সূচি
Toggleনীললোহিত—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় স্বত্তা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু এই নক্ষত্রের একটি দিক রয়েছে যা তাঁকে আরও গভীরভাবে বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে—তা হলো তাঁর ছদ্মনাম ‘নীললোহিত’।
নীললোহিত শুধু একটি ছদ্মনাম ছিল না; এটি ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক অনন্য সৃষ্ট চরিত্র, তাঁর মনের আয়না, তাঁর বলার অলিখিত মাধ্যম। সুনীল নিজের সকল কথা যেন ক্রমাগত বলিয়ে নিয়েছেন নীললোহিতকে দিয়ে। এটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম, কিন্তু নীললোহিতের লেখাগুলো পড়তে পাঠকের মনে হতেই পারে—‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ই নয়তো নীললোহিতের ছদ্মনাম?
এই নিবন্ধে আমরা নীললোহিতের উক্তি, তাঁর চরিত্র, দর্শন এবং তাঁর মাধ্যমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রকাশ পাওয়া সেই অনন্য সত্ত্বা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নীললোহিত কে? চরিত্র পরিচিতি
নীললোহিত (Nil Lohit) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে পরিচিত ছদ্মনাম। তিনি সুনীলের একটি প্রিয় চরিত্রও বটে।
নীললোহিতের বয়স ও ব্যক্তিত্ব
নীললোহিতের বয়স সাতাশ (২৭)-এ ঠেকে থাকে সবসময়। চিরতরুণ এই যুবকের পর্যবেক্ষণশক্তি সত্যিই অসাধারণ।
নীললোহিত বড্ড বেশি চোখ-কান মেলে থাকে, তেমন খুব জড়ায় না কিছুতে। আর জড়াবার মতো তার নিজেরও তো নেই সেই আর্থিক সামর্থ্য—তিনি একজন বেকার যুবক, চাকরির সন্ধান যার নিত্যদিনের বাস্তবতা।
তবে কী চমৎকার! ফেলুদার চাকরির প্রয়োজন নেই কারণ তিনি শখের গোয়েন্দা, কিন্তু নীলুর একটা চাকরি খুব দরকার। অথচ এ বান্দা নীলু কোনো চাকরিতেই পা রাখতে পারে না।
পর্যবেক্ষক চোখ
নীললোহিত যেন কলকাতা শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায়। দেখা হয় প্রতিদিন অজস্র মুখের সাথে। সেই মুখে লেগে থাকা প্রতারণা কিংবা শুদ্ধতাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে এই যুবক। সে জীবনের বাইরে থেকে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে কোনো কিছুর বর্ণনা দেয় না—সে কাহিনির কথক হলেও গল্পের মধ্যেরই চরিত্র।
আর তাই নীললোহিতের বর্ণনা ‘ইউটোপিয়া’ ঠেকে না; মনে হয় সে একেবারে ঐ চরিত্রগুলোর ভেতর থেকে কথা বলে যাচ্ছে
দিকশূন্যপুর: নীললোহিতের আবিষ্কার
‘যারা জীবনে কখনো দিকশূন্যপুরে যায়নি, কিংবা সে-জায়গাটার নামও শোনেনি, তারা বুঝতে পারবে না তারা কী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার অস্তিত্বই জানা নেই, তাকে না-পাওয়ার তো কোনো দুঃখ থাকে না। কিন্তু যারা দিকশূন্যপুরে একবার গেছে, কিন্তু বারবার ফিরে যেতে পারেনি, তাদের অতৃপ্তির শেষ নেই। আমি মাঝে মাঝে সেই জায়গাটার কথা ভাবি, কিন্তু আমারও যাওয়া হয়ে ওঠে না।’
‘দিকশূন্যপুর’ নীললোহিতেরই আবিষ্কার। এটি কল্পনার এক অদ্ভুত জগৎ যেখানে নীললোহিত স্বপ্ন দেখে—যেখানে রয়েছে ‘যাচ্ছেতাই ধরনের স্বপ্ন’।
নীললোহিতের দর্শন ও চিন্তাধারা
নীললোহিতের উক্তি ও চিন্তাধারা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গভীর পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। নিচে তাঁর কিছু জনপ্রিয় উক্তি উল্লেখ করা হলো:
চিকিৎসার অতীত আশাবাদী
“চিকিৎসার অতীত আশাবাদী না হলে বেঁচে থাকার কোনো ‘পয়েন্ট’ নেই!”
নীললোহিতের এই উক্তিটিতে গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। অতিরিক্ত আশাবাদ হয়তো ‘চিকিৎসার অতীত’—কিন্তু সেটাই বেঁচে থাকার একমাত্র অর্থ। আশাবাদই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। যেমন নীললোহিত হীরেনদাকে বলে:
“নিশ্চয়ই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তখন সমাজে এরকম শোষণ থাকবে না, প্রত্যেকের সমান সুযোগ ও অধিকার থাকবে। কেউ কারুর উপর জোর করে মতামত চাপাবে না।”
আত্মপরিচয় ও আত্মগোপন
“আত্মগোপন করতে গিয়ে কিছুদিন পর অনেকে আত্মপরিচয়টাই ভুলে যায়।”
নীললোহিতের আরেকটি শাণিত পর্যবেক্ষণ। তিনি বুঝতে পেরেছেন দীর্ঘদিন আত্মগোপন করলে মানুষ নিজের অস্তিত্বই ভুলে বসে।
কৃতজ্ঞতা: এক বিষম বোঝা
“কৃতজ্ঞতা একটা বিষম বোঝা। অনেকেই সারাজীবন এ বোঝা বহনে অক্ষম। তাই এই বোঝা ঝেড়ে ফেলে উপকারী ব্যক্তির শত্রুতা করে তারা স্বস্তি বোধ করে।”
এটি ‘সেই সময়’ উপন্যাসের অন্যতম জনপ্রিয় উক্তি। মানুষ কেন উপকারীর শত্রুতা করে—নীললোহিত (বা সুনীল) তার মর্মে আঘাত করেছেন।
সাহিত্যের নেশা
“সাহিত্য একটা তীব্র নেশা, রক্তের সঙ্গে মিশে যায়, যাকে একবার এই নেশা ধরে, তার আর অন্য কোনো গতি থাকে না।”
লেখক নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন। সাহিত্যচর্চা রক্তের সঙ্গে মিশে যায় বলে তিনি বলেছেন, কারণ তিনিই যিনি সারা জীবন রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে লিখে গেছেন।
মানুষের মাঝে মানুষ
“মানুষই মানুষকে বাঁচায়, মানুষই মানুষকে মারে। মানুষই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, আবার মানুষই এই বিভেদের রেখা মুছে ফেলতেও পারে।”
এই উক্তিতে নীললোহিত (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। বিভেদ সৃষ্টি ও দূর করা—দুটোই মানুষের কাজ।
ঘটনা ও রটনা
“ঘটনার চেয়ে রটনার রূপ অনেক বেশী বিচিত্র এবং গতিবেগও প্রচন্ড।”
সেই সময় উপন্যাসের আরেক বিখ্যাত উক্তি। বাস্তব ঘটনার চেয়ে গুজবের আকৃতি অনেক বেশি বিকৃত ও বিচিত্র হয়—আজকের ফেক নিউজের যুগে এই উক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।
নিয়ম ভাঙার ইচ্ছে
“কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতন মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে দুটো চারটে নিয়ম কানুন ভেঙে ফেলি পায়ের তলায় আছড়ে ফেলি মাথার মুকুট যাদের পায়ের তলায় আছি, তাদের মাথায় চড়ে বসি।”
নীললোহিতের বিদ্রোহী স্বর। প্রচলিত নিয়মকানুন মানতে বাধ্য মানুষমাত্রই মাঝে মাঝে সব ছেড়ে দিতে চায়—এই বিদ্রোহের প্রকাশ এই উক্তিতে। তিনি আরও লিখেছেন:
“কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতই ইচ্ছে করে অবহেলায় ধর্মতলায় দিন দুপুরে পথের মধ্যে হিসি করি।”
বাঙালি চরিত্র নিয়ে পর্যবেক্ষণ
“কোনও একটা বিষয় সম্পর্কে খুব কম জেনেও বাঙালি অনেকক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। এটা বাঙালি চরিত্রের একটা বিশেষত্ব।”
ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সঙ্গে সামাজিক পর্যবেক্ষণের অসাধারণ নিদর্শন এটি।
দ্বিতীয় উক্তি: বাঙালির ধর্ম ও আত্মসমালোচনা
“বাঙালিরা ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে, ধর্মসংস্কারের ব্যাপারে কেউ কিছু বললেই গেল গেল রব তোলে, কিন্তু এই বাঙ্গালিরাই ব্যক্তি জীবনে ধর্মের প্রায় কোন নির্দেশই মানে না। ... খবরের কাগজে তর্জন গর্জন দেখলে মনে হবে খুব সাহসী, আসলে অত্যন্ত ভীরু।”
‘প্রথম আলো’ উপন্যাসের এই উক্তিটি নীললোহিতের সবচেয়ে তীব্র ব্যঙ্গের নিদর্শন। বাঙালির ‘প্রকাশিত উদারতা ও গোপন রক্ষণশীলতা’র দ্বৈত চরিত্র তিনি এখানে উন্মোচন করেছেন।
নারী প্রসঙ্গ
“মেয়েরা এখনও অসভ্য বর্বর পুরুষদেরই পছন্দ করে। কোনও ছেলের এক্সসারসাইজ করা মাসল ফোলানো চেহারা দেখলেই মেয়েরা বলে, কী সুন্দর চেহারা!”
সমাজের এক কটু সত্যকে নীললোহিতের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ।
শ্রদ্ধা ও ভক্তি
“বিশ্বাসে-শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে কেউ যখন নিমগ্ন থাকে তখন তাকে দেখতে বড় ভালো লাগে। চোখ বুজে কেউ ধ্যান করছে, এই দৃশ্যটা দেখলে আমার এখনও শ্রদ্ধা হয়, সে যারই ধ্যান করুক না কেন।”
নীললোহিত ধর্মের গোড়ামি নয়, বরং ভক্তির সৌন্দর্য দেখেছেন। যাঁর রচনায় ব্যঙ্গ আছে, সেই এক ব্যক্তি এই ভক্তি-শ্রদ্ধাকে সমীহ করেন।
নীললোহিতের শ্রেষ্ঠ উক্তি (সুবিন্যস্ত তালিকা)
নিচে নীললোহিতের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উক্তিকে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হলো:
জীবন দর্শন নিয়ে উক্তি
| উক্তি | প্রসঙ্গ |
|---|---|
| “অন্ধকার শশ্বানে ভীরু ভয় পায়, সাধক সেখানে সিদ্ধি লাভ করে” | সাহস ও সাধনার সম্পর্ক |
| “আত্মগোপন করতে গিয়ে কিছুদিন পর অনেকে আত্মপরিচয়টাই ভুলে যায়” | আত্মপরিচয়ের গুরুত্ব |
| “চিকিৎসার অতীত আশাবাদী না হলে বেঁচে থাকার কোনো ‘পয়েন্ট’ নেই!” | আশাবাদের দর্শন |
| “কৃতজ্ঞতা একটা বিষম বোঝা” | মানবসম্পর্কের জটিলতা |
সমাজ ও মানুষ নিয়ে উক্তি
| উক্তি | প্রসঙ্গ |
|---|---|
| “কোনও একটা বিষয় সম্পর্কে খুব কম জেনেও বাঙালি অনেকক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে” | বাঙালি চরিত্র |
| “বাঙালিরা ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে… ব্যক্তি জীবনে ধর্মের প্রায় কোন নির্দেশই মানে না” | ধর্ম ও বাঙালি |
| “মানুষই মানুষকে বাঁচায়, মানুষই মানুষকে মারে” | মানবতার দ্বৈত চরিত্র |
| “ঘটনার চেয়ে রটনার রূপ অনেক বেশী বিচিত্র” | গুজব ও বাস্তবতা |
| “যারা প্রথম কোনও সংস্কার ভাঙে, তাদের অনেক নিন্দাও সহ্য করতে হয়” | পথিকৃৎ হওয়ার মূল্য |
সাহিত্য নিয়ে উক্তি
| উক্তি | প্রসঙ্গ |
|---|---|
| “সাহিত্য একটা তীব্র নেশা, রক্তের সঙ্গে মিশে যায়” | সাহিত্যচর্চার অনুভব |
নিয়ম-কানুন নিয়ে বিদ্রোহী উক্তি
| উক্তি | প্রসঙ্গ |
|---|---|
| “কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতন মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে দুটো চারটে নিয়ম কানুন ভেঙে ফেলি” | নিয়ম-বিরোধী ইচ্ছা |
| “পায়ের তলায় আছড়ে ফেলি মাথার মুকুট” | কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে |
| “কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতই ইচ্ছে করে… ধর্মতলায় দিন দুপুরে পথের মধ্যে হিসি করি” | চরম বিদ্রোহ |
দিকশূন্যপুর নিয়ে উক্তি
| উক্তি | প্রসঙ্গ |
|---|---|
| “যারা জীবনে কখনো দিকশূন্যপুরে যায়নি, তারা বুঝতে পারবে না তারা কী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে” | কল্পনার জগৎ |
| “স্বপ্নগুলো ফাঁকি দিলে নীললোহিত চলে যায় তার একান্ত সেই ‘দিকশূন্যপুরে’” | বাস্তবতা ও কল্পনা |
নীললোহিতের জনপ্রিয় গল্প থেকে উক্তি
নীললোহিতের গল্পগুলো পড়তে গিয়ে পাঠক সম্মুখীন হন এক বিচিত্র জীবনের। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম চমৎকার একটি দৃশ্য নীললোহিতের একটি জনপ্রিয় গল্পে ধরা পড়েছে :
“নতুন বউয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে চার বছরের রিন্টু চিনির বস্তায় ‘কাজ’ সেরে বসেছে। মেজোকাকার আকাশ-পাতাল ভাঙা অবস্থা। চিনির বস্তা নষ্ট, অতিথিদের এখন কী দেওয়া হবে ভেবে সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ।”
এই হাসির গল্পের মধ্য দিয়েই নীললোহিতের সহজ-সরল বর্ণনা শৈলীর পরিচয় মেলে। নীললোহিত নিজেও ঠাকুরদের সঙ্গে বসে হাসাহাসি করে—সেও তো বটে এক ‘নিয়ম ভাঙা’র চরিত্র।
সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র বিখ্যাত সংলাপ ‘আমি নীললোহিত’ নাকি ‘নীললোহিত আমি’?—যাই হোক, নীলুকে নিয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের কৌতূহলের শেষ নেই।
নীললোহিত বনাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: কে আসল?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অনেক পুরস্কার-টুরস্কার পেয়েছেন, মান্যি-গণ্যি হয়েছেন, ঢালাও নাম হয়েছে, হেভি-গাড়ি সব আছে। নীললোহিতের এসব কিছুই নেই। একটা চাকরিও সে জোটাতে পারে না।
একেক সময় ধন্ধে পড়তে হয়: সুনীলের ছদ্মনাম নীললোহিত, নাকি নীললোহিতের ছদ্মনাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? সারাটা লেখকজীবন ধরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একাদিক্রমে চেষ্টাই ছিল যথাসম্ভব নীললোহিত হয়ে ওঠা।
একটি আন্দাজ করা কথা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী স্বাতীর আসল প্রেম নীললোহিতের সঙ্গেই। যিনি গোপনে আরও একজন মানুষকে ভালোবেসেছিলেন—মার্গারিট, যাঁকে নিয়ে অনেকটাই লেখা ও উৎসর্গ করা নীললোহিতের ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’।
বাংলা সাহিত্যের চাঁদ-সূর্য কিংবা নক্ষত্রদের পাশে নিজেকে নিতান্তই এক জোনাকি মনে করা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার এই ‘নীললোহিত’ নিয়ে লেখাকে সাহিত্য বলতেও লজ্জা পেতেন। কিন্তু জীবনবোধের গভীরতা আর সহজ স্পষ্টতাই হয়তো সাহিত্য। তাই পাঠককূলে বিশেষভাবে আদৃত হয়েছেন ‘নীললোহিত’ এবং এর স্রষ্টা খোদ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
নীললোহিতের গ্রন্থসম্ভার
নীললোহিত চরিত্র নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মোট পাঁচটি সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। ঠিক গল্প বা উপন্যাসের কাতারে পড়ে না এই বইগুলো। কেমন যেন ডায়েরির মতো করে তরতরে লেখা, কখনো সংযোগ কখনো বিচ্ছিন্নতা। যখন যা দেখেছেন, যা ভেবে উঠতে পেরেছেন, যতটুকু মনে করতে পেরেছেন—সব যেন দর্পিত প্রতিবিম্বের মতো চলে এসেছে এই লেখায়।
‘নীললোহিত সমগ্র’ নামে এই সংকলনগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য (FAQ)
১: নীললোহিত কে?
নীললোহিত হলেন বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সবচেয়ে পরিচিত ছদ্মনাম সৃষ্ট চরিত্র। তিনি একজন চিরতরুণ (বয়স ২৭-এ আটকে থাকে), বেকার যুবক যার পর্যবেক্ষণশক্তি অসাধারণ।
২: নীললোহিতের বয়স কত?
নীললোহিতের বয়স সবসময় সাতাশ (২৭)-এ ঠেকে থাকে। তিনি চিরকাল তরুণ!
৩: ‘দিকশূন্যপুর’ কী?
উত্তর: ‘দিকশূন্যপুর’ নীললোহিতের আবিষ্কৃত এক কল্পলোক। এটি স্বপ্নের জগৎ, যেখানে বাস্তবতার সব সীমাবদ্ধতা অনুপস্থিত।
৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আর কী কী ছদ্মনাম আছে?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যান্য ছদ্মনাম হলো ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’ । তবে এদের মধ্যে নীললোহিতই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
৫: নীললোহিত সমগ্র কয়টি খণ্ডে প্রকাশিত?
নীললোহিত চরিত্র নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মোট পাঁচটি সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে।
৬: নীললোহিতের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি কোনটি?
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম—“চিকিৎসার অতীত আশাবাদী না হলে বেঁচে থাকার কোনো ‘পয়েন্ট’ নেই” এবং “কৃতজ্ঞতা একটা বিষম বোঝা” ।
৭: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কেন নীললোহিত নামটি ব্যবহার করতেন?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ নীললোহিতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাইতেন। নীললোহিত তাঁর মনের আয়না ছিল। তিনি চেষ্টা করতেন ‘যথাসম্ভব নীললোহিত হয়ে উঠতে’।
উপসংহার: নীললোহিতের অমর উত্তরাধিকার
নীললোহিত শুধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম ছিল না—এটি ছিল বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য চরিত্র, যা সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল এবং তাঁদের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। তিনিই সেই চরিত্র যিনি লেখকের থেকে স্বতন্ত্র কিন্তু যথেষ্ট পরিচিত, যথেষ্ট বাস্তব যে সুনীলের চেয়েও তিনি বেশি সত্যি মনে হতে পারেন কখনও কখনও।
বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য মহান চরিত্রগুলোর পাশে নীললোহিত ঠাঁই পাবেন। তিনি থাকবেন আমাদের হাসি-কান্না, আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা আর কল্পনার সেতুবন্ধন হয়ে। তাঁর মাধ্যমেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের বলেছেন কঠিন সত্য, দিয়েছেন বিষম ব্যঙ্গ, হাসিয়েছেন আবার ভাবিয়েছেন গভীর দর্শনে।
নীললোহিতের কথা দিয়েই শেষ করি—
“মন চলো নিজ নিকেতনে। চলো দিকশূন্যপুর।”


