( লেখাটি পড়তে প্রায় 8 মিনিট সময় লাগতে পারে )

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী: বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পীর অমর কাহিনি

সূচি

বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পী

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন, যাঁদের সৃষ্টি কালের বাধা উপেক্ষা করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকহৃদয়ে বাস করে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ উপাধিতে ভূষিত এই লেখক দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক পঠিত ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে বিবেচিত হন

বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সমাজের অবহেলিত নিম্নবর্গ, ব্রাত্যজনের কথা সাহিত্যে স্থান দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন, বৈষম্য, কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তাঁর সহজ, প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষা সাধারণ বাঙালিকে বই পড়ার আস্বাদ দিয়েছিল।

‘দেবদাস’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘পরিণীতা’, ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবী’—এসব উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অমূল্য রত্ন। আজও তাঁর রচনা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, গবেষণা হয়, পাঠক হৃদয় ছোঁয়

এই নিবন্ধে আমরা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শৈশব, শিক্ষাজীবন, বার্মা প্রবাস, সাহিত্যযাত্রা, ব্যক্তিজীবন ও পুরস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী
শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, সামতাবেড়, হাওড়া, ছবি: উইকিপিডিয়া

জন্ম ও শৈশব: দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা

দেবানন্দপুরের মাটিতে শিকড়

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২৮৩ সালের ৩১শে ভাদ্র) ব্রিটিশ ভারতের হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দেবানন্দপুর ব্যান্ডেল রেল স্টেশন থেকে প্রায় দুই মাইল উত্তর-পশ্চিমে সরস্বতী নদীর ধারে অবস্থিত

পিতৃপুরুষের নিবাস ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাঁচড়াপাড়ার নিকট মামুদপুরে। দেবানন্দপুর প্রকৃতপক্ষে ছিল তাঁর পিতার নিবাস

পিতা-মাতা ও ভাইবোন

পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। পিতা মতিলাল এন্ট্রান্স পাস করে কিছুদিন এফ.এ. পড়েছিলেন। তিনি অস্থিরচিত্ত, ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। অল্প কিছুদিন চাকরি করা ছাড়া আর কখনও কিছুই করেননি। গল্প-উপন্যাসও লিখতেন, কিন্তু অস্থিরচিত্ততার কারণে কোন লেখা সম্পূর্ণ করতেন না

শরৎচন্দ্রের ডাকনাম ছিল ‘ন্যাঁড়া’। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর দিদি অনিলা দেবী ছাড়াও প্রভাসচন্দ্র ও প্রকাশচন্দ্র নামে দুই ছোটভাই ও সুশীলা দেবী নামে এক ছোটবোন ছিল

শৈশব কেটেছে ভাগলপুরে

দারিদ্র্যের কারণে মতিলাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। মাতামহ কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন ভাগলপুরের কালেক্টারি অফিসের কেরানি। তাই শরৎচন্দ্রের শৈশবের অধিকাংশ সময়ই কেটেছিল ভাগলপুরের মামাবাড়িতে

শরৎচন্দ্রের মাতামহের ছোট ভাই অঘোরনাথ ও তাঁর পুত্রেরা শরৎচন্দ্রের পড়াশোনার খরচ জোগাতেন

শিক্ষাজীবন: অসমাপ্ত অধ্যায়

পাঠশালা থেকে জেলা স্কুল

শরৎচন্দ্রের পাঁচ বছর বয়সে পিতা তাঁকে দেবানন্দপুরের প্যারী পণ্ডিতের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন। সেখানে দু-তিন বছর পড়ার পর স্থানীয় সিদ্ধেশ্বর ভট্টাচার্যের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে ভর্তি হন

একসময় ভাগলপুরে চলে এলে মাতামহ তাঁকে ভাগলপুরের দুর্গাচরণ বালক বিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তিতে ভর্তি করে দেন। ছাত্রবৃত্তি পাস করে ১৮৮৭ সালে শরৎচন্দ্র ভাগলপুর জেলা স্কুলে সেভেন্থ ক্লাসে ভর্তি হন

অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর

ছাত্রবৃত্তিতে ইংরেজি পড়ানো হত না। কিন্তু জেলা স্কুলের সেভেন্থ ক্লাসে ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয়ে তিনি এত ভাল নম্বর পেয়েছিলেন যে শিক্ষকরা তাঁকে ডাবল প্রমোশন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ ১৮৮৭ সালে সেভেন্থ ক্লাস থেকে একেবারে ফিফ্থ ক্লাসে উঠেছিলেন। এটি তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় দেয়।

দারিদ্র্যে অসমাপ্ত শিক্ষা

১৮৮৯ সালে পিতার চাকরি চলে গেলে তিনি পরিবার নিয়ে দেবানন্দপুরে ফিরে আসেন। শরৎচন্দ্র তখন হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৯২ সালে ফার্স্ট ক্লাসে পড়ার সময় পিতা স্কুলের বেতন দিতে অসমর্থ হলে শরৎচন্দ্র পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হন

১৮৯৩ সালে পরিবার পুনরায় ভাগলপুরে ফিরে গেলে পড়ার আগ্রহ দেখে প্রতিবেশী সাহিত্যিক ও শিক্ষক পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। এই স্কুল থেকে ১৮৯৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন

তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে এফএ ক্লাসে ভর্তি হলেও অর্থের অভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি। দারিদ্র্যের কারণেই তাঁর উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যায়

বার্মা প্রবাস: জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

পলাতক যুবক থেকে বার্মা যাত্রা

কলেজ ছেড়ে দেওয়ার পর শরৎচন্দ্র ভাগলপুরের আদমপুর ক্লাবে খেলাধুলা ও অভিনয়ে সময় কাটাতে থাকেন। একসময় কোনো কারণে পিতার ওপর অভিমান করে তিনি সন্ন্যাসী সেজে ঘর ছেড়ে চলে যান। সে সময় তাঁর পিতার মৃত্যু হলে ফিরে এসে শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেন

কিছুদিন কলকাতায় কাটানোর পর ১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি রেঙ্গুনে (অধুনা মায়ানমারের ইয়াঙ্গুন) চলে যান। সেখানে তাঁর মেসোমশাই অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন

কোয়ারান্টিনের সাত দিন

নৌকায় করে বার্মা যাওয়ার সময় শরৎচন্দ্রের যে জাহাজ ছিল, সেটি রেঙ্গুনের বন্দরে কোয়ারান্টিনে আটকে পড়ে। তখন রেঙ্গুন শহরে প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে তাঁকেও জঙ্গলঘেরা এক জায়গায় নয় দিনের বদলে সাত দিন থাকতে হয়। মেসোমশাই পরে তাঁকে বলেছিলেন, “তুই আমার নাম করতে পারলি না?”

চাকরি ও ঘোরাঘুরি

অঘোরনাথের চেষ্টায় তিনি বার্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে অস্থায়ী চাকরি পান। দুই বছর পর চাকরি চলে গেলে বন্ধু গিরীন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে পেগুতে চলে যান। ১৯০৬ সালে আবার রেঙ্গুনে ফিরে পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে চাকরি পান এবং পরবর্তী দশ বছর সেখানে কাজ করেন

বার্মায় থাকাকালীন বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশে উত্তর বার্মার অলিগলি ঘুরেছেন। চোর-ডাকাত-খুনিদের সঙ্গেও মিশেছেন

দয়ালু মানুষ শরৎচন্দ্র

রেঙ্গুনের এক মিস্ত্রিপল্লিতে বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। সেখানকার মানুষদের বিপদে সাহায্য করতেন, অসুখে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিতেন। তাঁর জনপ্রিয়তা দেখে বন্ধুরা মজা করে এলাকার নাম দিয়েছিলেন ‘শরৎপল্লি’

একবার এক অসহায় গর্ভবতী মেয়ের প্রসবের ব্যবস্থা করেন। মেয়েটির প্রেমিক যখন সন্তান ও মাকে অস্বীকার করে, তখন শরৎচন্দ্র মেয়েটির পক্ষে মামলা করেছিলেন। মেয়েটির বিরুদ্ধে যুবকটি শরৎচন্দ্রের নামে মিথ্যা অভিযোগ এনেও বিফল হয়েছিল

নেশা ও সঙ্গীতপ্রেম

শোনা যায়, প্রণয়ঘটিত ব্যর্থতার যন্ত্রণা ভুলতে প্রথম জীবনে শরৎচন্দ্র বেজায় মদ্যপান করতেন। এক বন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি মদ ছেড়ে আফিম ধরেছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল

তবে তিনি ভাল গান গাইতেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন শরৎচন্দ্রের গানে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ‘রেঙ্গুন রত্ন’ উপাধি দিয়েছিলেন। চিত্রাঙ্কনেও তাঁর দক্ষতা ছিল। বার্মায় বসবাসকালে তাঁর অঙ্কিত ‘মহাশ্বেতা’ অয়েল পেইন্টিং একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম হিসেবে পরিচিত

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি, সামতাবেড়, হাওড়া। লক্ষণীয় যে মাঝখানে পেয়ারা গাছটি শরৎচন্দ্র নিজে রোপণ করেন। ছবি: উইকিপিডিয়া

সাহিত্যজীবনের সূচনা ও বিকাশ

নেশা ও সঙ্গীতপ্রেম

শরৎচন্দ্রের সাহিত্য সাধনার হাতেখড়ি ভাগলপুরে। এখানেই ‘চন্দ্রনাথ’, ‘দেবদাস’—পরবর্তীতে বিখ্যাত হওয়া গল্পগুলোর খসড়া লেখা হয়

‘মন্দির’ ও কুন্তলীন পুরস্কার

কলকাতা থেকে বার্মা যাওয়ার সময় ‘মন্দির’ নামে একটি গল্প ‘কুন্তলীন’ পত্রিকার প্রতিযোগিতায় পাঠান। স্বাভাবিক সংকোচবশত নিজের নাম না দিয়ে মাতুলসম্পর্কীয় সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলির নামে পাঠান। গল্পটি প্রথম পুরস্কার পায়। এতে তিনি লেখালেখিতে আরও উৎসাহিত হন

‘বড়দিদি’: খ্যাতির পথে

বার্মায় থাকতে ‘বড়দিদি’ গল্পটি ‘ভারতী’ পত্রিকায় তিন কিস্তিতে প্রকাশিত হয় (১৩১৪ বঙ্গাব্দ)। এর মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এসে পড়েন এক নতুন প্রতিভা।

বার্মা থেকেই লেখালেখি

বার্মায় বসে তিনি ভাগলপুরে সঞ্চিত মনে আরও অনেক গল্প লিখলেন—‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’। ইংরেজি উপন্যাস থেকে উপাদান নিয়ে ‘দত্তা’ ও ‘দেনাপাওনা’ লেখেন

‘শ্রীকান্ত’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী’ নামে। বার্মার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

১৯১৬ সালে চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। শিবপুরে বাড়ি নিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। প্রকাশকদের কাছে লেখা পাঠানো, গল্প-উপন্যাস নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এরপর একের পর এক অমর সৃষ্টি রচনা করেন।

সাহিত্যকর্ম ও উল্লেখযোগ্য রচনা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ২৪টি উপন্যাস, ১১টি ছোটগল্প, ৪টি নাটক ও ১২টি প্রবন্ধ রচনা করেছেন

কালজয়ী উপন্যাসসমূহ

উপন্যাসের নামপ্রকাশকালবিশেষত্ব
বড়দিদি১৯০৭প্রথম উপন্যাস, খ্যাতি এনে দেয়
বিন্দুর ছেলে ও অন্যান্য১৯১৪ছোটগল্প সংকলন
পরিণীতা১৯১৪প্রেম, সামাজিক বাধা ও সমন্বয়ের কাহিনি
পল্লীসমাজ১৯১৬গ্রাম সমাজের দ্বন্দ্ব নিয়ে
বৈকুণ্ঠের উইল১৯১৬
দেবদাস১৯১৭বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেমোপাখ্যান
চরিত্রহীন১৯১৭নারী চরিত্রের জটিলতা
নিষ্কৃতি১৯১৭
দত্তা১৯১৮নারীর আত্মত্যাগ ও কষ্টের কাহিনি
শ্রীকান্ত (চার খণ্ড)১৯১৭-১৯৩৩আত্মজীবনীমূলক ধারার উপন্যাস
গৃহদাহ১৯২০প্রেমের জটিল দ্বন্দ্ব
দেনা-পাওনা১৯২৩ধার-দেনা ও মানবিক সম্পর্ক
পথের দাবী১৯২৬বিপ্লবীদের সমর্থনে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত
শেষ প্রশ্ন১৯৩১নৈতিকতা ও প্রেমের প্রশ্ন
শেষের পরিচয়১৯৩৯মরণোত্তর প্রকাশিত

ছোটগল্প

তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মন্দির’ (প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত), ‘মহেশ’, ‘রামের সুমতি’, ‘কাশীনাথ’, ‘বিলাসী’, ‘অভাগীর স্বর্গ’ প্রভৃতি

প্রবন্ধ ও অন্যান্য

‘নারীর মূল্য’ (১৯২৩), ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ (১৯৩২) তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ

সাহিত্য-প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্য

সাধারণ মানুষের কাহিনিকার

শরৎচন্দ্রের অধিকাংশ গল্প ও উপন্যাসের কাহিনি তিনি গ্রহণ করেছেন নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভব থেকে। কোন রাজা-বাদশার গল্প নয়, একান্তই আপন ঘরের মানুষই তাঁর পাত্র-পাত্রী। তাঁর রচনাতেই সাধারণ বাঙালি গল্পের আস্বাদ পেয়েছে

নারী চরিত্রের বিপ্লবী চিত্রায়ণ

সমাজের নারীদের অবস্থান বোঝা যায় শরৎচন্দ্রের চরিত্রচিত্রণের মাধ্যমেই। তার রচনায় সাধারণ বাঙালি মেয়ে হয়ে উঠেছে বিরাজবৌ, অরক্ষণীয়া, কুসুম—যারা শুধু পরাধীন নারী নয়, নিজের অধিকার ও সম্মানের জন্য লড়াই করে

ভাষার সাবলীলতা

কাহিনি নির্মাণে অসামান্য কুশলতা এবং অতি প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষা তাঁর কথাসাহিত্যের জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির প্রধান কারণ। রবীন্দ্রনাথই শরৎচন্দ্রের প্রতিভার স্থায়ী মূল্য নির্ণয় করে গেছেন ‘পুনশ্চ’ কাব্যের অন্তর্গত ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতাটিতে

রাজনৈতিক জীবন

শরৎচন্দ্র কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯২১ সালে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন এবং হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন

তাঁর ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি বিপ্লবীদের সমর্থনের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ সরকার একে নিষিদ্ধ করে। যা উপন্যাসটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়

পুরস্কার ও সম্মাননা

জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯২৩)

সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্রকে এই বিরল সম্মানে ভূষিত করে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-লিট উপাধি (১৯৩৬)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি-লিট উপাধি প্রদান করে

অন্যান্য সম্মাননা

  • ১৯০৩ সালে ‘মন্দির’ গল্পের জন্য কুন্তলীন পুরস্কার

  • ১৯৩৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্যপদ

ব্যক্তিজীবন ও শেষ জীবন

বিবাহ

শরৎচন্দ্রের দুই স্ত্রী ছিলেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রীর নাম শান্তি দেবী। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর নাম হিরন্ময়ী দেবী

শেষ অসুস্থতা ও মৃত্যু

১৯৩৭ সালে শরৎচন্দ্র প্রায়শই অসুস্থ থাকতেন। কিছুদিন দেওঘরে কাটিয়ে ফিরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাঁর যকৃতের ক্যান্সার ধরা পড়ে। ডা. বিধানচন্দ্র রায় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন

১৯৩৮ সালের ১২ জানুয়ারি শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি সকাল দশটায় কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর

শরৎচন্দ্রের উত্তরাধিকার

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী কথাশিল্পীকে।শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী কথাশিল্পীকে।

রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন

রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন করে গেছেন ‘পুনশ্চ’ কাব্যের অন্তর্গত ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতায়। রবীন্দ্রনাথই প্রথম বুঝেছিলেন, শরৎচন্দ্রের সাধারণের কাহিনি অসাধারণ হয়ে উঠেছে

শরৎ পুরস্কার

শরৎচন্দ্রের জন্মশতবর্ষে ‘শরৎ সমিতি’ তাঁর নামে ‘শরৎ পুরস্কার’ প্রবর্তন করে। বর্তমানে এটি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। প্রাপকদের মধ্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, শঙ্খ ঘোষের মতো কিংবদন্তিরা রয়েছেন

পর্দায় শরৎ

শরৎচন্দ্রের বহু উপন্যাস ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় চলচ্চ্চিত্রায়িত হয়েছে। ‘দেবদাস’ তো বারবার পুনর্নির্মিত হয়েছে বলিউড ও টলিউডে। ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘বিরাজবৌ’ প্রভৃতি উপন্যাসও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে

অমর কথাশিল্পী

আজও প্রায় প্রতিটি বাঙালি শরৎচন্দ্র পড়েন। স্কুল-কলেজের পাঠ্যতালিকায় তাঁর গল্প ও উপন্যাস নির্বাচিত হয়। দারিদ্র্য, কুসংস্কার, নারীর প্রতি বৈষম্য এখনো সমাজে আছে বলেই শরৎচন্দ্র আজও প্রাসঙ্গিক

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ কী?

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২৮৩ সালের ৩১শে ভাদ্র) হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতায় ৬১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ডাকনাম ছিল ‘ন্যাঁড়া’

তিনি ১৯২৩ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯০৩ সালে কুন্তলীন পুরস্কার এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি-লিট উপাধি পান

‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ উপাধি পান শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার জন্য তিনি এই উপাধিতে ভূষিত হন।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবদাস’। এছাড়া ‘শ্রীকান্ত’ (চার খণ্ড), ‘পরিণীতা’, ‘গৃহদাহ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘পথের দাবী’, ‘দত্তা’, ‘দেনা-পাওনা’ প্রভৃতি অমর সৃষ্টি

তিনি প্রায় তেরো বছর তিন মাস বার্মায় কাটিয়েছিলেন। সেখানে চাকরি করেন, ঘুরে বেড়ান এবং লেখালেখি করেন।

‘পথের দাবী’ উপন্যাসটি বিপ্লববাদীদের সমর্থনের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। আইন অমান্য আন্দোলনের সময় এটি নিষিদ্ধ হয়

লেখালেখির গুরু হিসেবে শরৎচন্দ্র ফরাসি সাহিত্যিক এমিল জোলাকে মানতেন

উপসংহার: বাংলা সাহিত্যের অমর পুরুষ

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বলতম নাম। দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায় জীবন শুরু করলেও তাঁর অদম্য জিজ্ঞাসা, সাহিত্যের প্রতি তীব্র নেশা এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর সত্য ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে এনে দিয়েছে জনপ্রিয়তার এক অনন্য আসন।

তিনি সাধারণ মানুষের কাহিনি লিখেছেন। নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখেছেন। সমাজের কুসংস্কার ও শাস্ত্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। অথচ লিখেছেন এত সরল ভাষায়, এত হৃদয়গ্রাহী কাহিনিতে—যা আজও প্রতিটি বাঙালির মন ছুঁয়ে যায়

রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়—শরৎচন্দ্রের উত্তরসূরি বহু সাহিত্যিক তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বারবার তাঁর উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে

শরৎচন্দ্র হয়তো নেই। কিন্তু ‘দেবদাস’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘পরিণীতা’র পাতায় পাতায় তিনি আজও বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে—চিরকাল।

“মানুষের মাঝে মানুষই সেরা সত্য।” — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে