( লেখাটি পড়তে প্রায় 8 মিনিট সময় লাগতে পারে )

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উক্তি: বাংলা সাহিত্যের অপরাজেয় কথাশিল্পীর অমর বাণীসম্ভার

সূচি

অপরাজেয় কথাশিল্পীর অমর বাণী

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী। ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ উপাধিতে ভূষিত এই লেখকের রচনা যেমন বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, তেমনি তাঁর উক্তিগুলোও যুগের পর যুগ ধরে পাঠকহৃদয়ে বাজে

বঙ্কিমচন্দ্ররবীন্দ্রনাথের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সমাজের অবহেলিত নিম্নবর্গ, ব্রাত্যজনের কথা সাহিত্যে স্থান দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। নারীর প্রতি সামাজিক নির্যাতন, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তাঁর সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশিত উক্তিগুলো আজও যেন এক একটি স্বতন্ত্র দর্শন।

দারিদ্র্য, কুসংস্কার, নারীর প্রতি বৈষম্য এখনো সমাজে আছে বলেই শরৎচন্দ্র আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখা যেমন কালজয়ী, তেমনি তাঁর উক্তিগুলো সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে চিরন্তন সত্য হয়ে উঠেছে।

এই নিবন্ধে আমরা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভালোবাসার উক্তি, নারী নিয়ে উক্তি, জীবন দর্শন, সমাজ ও সাহিত্য নিয়ে উক্তি—একটি বিস্তারিত সংকলন উপস্থাপন করব।

ভালোবাসা নিয়ে শরৎচন্দ্রের অমর উক্তি

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় ভালোবাসার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বাংলা সাহিত্যে অনন্য। ‘দেবদাস’, ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’—প্রতিটি উপন্যাসেই প্রেমের ভিন্ন এক মাত্রা ফুটে উঠেছে। নিচে তাঁর ভালোবাসার উল্লেখযোগ্য উক্তিগুলো তুলে ধরা হলো:

ভালোবাসার অকারণতা ও অন্ধত্ব

“যাহাকে ভালবাসি, সে যদি ভাল না বাসে, এমন কি ঘৃণাও করে, তাও বোধ করি সহ্য হয়, কিন্তু যাহার ভালবাসা পাইয়াছি বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি, সেইখানে ভুল ভাঙ্গিয়া যাওয়াটাই নিদারুন। পূর্বেরটা ব্যথাই দেয়, কিন্তু শেষেরটা ব্যথাও দেয়, অপমানও করে। আবার এ ব্যথার প্রতিকার নাই, এ অপমানের নালিশ নাই।”

এই উক্তিটি ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান এক রকম ব্যথা দেয়, কিন্তু যাকে ভালোবাসি বলে বিশ্বাস করি, সেই ভুল ভাঙার ব্যথা আরও নিদারুণ—কারণ তা ব্যথার সঙ্গে অপমানও বয়ে আনে।

“বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।”

শরৎচন্দ্রের ‘শুভদা’ উপন্যাসের এই উক্তিটি বড় প্রেমের প্রকৃতি বোঝায়। বড় প্রেম সবসময় আপন করে ধরে না; কখনো কখনো নিজের ভালোর জন্য প্রিয়জনকে দূরেও সরিয়ে দিতে পারে।

“ভালোবাসার ক্ষেত্রে সে’ই বুদ্ধিমান, যে ভালোবাসে বেশি কিন্তু প্রকাশ করে কম!”

ভালোবাসা ও শাস্তি

“যে ভালবাসে, তাহাকে ঘৃণা করার অপবাদ দেওয়ার মত গুরুতর শাস্তি আর নাই, এ কথা ভালবাসাই বলিয়া দেয়।”

‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের এই উক্তি বলে—যে ভালোবাসে, তাকে ঘৃণার অপবাদ দেওয়ার চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই। এই সত্য ভালোবাসাই শেখায়।

“কপালের যেখানটায় বসন্তের দাগ ছিল; সবাই চোখ ফিরিয়ে নিত ঘেন্নায়! সেখানটায় চুমো খেয়ে বুঝিয়ে দিতে হয় ভালোবাসা জিনিসটা সবার জন্য আসেনি।”

‘শুভদা’ উপন্যাসের এই লাইনটি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ও বেদনাদায়ক সংজ্ঞা। যেখানে সবার ঘৃণার দৃষ্টি ছিল, সেখানেই একমাত্র প্রেমিক চুমো খেয়ে দেখিয়ে দেয় ভালোবাসা সবার জন্য নয়।

ভালোবাসার শক্তি ও শিক্ষা

“ভালবাসাটার মতো এতবড় শক্তি , এতবড় শিক্ষক সংসারে বুঝি আর নাই। ইহা পারে না এতবড় কাজও বুঝি কিছু নাই।”

“জন্মিলে মরিতে হয়, আকাশে প্রস্তর নিক্ষেপ করিলে, তাহাকে ভূমিতে পড়িতে হয়, খুন করিলে ফাঁসিতে যাইতে হয়, চুরি করিলে কারাগারে যাইতে হয়, তেমন ভালোবাসিলে কাঁদিতে হয়—- অপরাপরের মতো ইহাও একটি জগতের নিয়ম।”

‘শুভদা’ উপন্যাসের এই উক্তিটি ভালোবাসাকে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের সঙ্গে তুলনা করেছে। ভালোবাসা দিলে কাঁদতে হয়—এটাও জগতের নিয়ম।

“ভালোবাসা কোনো বন্ধনে বাঁধা যায় না, ভালোবাসা স্বাধীনতা চায়।”

নারী নিয়ে শরৎচন্দ্রের উক্তি

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের একজন নারী-জাগরণের পথিকৃৎ। তিনি নারীর অবিচার, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাঁর রচিত ‘চরিত্রহীন’, ‘দত্তা’ প্রভৃতি উপন্যাসে নারীচরিত্রের যে ব্যতিক্রমী ও সাহসী উপস্থাপন, তাতে সমাজের চোখে বিদ্রোহী ঔপন্যাসিক বলেও খ্যাত হন তিনি

নারীর স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা

“Women's liberty", "women's independence" are words on everybody's lips these days, but they stay on the lips and don't go any further. Do you know why? I've found out that liberty can be obtained neither by theoretical arguments, nor by pleading justice and morality, nor by staging a concerted quarrel with men at a meeting. It's something that no one can give to another - not something to be owed or paid as a due... you can easily understand that it comes of its own accord - through one's own fulfillment, by the enlargement of one's own soul.”

ইংরেজিতে লেখা এই উক্তিতে শরৎচন্দ্র নারীর স্বাধীনতার প্রকৃত পথ দেখিয়েছেন। স্বাধীনতা তর্ক-বিতর্কে আসে না; তা আসে নিজের আত্মার বিকাশের মাধ্যমে।

“লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়।”

‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের এই বিখ্যাত উক্তিটি শরৎচন্দ্রের নারীচেতনার অন্যতম নিদর্শন।

“প্রায় কোনা দেশেই পুরুষ নারীর যথার্থ মূল্য দেয় নাই।”

শরৎচন্দ্রের এই পর্যবেক্ষণ আজও সমানভাবে সত্য।

নারী ও সমাজের নিষ্ঠুরতা

‘জীবন দর্শনে শরৎচন্দ্র’ শীর্ষক রচনায় তিনি নারী নির্যাতনের এক চরম বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। নিরুদিদির করুণ কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন:

“বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে রোহিণীর দুর্গতির কথা যখন ভাবি, তখন আমার নিরুদিদির কথা মনে হয়। ... বত্রিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত তাঁহার চরিত্রে কোন কলঙ্ক স্পর্শ করে নাই। গ্রামে এমন সুশীলা, ধর্ম্মমতি, পরোপকারিণী, শ্রমশীলা ও কর্ম্মিষ্ঠা আর কেহ ছিল না। ... সেই বত্রিশ বৎসর বয়সে নিরুদিদির পদস্খলন হইল। ... সে অবস্থায় সচরাচর যে একমাত্র উপায়, নিরুদিদিকে তাহাই করিতে হইল। ... কেহ তাঁহার দুয়ার মাড়াইত না। ... আমিও লুকাইয়া যাইতাম। ... তিনি যখন মরিয়া গেলেন, তখন তাঁহার শবদেহ কেহ স্পর্শ করিল না, ডোমের সাহায্যে তাহা নদীতীরের এক জঙ্গলে টানিয়া ফেলিয়া দেওয়া হইল, শিয়াল কুকুরে তাহা ছিঁড়িয়া খাইল।”

এই বর্ণনা শরৎচন্দ্রের সমাজসচেতনতার অন্যতম দৃষ্টান্ত।

নারী হৃদয় প্রসঙ্গ

“মেয়েরা পুরুষের হৃদয় এক নিমিষেই চিনে নিতে পারে, এটি বিধাতার দেয়া শক্তি। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার ওরা নিজেদের হৃদয় নিজেরা চিনতে পারে না।”

জীবন ও মৃত্যু নিয়ে নির্মোহ বাণী

শরৎচন্দ্রের জীবনদর্শন গভীর ও বাস্তবধর্মী। তিনি জীবন ও মৃত্যুকে দেখেছেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে।

“মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে।”

শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে গভীর উক্তিগুলোর একটি। মানুষের শারীরিক মৃত্যু যন্ত্রণাদায়ক নয়; যন্ত্রণাদায়ক হলো মানুষের মনুষ্যত্বের মৃত্যু।

“যাহার প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা নদীগর্ভে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে,সে আর খান কতক ইট বাঁচাইবার জন্য নদীর সহিত কলহ করিতে চাহে না।”

“যাহার প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা নদীগর্ভে ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে,সে আর খান কতক ইট বাঁচাইবার জন্য নদীর সহিত কলহ করিতে চাহে না।”

“কাল যে ছিল,আজ সে নাই; আজও যে ছিল,তাহারো ঐ নশ্বর দেহ টা ধীরে ধীরে ভস্মসাৎ হইতেছে, আর তাহাকে চেনাই যায় না; অথচ, এই দেহ টাকে আশ্রয় করিয়া কত আশা,কত আকাঙ্ক্ষা,কত ভয়,কত ভাবনাই না ছিল। কোথায় গেল? এক নিমিষে কোথায় অন্তর্হিত হইল? তবে কি তার দাম? মরিতেই বা কতক্ষণ লাগে?”

এই উক্তিতে শরৎচন্দ্র দেহ ও প্রাণের নশ্বরতার চিত্র এঁকেছেন।

“জীবনে অনেক কিছু হারাতে হয়, তবেই মানুষ অনেক কিছু পায়।”

‘বিন্দুর ছেলে’ গল্পের এই উক্তিটি আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে।

“কোনো বড় ফলই বড় রকমের দুঃখভোগ ছাড়া পাওয়া যায় না।”

মন ও মানব মনন নিয়ে উক্তি

শরৎচন্দ্র মানব মনের জটিলতা ও গভীরতা সম্পর্কে অসাধারণ পর্যবেক্ষণ রেখে গেছেন।

“এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্তটাই পরিপূর্ণ সত্য। মিথ্যার অস্তিত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে সে মনুষ্যের মন ছাড়া আর কোথাও না।”

‘শ্রীকান্ত: প্রথম পর্ব’ উপন্যাসের এই উক্তিটি শরৎচন্দ্রের দার্শনিক প্রতিভার পরিচয় বহন করে। সত্যের অস্তিত্ব সর্বত্র, মিথ্যা কেবল মানুষের মনের ভেতরেই।

“সত্যের স্থান বুকের মধ্যে, মুখের মধ্যে নয়। কেবল মুখ দিয়ে বার হয়েছে বলেই কোনো জিনিস কখনো সত্য হয়ে উঠে না। তবু যারা তাকে সকলের অগ্রে, সকলের ঊর্ধে স্থাপন করিতে চায়, তারা সত্য কে ভালোবাসে বলেই করে না, সত্যভাষণের দম্ভকেই ভালোবাসে বলে করে।”

সত্য আবৃত্তি করার দম্ভ ভালোবাসা নয়; প্রকৃত সত্যের স্থান হৃদয়ে।

“আমি টের পাইয়াছি মানুষ শেষ পর্যন্ত কিছুতেই নিজের সমস্ত পরিচয় পায় না। সে যা নয়, তাই বলিয়া নিজেকে জানিয়া রাখে এবং বাহিরে প্রচার করিয়া শুধু বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে; এবং যে দণ্ড ইহাতে দিতে হয়, তা নিতান্ত লঘুও নয়।”

‘শ্রীকান্ত: প্রথম পর্ব’। মানুষ কখনো নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় পায় না; যা নয় তাই বলে নিজেকে পরিচিত করে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে।

“মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা।”

‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের এই উক্তিটি শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে।

সমাজ, সংস্কার ও শিক্ষা নিয়ে বাণী

শরৎচন্দ্র সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

“পৃথিবীতে কোন সংস্কারই কখনও দল বেঁধে হয় না! একাকীই দাঁড়াতে হয়। এর দুঃখ আছে। কিন্তু এই স্বেচ্ছাকৃত একাকীত্বের দুঃখ, একদিন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বহুর কল্যাণকর হয়। মেয়েকে যে মানুষ বলে নেয়, কেবল মেয়ে বলে, দায় বলে, ভার বলে নেয় না, সে-ই কেবল এর দুঃখ বইতে পারে, অপরে পারে না। আর কেবল নেওয়াই নয়, মেয়েমানুষকে মানুষ করার ভারও তারই উপরে এবং এইখানেই পিতৃত্বের সত্যকার গৌরব।”

“কিছু একটা কেবল দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে বলেই তা ভালো হয়ে যায় না। মাঝে মাঝে তাকে যাচাই করে বিচার করে নিতে হয়। যে মমতায় চোখ বুঝে থাকতে চায় সে-ই মরে।”

“লােকে বলে, এই তাে দুনিয়া! এমনি ভাবেই তো সংসারের সকল কাজ চিরদিন হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু এই কি যুক্তি! পৃথিবী কি শুধু অতীতের জন্য, মানুষ কি কেবল তাহার পুরাতন সংস্কার লইয়া অচল হইয়া থাকিবে! নূতন কিছু কি সে কল্পনা করিবে না! উন্নতি করা কি তাহার শেষ হইয়া গেছে!”

“আমাদের দেশের লােক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না।”

বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক নিয়ে শরৎচন্দ্র

“সংসারে বন্ধু-সংখ্যা যার অপরিমিত দুঃখের দিনে ডাক দিবার মতো বন্ধুর তাহারি সবচেয়ে অভাব।”

“বন্ধুর যখন হবে সত্যিকারের প্ৰয়োজন তখন ভগবান আপনি পৌঁচে দেবেন তাকে দোর-গোড়ায়।”

‘বিপ্রদাস’ উপন্যাসের এই উক্তি বন্ধুত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

“রাগ করে শোয়া যেতে পারে কিন্তু রাগ করে ঘুমনো যায় না| বিছানায় পড়ে ছটফট করার মত শাস্তি আর নেই|”

মহত্ত্ব ও মানবতা

“তারাই মহৎপ্রাণ, যারা অন্যদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের বিপদের কথা মনে রাখে না।”

‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের এই উক্তিটি সত্যিকারের মহত্ত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে।

“মহত্ত্ব জিনিসটা কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে থাকে না। তাকে সন্ধান করে খুঁজে নিতে হয়।”

“যারা মহৎপ্রাণ, তাঁদের যেকোন অবস্থাতেই, পরের বিপদে নিজের বিপদ মনে থাকে না।”

সাহিত্য ও সত্য

“সত্য আর সাহিত্য আলাদা। সত্য সাহিত্যের বনেদ, কিন্তু সেইটাই সব নয়। সাহিত্যে একটা শিল্প- যেমন করলে সাজালে মানুষের মনে সেটা একটা দাগ ফেলতে পারে, যা অনেকদিন থাকে।”

“সাহিত্যের নানা কাজের মধ্যে একটা কাজ হইতেছে জাতিকে গঠন করা, সকল দিক দিয়া তাহাকে উন্নত করা। Idea পশ্চিমবঙ্গের কি উত্তরের, ইহা বড় কথা নয়, স্বদেশের কি বিদেশের তাহাও বড় কথা নয়, বড় কথা ইহা ভাষার ও জাতির কল্যাণ কর কিনা।”

বিষয়ভিত্তিক সেরা উক্তির তালিকা

ভালোবাসা প্রসঙ্গে

উক্তিসূত্র
“যাহাকে ভালবাসি, সে যদি ভাল না বাসে… সেইখানে ভুল ভাঙ্গিয়া যাওয়াটাই নিদারুন।”চরিত্রহীন
“যে ভালবাসে, তাহাকে ঘৃণা করার অপবাদ দেওয়ার মত গুরুতর শাস্তি আর নাই”গৃহদাহ
“বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।”শুভদা
“ভালোবাসা কোনো বন্ধনে বাঁধা যায় না, ভালোবাসা স্বাধীনতা চায়।”দত্তা
“ভালবাসাটার মতো এতবড় শক্তি , এতবড় শিক্ষক সংসারে বুঝি আর নাই” 

নারী প্রসঙ্গে

উক্তিসূত্র
“লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়।”গৃহদাহ
“প্রায় কোন দেশেই পুরুষ নারীর যথার্থ মূল্য দেয় নাই” 
“মেয়েরা পুরুষের হৃদয় এক নিমিষেই চিনে নিতে পারে… অথচ নিজেদের হৃদয় নিজেরা চিনতে পারে না” 

জীবন ও মনুষ্যত্ব প্রসঙ্গে

উক্তিসূত্র
“মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে” 
“এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্তটাই পরিপূর্ণ সত্য। মিথ্যার অস্তিত্ব যদি কোথাও থাকে, তবে সে মনুষ্যের মন ছাড়া আর কোথাও না”শ্রীকান্ত: প্রথম পর্ব
“জীবনে অনেক কিছু হারাতে হয়, তবেই মানুষ অনেক কিছু পায়”বিন্দুর ছেলে

মহত্ত্ব ও মানবতা প্রসঙ্গে

উক্তিসূত্র
“তারাই মহৎপ্রাণ, যারা অন্যদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের বিপদের কথা মনে রাখে না” 
“মহত্ত্ব জিনিসটা কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে থাকে না। তাকে সন্ধান করে খুঁজে নিতে হয়” 
“মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা”পল্লীসমাজ

পরিবর্তন ও সংস্কার প্রসঙ্গে

উক্তিসূত্র
“অতীত মুছে ফেলার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে স্থান পালটানো” 
“কিছু একটা কেবল দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে বলেই তা ভালো হয়ে যায় না” 
“পৃথিবী কি শুধু অতীতের জন্য… নূতন কিছু কি সে কল্পনা করিবে না!” 

সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)

১: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি কোনটি?

শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে— “যাহাকে ভালবাসি, সে যদি ভাল না বাসে, এমন কি ঘৃণাও করে, তাও বোধ করি সহ্য হয়, কিন্তু যাহার ভালবাসা পাইয়াছি বলিয়া বিশ্বাস করিয়াছি, সেইখানে ভুল ভাঙ্গিয়া যাওয়াটাই নিদারুন” (‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস থেকে)। এছাড়া “লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়” (‘গৃহদাহ’) এবং “মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা” (‘পল্লীসমাজ’) তাঁর অমর উক্তি।

শরৎচন্দ্রের ভালোবাসার উক্তিগুলো কখনো অলংকারিক নয়, বরং নির্মোহ বাস্তবতার ছাপ বহন করে। তিনি ভালোবাসাকে প্রেমিকার রূপ বা গুণের জন্য নয়, বরং অকারণ ‘ভাল না বেসে থাকতে না পারা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তার ভালোবাসার উক্তি ‘চরিত্রহীন’, ‘গৃহদাহ’, ‘শুভদা’ উপন্যাসগুলোতে ছড়িয়ে আছে

শরৎচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে নারী-জাগরণের পথিকৃৎ। তিনি নারীর স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও মানবিক অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ‘লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়’—এই এক লাইনে তিনি নারীশক্তির দর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর নিরুদিদির করুণ কাহিনি সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী নালিশ।

শরৎচন্দ্র সমাজের চিরন্তন সত্য নিয়ে লিখেছেন। দারিদ্র্য, নারীর প্রতি বৈষম্য, কুসংস্কার, ভণ্ডামি—এসব আজও সমাজে আছে। তাই “মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে”—এই উক্তি আজও সমান সত্য।

শরৎচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাসেই উল্লেখযোগ্য উক্তি রয়েছে। তবে ‘চরিত্রহীন’ ভালোবাসার উক্তির জন্য বিখ্যাত; ‘গৃহদাহ’ নারী ও সম্পর্কের উক্তির জন্য; ‘শ্রীকান্ত’ দার্শনিক উক্তির জন্য; আর ‘বড়দিদি’ উপন্যাসে রয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় লাইন

মানবতা নিয়ে শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি হলো ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের: “মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম—মানবতা”

উপসংহার: শরৎচন্দ্রের অমর বাণী

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন যুগের দলিলদার, সমাজের আয়না এবং মানুষের মনের গহীন জায়গার পথিকৃৎ। তাঁর উক্তিগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

আজ, তাঁর প্রায় শত বছর পরেও যখন “মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে” এই লাইন পড়ি, তখন মনে হয় শীতল পাখা যেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। যখন “লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু দুর্বলতা নয়” পড়ি, তখন নারীর আত্মমর্যাদার এক নতুন অর্থ দাঁড়িয়ে যায়।

শরৎচন্দ্র হয়তো নেই। কিন্তু তাঁর লেখা লাইনগুলো, তাঁর বলা কথাগুলো, তাঁর ফেলে যাওয়া উক্তিগুলো আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির হৃদয় ছুঁয়ে বেড়াচ্ছে। ‘দেবদাস’-এর ব্যথা, ‘শ্রীকান্ত’-এর বিচরণ, ‘চরিত্রহীন’-এর নির্মোহ সত্য—সব মিলিয়ে শরৎচন্দ্র চিরকাল ‘আমাদের শরৎচন্দ্র’ হয়ে থাকবেন। আর থাকবেন তাঁর অমর বাণীগুলো নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো ভালো লাগতে পারে