেই আবিষ্কারের পেছনের কাহিনি।
১০লাল নীল দরজানামজাদা উকিল উদ্ধববাবুর সব ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় বেশ ভালো। কিন্তু বড় ছেলে বিদ্যুৎ আলাদা। সে রং নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালোবাসে। তার সেই পরীক্ষা নিয়ে অদ্ভুত কাহিনি।
১১পেয়ারু বানুর ভূতসুন্দরবনের পাশেই ছোটখাট গ্রাম কেটেরহাটে থাকেন সদাশিব। মাত্র ক্লাস এইটে পড়া সদাশিবের বাবার বাগানে আছে অদ্ভুত সব ফল। পেয়ারু বানু নামের এক মহিলাকে দেখতে পায় সদাশিব আর তার বন্ধুরা। সেই থেকে শুরু।
১২জলে যায় যার বাড়িজয়পতাকাবাবু ভজুরাম মেমোরিয়াল স্কুলের নামকরা অঙ্কের শিক্ষক। কিন্তু তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির সঙ্গে এক অদ্ভুত রহস্য জড়িত আছে। যখন তলিয়ে যায় এই নদী—দেখা যায় এক প্রাচীন পুরকীর্তির ধ্বংসাবশেষ।
১৩শিশুরাও বড়ো হতে পারেপ্রয়াত বিজ্ঞানী শিবু হালদারের পড়ে থাকা ল্যাবরেটরিতে ঢুকে তন্নতন্ন করে ঘাঁটলে মিলবে কিছু অদ্ভুত অস্ত্র আর তার ব্যবহারবিধি। সেগুলি কিসের কাজে লাগে জানলে চমকে উঠবেন আপনিও।
১৪জাপানি বন্ধুএকজন জাপানি লোকের আগমনে চাঞ্চল্য ছড়ায় এলাকায়। কোনো সাধারণ মানুষ নন তিনি—তাঁর পিছনে রয়েছে এক অপার সত্য, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একের পর এক রহস্য।
১৫পটাশগড়ের জঙ্গলেসকালের আপ ট্রেন থেকে একটা লোক লটবহর নিয়ে হুড়মুড় করে নামে পটাশগড় স্টেশনে। এই লোকটির আগমনে বদলে যায় সব। গল্পের নায়ক তিলকদা তার বন্ধুদের নিয়ে জঙ্গলে যাত্রা করে আবিষ্কার করে অজানা রোমাঞ্চ।
১৬বাইশে ফেব্রুয়ারিপেশকার গগন সাঁপুইয়ের বাড়িতে মাঝরাতে এক চোর ধরা পড়ে। বিচারে তার ফাঁসি হয়। চোর ফাঁসির কথা ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তিনি সময়ের আগেই ফাঁসি চেয়ে বসেন। কেন? সেখানে কী লুকিয়ে ছিল?
১৭পণ্ডিতমশায়ের পুত্রযুবা বয়সে বক্সার হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন বাবু মিত্তির। তার পুত্র নবকুমার কিন্তু একেবারেই নরম মানুষ। বাবা-ছেলের ভাবগতিক এতটাই ভিন্ন যে গ্রামের মানুষ অবাক হয়। কিন্তু নবকুমারের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অন্য রহস্য।
১৮ভূতের বাড়িনবীগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক দূরে রেলস্টেশন। এক রাতে সেই স্টেশনে নেমে ভূতের বাড়ি খুঁজতে বেরোলে মিলবে কী? গল্পটা এক কথায়—তিন রোমাঞ্চকর।
১৯হাত নেই যারশশীদাদুর কাছে একটা অদ্ভুত হাত আছে। কেবল হাতই, শরীর নেই! কেমন করে পেলেন এই হাত? এই হাতের কী ক্ষমতা? এর পেছনে রহস্য জানলে পাঠকের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়।
২০গোয়েন্দা বরদাঅদ্ভুতুড়ে সিরিজের সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস এটি। বরদা নামের একটি চরিত্র গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে নানা অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয়। উপন্যাসের চরিত্রগুলো ও ঘটনাপ্রবাহ পাঠককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আগ্রহী রাখবে।
২১পারুল বালা ও অমৃত বাবুমিলিটারি থেকে অল্পবয়সে রিটায়ার করে সুবুদ্ধি রায় নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামের বহু পুরোনো বাড়িতে ওঠার পর ঘটতে থাকে নানা অঘটন। এই অঘটনের সঙ্গী পারুল বালা ও অমৃত বাবু নামের দুই অদ্ভুত চরিত্র।
২২মধু দিয়ে ভরা পাহাড়হরিপুর গাঁয়ে একটা সময়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বাস করত। সেখানে মধু দিয়ে ভরা এক পাহাড় ছিল বলে প্রচলিত কল্পকাহিনি। বাস্তবে কি সত্যিই পাহাড়ের গায়ে মধু ঝরত? জানতে হলে পড়তে হবে এই উপন্যাস।
২৩মঙ্গলদীপে ফেরাকিংবদন্তি আছে, অনেককাল আগে প্রতাপরাজা বিশাল এক পুকুর কাটিয়েছিলেন। তারপর কিছুদিন সেখানে এক অলৌকিক বাতি জ্বলত। স্থানীয়রা সেই বাতিকে ‘মঙ্গলদীপ’ বলে ডাকত। সেই মঙ্গলদীপের সন্ধানে পাড়ি দিতে হবে দূর গহীন অরণ্যে।
২৪ভুতুড়ে রেললাইনবিপিনবাবু বেজায় কৃপণ মানুষ। অর্থসমাগমে যত খুশি উৎসাহ, খরচ নিয়ে তার মাথাব্যথা। তার এহেন মনোভাব নিয়ে গল্প যেমন হাস্যকর, তেমনই রোমাঞ্চকর। এক পরিত্যক্ত রেললাইনে ঘুরতে গিয়ে সে দেখতে পায় সেখানে ভুতুড়ে ট্রেন ছুটছে!
২৫দেবীগঞ্জের দেবীনবাবগঞ্জে হঠাৎ কিছু নতুন মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। তারা দেবীগঞ্জে এক প্রাচীন মন্দিরে পূজার আয়োজন করল। তাদের পূজার ধরন দেখে স্থানীয় জমিদার সন্দেহ করলেন যে তারা আসলে দেবীগঞ্জের অমূল্য মূর্তি চুরি করতে চাইছে।
২৬গণকবরসুদূর দোগেছে গাঁয়ে থাকা পিসির কাছ থেকে নেমন্তন্ন এসেছে। সেই গাঁতে গিয়ে নায়ক দেখল শ্মশানের কাছে এক গণকবর আছে। পিসিমার কথায় জানা যায়, এই শ্মশানে কোনো পূর্ণিমার রাতে নাকি নকল মুখোশ পরা মানুষের দেখা মেলে!
২৭বিজন দ্বীপের খাজাঞ্চিকিংবদন্তি বলে, দুশো বছর আগে পরাক্রমশালী রাজা মঙ্গলসিংহ তাঁর অগাধ সম্পত্তি কোন বিজন দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেই সম্পত্তি উদ্ধারে নেমে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের সাক্ষী থাকবে পাঠক।
২৮ছ’দিকে ছ’টি মোরঝিকরগাছার হাট পুরো তল্লাটে বিখ্যাত। সুস্বাদু খাবারের পাশাপাশি সেখানে দেখা মেলে আজিব এক জনতার। গল্পের নায়ক সেখানে গিয়ে হঠাৎ নিজেকে আরও পাঁচ জায়গায় একসঙ্গে দেখতে পায়। কীভাবে সম্ভব এটা?
২৯মৃত্যুগ্রস্তরাঘব চৌধুরী বড়লোক হলে কী হয়, ভারী খামখেয়ালি মানুষ। তাঁর বড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নেশা। একদিন তিনি ‘মৃত্যুগ্রস্ত’ নামের একটা অদ্ভুত প্রাচীন গাছের বীজ আবিষ্কার করলেন। সেই গাছ দিয়ে তৈরি ফুলের ঘ্রাণে কেউ পড়লে ঘোরের মধ্যে অমর হয়ে যেত?
৩১গণেশ মস্তিষ্কব্যবসার কাজ সেরে অনেকগুলো টাকা সঙ্গে করে নবীন রওনা দিল নিজের শহরের পথে। পথিমধ্যে অজানা এক গ্রামে গাড়ি থামতেই তার সঙ্গে দেখা এক রহস্যময় পথিকের। সেই পথিক তাকে এক গণেশের মস্তিষ্কের আংটি উপহার দেয়। কিন্তু সেই আংটির কী ক্ষমতা?
৩২ছদ্মবেশী মানুষদর্শনের অধ্যাপক প্রাণগোবিন্দবাবু নিতান্ত আলাভোলা মানুষ। তাঁর এক অদ্ভুত কাণ্ডের জেরে তাঁকে নিয়ে তৈরি হল ব্যঙ্গরসাত্মক ঘটনাবলি। গল্পের চমকটা ধরা আছে এক ‘ছদ্মবেশী মানুষ’-এর সন্ধানে।
৩৩ভূতুরে বাঁশিকাশীরাম ভীতু নরমসরম মানুষ, যদিও তাঁর বাবা নসিরাম ছিলেন গোটা অঞ্চলের নামকরা বক্সার। কাশীরামের বাজে অবস্থা দেখে এক সন্ন্যাসী তাকে একটি অদ্ভুত বাঁশি দিয়ে গেলেন। সেই বাঁশি বাজালেই চারদিক থেকে জটলা করতে থাকে অদ্ভুত সব প্রাণী।
৩৪নষ্ট নীলমণিবিভিন্ন কারবার করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে নদীর ধারে এলেকা গিয়ে বাসা বাঁধলেন তিন বন্ধু—শেষে পরিণত হলেন পুরোনো দ্রব্য জোগাড়কারীতে। একটি জরাজীর্ণ বাড়িতে ঢোকার পর তাদের জীবন বদলে গেল। সেখানে তারা পেল এক ‘নষ্ট নীলমণি’।
৩৫নয়লেখকগদাইয়ের কারবার সাপের বিষ আর জড়িবুটি নিয়ে। তাতে বেশ সচ্ছল আয় হয়। একদিন হঠাৎ তার কাছে আসে ‘নয়লেখক’ নামের এক অদ্ভুত চিঠি। সেই চিঠিতেই লুকিয়ে আছে এক রহস্য।
৩৬শুখো পায়রার গল্পমদনপুরের হাটে এক গুণী চোরের দেখা পেল গুরুপদ। অনেক সাধ্যসাধনা শেষে সেই চোর অদ্ভুত এক মন্ত্র বলে দিল। সেই মন্ত্রের জোরে চোখের সামনে লুকিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে বের করতে পারে যে কেউ!
৩৭বৃহস্পতির গ্রহলোকবটুকবুড়োর চশমাটা ব্যবহার করতেন অঘোরখুড়ো। সেইটে আবার ভেঙে ফেলল মাসুদ। ভাঙা চশমা জোড়া লাগাতে গিয়ে সে ‘বৃহস্পতির গ্রহলোক’ কী করে, তা জেনে গেল!
৩৮ময়নাগড়ের রহস্যনিরিবিলি ছোট্ট গঞ্জ শহর ময়নাগড়। হঠাৎ ময়নাগড়ে নেমে এল ‘অদ্ভুতুড়ে’ এক ঘটনা। দেখা গেল ঐশ্বরিক শক্তির আবির্ভাব! সেটা প্রকৃতই ঐশ্বরিক নাকি অন্য কিছু?
৩৯নবীন মাধবগঞ্জেমাধবগঞ্জের নবীনের ভাগ্য হঠাৎ খুলে গেল। তার চেহারায় এত তেজ, এত মেজাজ—আগে দেখা যায়নি। এই নবীনই ধরে ফেলল মাধবগঞ্জের চোর-চক্রান্তকে। তার এই অদ্ভুত পরিবর্তনের কারণ কী?
৪৮কোথায় পাব তাকেলোকটাকে আগে কেউ দেখেনি হিরণগড়ে। স্মৃতিভ্রষ্ট সেই লোকটিকে পাহারা দিচ্ছিল দুই বেয়ারা। রাতে পালিয়ে এসে সে আশ্রয় নেয় এক সঙ্গীতশিল্পীর বাড়িতে। তাকে নিয়ে রহস্যের অন্ত নেই।
৪৯ঘূর্ণিপাকে ঘরবাড়িভারী শীতকাতুরে মানুষ আশুবাবু। থাকেন ফকিরগঞ্জে। ভারি শীতে আশুবাবু এক পথিককে আশ্রয় দিলেন। সেই পথিক তার শীত-কাতুরে ভাব দেখে তাকে শীতনাশক এক অদ্ভুত পাথরের কথা বলে।
৫০এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালাসে ফেরি করে আশ্চর্য সব বস্তু। গন্ধের হুইসল, রশ্মি পোশাক আরও কত কী। তার কাছ থেকে কেনা ‘গোটা পিঠে গোটা মাথা’র গল্পটা রীতিমতো অদ্ভুতুড়ে। এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে।
৫১স্বপ্নের সিঁড়িএ কাহিনি কল্পবিজ্ঞান না অদ্ভুতুড়ে রোমাঞ্চকর, সেই নিয়ে দ্বিধায় পড়তে পারেন পাঠক। অথচ হচ্ছে এটা—স্বপ্নের জগতে দিয়ে নিঃশব্দে আমাদের চেনা জগতে হানা দিয়েছে এক অজানা মানুষ। নিজের স্বপ্নের ভেতর দিয়েই তাকে খুঁজতে বেরোল নায়ক।

সতর্কতা: Goodreads-এর তালিকা অনুযায়ী ৫১টি বইয়ের মধ্যে ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭ নম্বর বইয়ের তথ্য উক্ত সূত্রে পাওয়া যায়নি

সিরিজের জনপ্রিয় উপন্যাসসমূহ

যদিও অদ্ভুতুড়ে সিরিজের প্রতিটি উপন্যাসেরই নিজস্ব স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, কিছু উপন্যাস বিশেষভাবে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে:

১. মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি (প্রথম উপন্যাস)

সিরিজের প্রথম বই হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই উপন্যাসটির মাধ্যমেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কিশোর সাহিত্যে তাঁর নতুন ধারার সূচনা করেন। উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকেই তুমুল জনপ্রিয়তা পায় এবং এর জন্য তিনি বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫) লাভ করেন

২. বক্সার রতন

সিরিজের একটি অসাধারণ থ্রিলার। বক্সার রতনের মায়ের মৃত্যু, পিতার পাগলামি, আর নিজের সংগ্রামের কাহিনি পাঠককে দারুণভাবে ভাবায়। এই গল্পটি নিয়ে এক পর্যালোচক লিখেছেন, “বক্সার রতন বইটি চমৎকার থ্রিলার”

৩. গোয়েন্দা বরদা

সিরিজের সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস এটি। বরদা নামের গোয়েন্দা চরিত্রের অ্যাডভেঞ্চার এতটাই চমকপ্রদ যে পাঠক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আগ্রহী থাকেন

৪. এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা (২০২২)

সিরিজের সর্বশেষ উপন্যাস। ২০২২ সালে প্রকাশিত এই বইটি প্রমাণ করে যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আজও সমান সক্রিয়। গল্পে আছে গন্ধের হুইসল, রশ্মি পোশাকসহ আশ্চর্য সব বস্তু নিয়ে এক ফেরিওয়ালার কাহিনি

সিরিজটি কেন অনন্য?

১. কিশোর সাহিত্যে ‘ভিন্ন ধারা’

অনেক সমালোচক মনে করেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজ বাংলা কিশোর সাহিত্যের ধারাটাকেই পাল্টে দিয়েছে। তিনি এখানে গড়ে তুলেছেন এক ‘অদ্ভুতুড়ে’ জগৎ—যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমানা অস্পষ্ট

২. ব্যতিক্রমী বর্ণনাভঙ্গি

সিরিজের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো শীর্ষেন্দুর বর্ণনাভঙ্গি। তিনি গল্প বলতে যান ‘তৃতীয় ব্যক্তির’ জায়গা থেকে নয়; বরং গল্পের চরিত্রদের ভেতর দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন সবকিছু। এটি এক ধরনের পরাবাস্তব স্বাদ তৈরি করে, যা শীর্ষেন্দু-সুলভ।

গল্পগুলো এত সরস যে পড়তে গিয়ে পাঠকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জোগাড়। এক পর্যালোচকের বক্তব্য: “পুরো উপন্যাস জুড়ে গলার আওয়াজ বের হবে, মুখে হাসি থাকবে”

৩. কেবল ভূত নয়, অদ্ভুতের জয়গান

সিরিজের নাম ‘অদ্ভুতুড়ে’ থেকেই বোঝা যায়, এখানে রয়েছে শুধু ‘ভূত’-এর উপাখ্যান নয়; আছে ‘অদ্ভুত’ সব কাণ্ডকারখানা। যেমন ‘হাত নেই যার’ গল্পে শুধু একটা হাত ভেসে বেড়ায়—নেই কোনো মাথা, নেই কোনো শরীর । আবার ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’য় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ছোঁয়া । এই বৈচিত্র্যই সিরিজটিকে একঘেয়েমি থেকে দূরে রেখেছে।

সিরিজ পড়ার গাইড: কোথা থেকে শুরু করবেন

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ শুরু করতে চাইলে কোন বইটি প্রথমে পড়বেন? নিচে কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া হলো:

নতুন পাঠকদের জন্য প্রস্তাবিত:

১. ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ – সিরিজের প্রথম বই হিসেবে এটি শুরু করার সেরা জায়গা। এখান থেকেই পুরো সিরিজের ‘স্বাদ’ পান।

২. ‘বক্সার রতন’ – যারা থ্রিলার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ।

৩. ‘হাত নেই যার’ – স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই বইটি সিরিজের বৈচিত্র্য বোঝার জন্য ভালো।

সিরিজের মূল্যায়ন:

বিভিন্ন পর্যালোচনার ভিত্তিতে Goodreads-এ সিরিজটির রেটিং গড়ে ৪.২ থেকে ৪.৫-এর মধ্যে, যা বেশ উঁচু

সিরিজটি কেন পড়বেন?

১. কিশোর বয়সীদের জন্য আদর্শ সঙ্গী
২. বড়রাও পড়তে পারেন একঘেয়েমি কাটাতে
৩. বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুধাবনের সুযোগ
৪. শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি চমৎকার মাধ্যম

উপসংহার: অদ্ভুতুড়ে জগতের অময় যাত্রা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘অদ্ভুতুড়ে সিরিজ’ বাংলা কিশোর সাহিত্যের এমন এক অমূল্য সংযোজন যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে আজও সমান তরতাজা। ১৯৭৮ সালে ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজও চলমান; ২০২২ সালে ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’ প্রকাশের মাধ্যমে শীর্ষেন্দু প্রমাণ করেছেন যে বয়স তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে আটকে রাখতে পারেনি।

এই সিরিজকে শুধু ‘ভূতের গল্পের সংকলন’ বলা যায় না। বরং এ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার দরজা—যেখানে হাসি আর রোমাঞ্চ সমান তালে মেলবন্ধন করে। প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্য থেকে শুরু করে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, গোয়েন্দা গল্প থেকে সামাজিক উপাখ্যান—প্রত্যেকটি উপন্যাস যেন এক একটি নতুন দেশ।

যারা এখনও এই সিরিজের স্বাদ নেননি, তাঁদের জন্য এটুকু বলার অপেক্ষা রাখে—শুরু করুন ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ দিয়ে। নিশ্চয়ই পরবর্তী ৫০টি বই শেষ করতে আগ্রহ তৈরি হবে। কারণ শীর্ষেন্দুর প্রতিটি রচনা যেন একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—‘আরেকটা পড়বে না?’

হ্যাঁ, পড়ব। আরো পড়ব। কারণ এই ‘অদ্ভুতুড়ে’ জগৎ ছাড়ার মতো জায়গা কোথাও নেই।

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: অদ্ভুতুড়ে সিরিজের মোট কয়টি উপন্যাস আছে?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজে মোট ৫১টি উপন্যাস রয়েছে । তবে ৪০ থেকে ৪৭ নম্বর উপন্যাসের তথ্য Goodreads-এ পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতে আরও নতুন সংযোজন আসতে পারে।

অদ্ভুতুড়ে সিরিজের প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, যা ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় । এই উপন্যাসটির জন্য শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৮৫ সালে বিদ্যাসাগর পুরস্কার লাভ করেন।

ই সিরিজের স্রষ্টা হলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তিনি ‘মানবজমিন’, ‘পারাপার’ উপন্যাসের জন্যও সমানভাবে বিখ্যাত।

‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ‘বক্সার রতন’ ও ‘গোয়েন্দা বরদা’ বিশেষ জনপ্রিয়। ‘বক্সার রতন’ একটি চমৎকার থ্রিলার এবং ‘গোয়েন্দা বরদা’ সিরিজের সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস

‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ উপন্যাস নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বেশ কয়েকটি গল্প টেলিভিশন ধারাবাহিক ও নাটকে রূপ পেয়েছে।

ই সিরিজটি মূলত কিশোর-কিশোরীদের জন্য লেখা হলেও বড়রাও সহজেই পড়তে পারেন। একজন পাঠকের মতে, “এতে বড়োদেরও পড়তে মজা লাগবে” । সহজ ও সাবলীল ভাষার জন্য এটি সর্ববয়সী পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্য।

সিরিজের সর্বশেষ উপন্যাস ‘এক আশ্চর্য ফেরিওয়ালা’, যা ২০২২ সালে প্রকাশিত হয় । ২০২৪ সাল পর্যন্ত এটি সিরিজের সর্বশেষ সংযোজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে